প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য শিল্পমাধ্যম হলো মাটির সরা। মৃৎশিল্পের এই রূপটি ছিল আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় কৃত্য এবং দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সরায় চিত্রাঙ্কন হতো দেবদেবী, ফুলপত্তর, জীবজন্তু ও দৈনন্দিন জীবনের চিত্র নিয়ে, যা শুধুমাত্র অলঙ্করণ নয়, ছিল মানুষের বিশ্বাস ও কল্পনার বাহক। কিন্তু সময়ের প্রবাহে, আধুনিক শিল্পের বাণিজ্যিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর রুচির কাছে মাটির সরার মূল্য যেন অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। আজকের দিনে সরার সরল সৌন্দর্য ও মাটির ঘ্রাণ শিল্পের মূলধারায় প্রায় ব্রাত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে যুগের পর যুগ ধরে সরার ওপর হাতের আঁচড়ে ফুটে উঠেছে লোকজ কল্পনা ও আধ্যাত্মিক চেতনার ছবি। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা বা ঘরোয়া কোনো শুভ অনুষ্ঠানে সরায় অঙ্কিত হতো দেবীর মুখ, প্রকৃতির রূপ, অথবা মাঙ্গলিক চিহ্ন। সরার রঙিন আলপনা ছিল একধরনের কল্পলোকের দরজা যেখানে ধর্ম, প্রকৃতি ও মানুষের আবেগ মিশে যেত এক অনন্য শিল্পে। এই সরাগুলো তৈরি হতো সহজলভ্য কাঁচামাল দিয়ে, মাটি আর প্রাকৃতিক রঙের সাহায্যে। এর ফলে মাটির সরা ছিল পরিবেশবান্ধব এবং অত্যন্ত মানবিক স্পর্শযুক্ত শিল্পসৃষ্টি।
প্রাচীন বাংলায় সরার উৎপত্তি হয়েছিল মূলত ধর্মীয় ও আচারসংক্রান্ত প্রয়োজন মেটানোর জন্য। সরায় আঁকা হতো দেবদেবী, ফুলপত্তর, পশুপাখি, প্রকৃতি এবং মঙ্গলচিহ্ন। সরার উপাদান ছিল সহজলভ্য স্থানীয় মাটি, প্রাকৃতিক রঙ ও হাতে গড়া নকশা। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, মনসা পূজা, লক্ষ্মীপূজায় মাটির সরার ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক। সরায় আঁকা প্রতিটি চিত্র মানুষের বিশ্বাস, মঙ্গলকামনা ও ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ছিল।
প্রাচীন বৈশিষ্ট্য:
সম্পূর্ণ হাতে তৈরি
ধর্মীয় আচার ও সামাজিক উৎসবের অঙ্গ
আঞ্চলিক শৈলীর বৈচিত্র্য
গ্রামীণ মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন
মধ্যযুগে এবং পরে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এই সময়ে সরার ব্যবহার কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে। জমিদারি প্রথা, ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, এবং ইউরোপীয় কৃত্রিম দ্রব্যের আগমনে গ্রামের স্বাভাবিক জীবনধারা ব্যাহত হয়। তবে গ্রামবাংলার অভ্যন্তরে তখনো সরার শিল্প টিকে ছিল ধর্মীয় এবং সামাজিক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। বিশেষত চন্দ্রকেতুগড়, কৃষ্ণনগর, কাঁথি অঞ্চলে সরার উৎকর্ষ বজায় ছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে কুড়ি শতকের শুরুর দিকে, শিল্পায়ন ও নগরায়নের জোয়ারে সরার ব্যবহার দ্রুত কমতে থাকে। প্লাস্টিক, সিরামিক, ধাতব সামগ্রীর প্রচলন সরার বিকল্প তৈরি করে দেয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও মাটির সরার জায়গা নিতে শুরু করে ফাইবার বা থার্মোকলের তৈরি দামী সামগ্রী। সরার সেই সহজ, সরল সৌন্দর্য আধুনিক বাজারের জটিল নান্দনিকতায় চাপা পড়ে যায়। ফলে সরার শিল্প ক্রমেই গ্রামীণ সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, বড় শহরের সাংস্কৃতিক জগতে এর উপস্থিতি বিলীন হতে থাকে।
আজকের দিনে কিছু শিল্পী, গবেষক ও সমাজসংগঠক সরার ঐতিহ্য নতুন করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
কিছু ক্রাফট ফেস্টিভ্যাল এবং লোকশিল্প মেলাতে সরাকে আধুনিক নকশায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।
মাটির সরাকে এখন ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন বা ইকো-ফ্রেন্ডলি গিফট আইটেম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছু শিল্পী প্রাচীন সরার রীতিকে আধুনিক শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু শিল্প যখন নগরায়নের পথে হাঁটলো, আন্তর্জাতিক বাজারের দাবি পূরণে গ্যালারি-কেন্দ্রিক, উচ্চমূল্যের, জটিল কনসেপ্ট নির্ভর হয়ে উঠলো, তখন মাটির সরার জায়গা সংকুচিত হতে থাকলো। প্লাস্টিক, সিরামিক, ফাইবারের তৈরি মসৃণ ও টেকসই পণ্য সরাসরি বাজার দখল করে নেয়। ফলে সরার মতো সহজ, অনাড়ম্বর এবং ক্ষণস্থায়ী শিল্পধারা আধুনিক চাহিদার কাছে হার মানে। বিশ্ববাজারের দৃষ্টিতে লোকশিল্প বা দেশজ শিল্প আজও অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক বা আদিম বলে বিবেচিত হয়। ফলে মাটির সরা হয়ে পড়ে এক প্রান্তিক, প্রায়-ভুলে যাওয়া শিল্পমাধ্যম।
তবে সব আশার আলো নিভে যায়নি। আজও কিছু আধুনিক শিল্পী, গবেষক ও ডিজাইনার মাটির সরার প্রতি নতুন করে মনোযোগী হচ্ছেন। তারা সরার লোকজ কল্পনা, মাটির টেক্সচার এবং হাতে তৈরি সৌন্দর্যকে আধুনিক শিল্প বা ইন্টেরিয়র ডিজাইনের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করছেন। অনেকে পরিবেশবান্ধব সচেতনতার অংশ হিসেবে মাটির তৈরি সরাসামগ্রীর দিকে ফিরছেন কারণ মাটির সরা প্রাকৃতিকভাবে বায়োডিগ্রেডেবল এবং টেকসই। পাশাপাশি কিছু ক্রাফট ফেস্টিভ্যাল, হস্তশিল্প মেলা, আর্ট গ্যালারি সরাকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ফিরিয়ে আনছে।
মাটির সরা বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পবস্তু, যার ইতিহাস হাজার বছরেরও পুরনো। মৃৎশিল্প বাংলায় এতই পুরনো যে, প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে (যেমন মহাস্থানগড়, পাণ্ডুয়া, চন্দ্রকেতুগড়) পাওয়া গেছে মাটির তৈরি পাত্র ও অলংকরণ, যার সঙ্গে সরার ধারার গভীর মিল লক্ষ্য করা যায়। প্রথমদিকে সরার ব্যবহার ছিল মূলত ধর্মীয় ও আচারমূলক। বিশেষ করে লোকধর্ম এবং পৌরাণিক আচার-অনুষ্ঠানে সরার উপর দেবদেবীর প্রতিকৃতি বা মাঙ্গলিক চিহ্ন অঙ্কন করা হতো। সরার মধ্যে মাটির সরলতা ও প্রতীকী চিত্রভাষা ছিল গ্রামীণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবনবোধ ও প্রকৃতিপ্রীতির প্রতিফলন। লোকশিল্পীদের হাতে তৈরি সরাগুলো ছিল রঙিন, প্রাণবন্ত এবং অঞ্চলভেদে নকশায় ভিন্নতা বহনকারী। সরার গায়ে আঁকা হতো দেবী লক্ষ্মী, মনসা, গৃহদেবতা, ফুল, পশুপাখি বা মাঙ্গলিক চিহ্ন যা ছিল সম্পূর্ণ হাতের আঁচড়ে তৈরি।
উপকরণ: স্থানীয় মাটি, প্রাকৃতিক রঙ (মাটি, খড়ি, কাঁচা রঙ)
প্রযুক্তি: হাতে তৈরি, সিম্পল পোড়া প্রক্রিয়া (open fire kiln)
কর্মকার: মূলত গ্রামীণ মৃৎশিল্পী সম্প্রদায় (কুমার সম্প্রদায়)
প্রাচীন বাংলায় সরার উৎপত্তি মূলত লোকাচারিক প্রয়োজন থেকে। সহজলভ্য মাটির ব্যবহার করে, কম খরচে এবং স্বল্প প্রযুক্তিতে সরা বানানো যেত যা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দৈনন্দিনভাবে ব্যবহৃত হতো।
মাটির সরা কেবল একটি শিল্পবস্তু নয়, এটি বাংলার মাটি, মানুষের জীবন এবং আবেগের ছোঁয়া বহন করে। আধুনিক শিল্প যখন নতুনত্ব আর জটিলতার খোঁজে এগিয়ে চলেছে, তখন এই সরল অথচ গভীর শিল্পমাধ্যমকে ভুলে যাওয়া এক বড় ক্ষতি। মাটির সরার মধ্যে লুকিয়ে আছে সেই শিকড়ের টান, যে টান আমাদের প্রকৃতির, সংস্কৃতির এবং মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত রাখে। আজ প্রয়োজন আধুনিক চেতনায় সেই প্রাচীন শিল্পকে নতুন করে মূল্যায়ন করা যাতে মাটির সরার ঘ্রাণ হারিয়ে না যায় কৃত্রিমতার ধোঁয়ার ভিড়ে। মাটির সরা কেবল একটি ব্যবহার্য জিনিস নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সৃজনশীলতার এক মূর্তপ্রতীক। যদিও আধুনিক যুগে সরার ব্যবহার কমে এসেছে, তবুও এই প্রাচীন শিল্পের প্রাণ আজও পুরোপুরি নিভে যায়নি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যদি ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা জাগ্রত করা যায়, তবে মাটির সরাকে আবারও বাংলার গর্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সরাকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা, আসলে আমাদের নিজেদের শিকড়কে ফিরে পাওয়ার একটি অভিজ্ঞান।