19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বর্তমানে পুরীতে চলছে জগন্নাথ দেবের চন্দনযাত্রা!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ভগবান শ্রী বিষ্ণুর যে চারটি ধাম রয়েছে, তার অন্যতম হল পুরীর জগন্নাথ ধাম। জগন্নাথ মন্দিরের সবথেকে বড় উত্‍সব হল রথযাত্রা হলেও এর অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার চন্দনযাত্রা ও স্নানযাত্রার পালা। বর্তমানে পুরীতে চলছে জগন্নাথ দেবের চন্দনযাত্রা। পুরো ৪২ দিন ধরে চলে চন্দনযাত্রা। জেনে নেওয়া যাক এই উত্‍সবের মাহাত্ম্য।

চন্দন যাত্রা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের একটি প্রাচীন ও পবিত্র উৎসব, যা অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয়ে টানা ৪২ দিন ধরে পালিত হয়। এই উৎসব জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার জলবিহার বা জলে বিহার করার একটি প্রতীকী রূপ, যেখানে দেবতারা শীতল চন্দন প্রলেপে স্নান করে নৌকা বিহারে যান। প্রতি বছর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে অক্ষয়তৃতীয়ার দিন এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনে রথযাত্রা উৎসবের জন্য রথ নির্মাণ শুরু হয়ে থাকে। সমগ্র উৎসবটি চলে ৪২ দিন ধরে। প্রথম ২১ দিন প্রতিদিন প্রধান দেবতাদের প্রতিনিধিমূর্তি সহ পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত পাঁচটি শিবলিঙ্গ সুসজ্জিত করে শোভাযাত্রা সহকারে জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদ্বার থেকে নরেন্দ্র তীর্থ জলাধার অবধি নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানের পর দেবতাদের একটি সুসজ্জিত রাজকীয় নৌকায় চাপিয়ে সান্ধ্যভ্রমণের জন্য জলাশয়ে ভাসানো হয়। শেষ ২১ দিনের যাবতীয় অনুষ্ঠান অবশ্য মন্দিরের ভিতরেই হয়ে থাকে।

উৎসবের ধাপ

উৎসব দুটি পর্বে বিভক্ত, বাহার চন্দন ও ভিতর চন্দন। প্রথম ২১ দিন বাহির চন্দন চলে, যেখানে দেবতাদের অনুরূপ মূর্তিগুলিকে (মাদন মোহন, রামকৃষ্ণ ও পঞ্চ পাণ্ডব) স্নান করিয়ে একটি বিশেষভাবে সজ্জিত নৌকায় (চপ) করে নারেন্দ্র সরোবরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় শোভাযাত্রা ও জলবিহার অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী ২১ দিন ভিতরে চন্দন, যা মন্দির চত্বরে সীমাবদ্ধ থাকে।

ধর্মীয় তাৎপর্য

চন্দন যাত্রা রথযাত্রার প্রাক্কালে হয় এবং এর মাধ্যমে দেবতাদের গ্রীষ্মকালের তাপ থেকে আরাম দেওয়া ও তাঁদের আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে। একইসঙ্গে এটি কৃষ্ণের মথুরা যাত্রার স্মরণে অনুষ্ঠিত এক দেবসম্ভোগীয় ভ্রমণ উৎসবও। এই উৎসব ওড়িশা তথা ভারতীয় সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, যা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ভক্তিভরে পালন হয়ে আসছে।

চন্দন যাত্রার ইতিহাস

চন্দন যাত্রার ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পুরীর জগন্নাথ দেবের উপাসনা এবং ওড়িশার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে। এই উৎসবের সূচনা হয়েছে বহু শতাব্দী আগে, এবং একে অনেকে রথযাত্রারই প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশ্বাস করা হয়, চন্দন যাত্রা প্রথম শুরু করেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন, যিনি জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর আমল থেকেই দেবতাদের শীতলতা দিতে এবং গ্রীষ্মের দহন প্রশমনে চন্দন প্রলেপ ও জলবিহারের এই প্রথা চালু হয়।

পুরাণমতে, ভগবান কৃষ্ণ তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে নৌবিহারে যেতেন এবং সেই স্মৃতি রক্ষার্থেই পুরীতে এই উৎসব পালিত হয়। চন্দন, গন্ধ, ফুল এবং নৌকা—এই সব উপাদানের সম্মিলনে দেবতাদের ভ্রমণ এক পবিত্র ও আনন্দময় রূপ পায়। মধ্যযুগে গঙ্গাবংশ এবং পরে গজপতি রাজারা এই উৎসবকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলেন। তারা দেবতাদের জন্য বিশেষ চপ নির্মাণ, সুর ও নৃত্যের ব্যবস্থা এবং নারেন্দ্র পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধন করেন। আজও এই প্রথা আগের মতোই নিষ্ঠা ও ভক্তিতে পালিত হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং ওড়িশার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।

এবছর এই তিথি কবে?

অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয়ে ২১ দিন ধরে চলার পর বাহার চন্দনের শেষ দিনে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে মন্দির চত্বরে নরেন্দ্র তীর্থ সরোবরে নিয়ে আসা হয়। এর পরের ২১ দিন ধরে চলে ভিতর চন্দন। এই সময়ের মধ্যে অমাবস্যা, পূর্ণিমা, ষষ্ঠী ও একাদশী তিথি পালন করা হয়। ১১ জুন এই পর্ব সমাপ্ত হবে স্নানযাত্রার মাধ্যমে।

নবদ্বীপে চন্দনযাত্রা

পূর্বে বৈশাখী পূর্ণিমায় নবদ্বীপের অধিকাংশ ঠাকুরবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় চন্দন যাত্রা উৎসব। চন্দন মাখিয়ে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হত গঙ্গার ঘাটে। মনিপুরের অনুমহাপ্রভুর মন্দিরে, বড়ো আখড়ায়, ছোট আখড়ায়, কদমতলা ঘাটে মাধব দাস বাবাজির আশ্রামে এবং বাগচীপাড়ায় মন্টু বাবাজি ও মৌনিবাবার আশ্রামে চন্দন যাত্রা মহাসমারহে হতো। বর্তমানে একমাত্র সমাজবাড়িতে এর প্রচলন আছে। ভক্তদের মতে সমাজবাড়ি তে এর প্রচলন করেন ললিতা সখী! ব্রজলীলা অনুসারে বৈশাখী ত্রয়োদশী থেকে বুদ্ধ-পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনদিন ব্যাপী মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় চন্দনযাত্রা।

তথ্যসূত্রঃ 

Details of Chandan Yatra

 নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত পৃ. ১৪৩

Archive

Most Popular