প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভারতীয় দেবদেবীর পূজা শুধু আধ্যাত্মিক ভক্তির প্রতীক নয়, এটি সমাজের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তিরও প্রতিচ্ছবি। দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ হলেন সেই মহাশক্তির মূর্তি, যিনি অসুরশক্তিকে বিনাশ করে ধর্ম, ন্যায় ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার শারদীয় দুর্গোৎসব আজ বিশ্বখ্যাত, কিন্তু এই পূজার সূচনা এবং বিশেষ করে মহিষাসুরমর্দিনী রূপের উপাসনা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপের পূজার সূচনা, এর পৌরাণিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করব।
মহিষাসুরমর্দিনী রূপের উত্পত্তি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য-তে, যা চণ্ডী বা দুর্গাসপ্তশতী নামেও পরিচিত। পুরাণ মতে, মহিষাসুর নামে এক অসুর অতি তপস্যার ফলে ব্রহ্মার বর লাভ করে সে দেবতা বা মানুষ কারোর দ্বারাই নিহত হবে না। এই বর পেয়ে সে ক্রমে অহংকারে ভরে উঠে তিনলোকে অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকে। দেবতা ও ঋষিরা তার হাতে পরাস্ত হয়ে পরমেশ্বর শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মার শরণ নেন। তখন সমস্ত দেবতার সম্মিলিত শক্তি থেকে জন্ম নেন এক অতুলনীয় দেবী দুর্গা। দেবতাদের প্রত্যেকে তাঁকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করেন বিষ্ণুর চক্র, শিবের ত্রিশূল, বায়ুর ধনুক, ইন্দ্রের বজ্র ইত্যাদি। সিংহবাহিনী দেবী তখন মহিষাসুরকে রণাঙ্গণে আহ্বান করেন। দীর্ঘ নবরাত্রি যুদ্ধের পর দশম দিনে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেন। সেই থেকেই দেবীর এই রূপ মহিষাসুরমর্দিনী নামে পরিচিত।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতা থেকেই নারীমূর্তির পূজা প্রচলিত ছিল। মাতৃদেবীর প্রতিমা পাওয়া যায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে। আর্য সমাজে অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ প্রাধান্য পেলেও পরে শক্তির পূজা এক নতুন ধারা তৈরি করে। গুপ্ত যুগে (৪র্থ-৬ষ্ঠ শতক) দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি ভাস্কর্যে ও মন্দিরে ক্রমে প্রতিষ্ঠা পায়। ইলোরা, মহাবলীপুরম প্রভৃতি গুহামন্দিরে দেবীর এই রূপ খোদাই করা আছে। দক্ষিণ ভারতেও এই পূজা সমানভাবে প্রচলিত হয়।
বাংলায় দুর্গাপূজার শুরু নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেন পাল রাজাদের আমলে (৮ম-৯ম শতক) শারদীয় পূজা শুরু হয়েছিল, আবার কারও মতে নদীয়া রাজা কংসনারায়ণ ১৬ শতকে জমিদারি ঐশ্বর্য প্রদর্শনের জন্য দুর্গাপূজা প্রচলিত করেন। কিন্তু মহিষাসুরমর্দিনী রূপ বাংলার পূজায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় চণ্ডীপাঠ ও দেবীমাহাত্ম্যর আবৃত্তির মাধ্যমে। দুর্গাপূজার সময় ভোরবেলা মহিষাসুরমর্দিনী নামক আধ্যাত্মিক সংগীত (আকাশবাণী থেকে সম্প্রচারিত) আজও এক অঙ্গ। এর সুর ও পাঠ দেবীর মহিষাসুর বধের কাহিনী গেয়ে ওঠে।
কুমারী পূজা : কন্যাশক্তিকে দেবীর প্রতীক ধরে কুমারী পূজা হয়।
চণ্ডীপাঠ : দেবীমাহাত্ম্য পাঠ অপরিহার্য অংশ।
শিল্পকলায় প্রতিফলন : বাংলার প্রতিমাশিল্পে দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপ সবথেকে প্রধান। দেবী সিংহবাহিনী, হাতে অস্ত্র, পদতলে মহিষাসুর—এই চিত্র বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আজকের সমাজে মহিষাসুরমর্দিনী রূপ একদিকে যেমন ধর্মীয় ভক্তির প্রতীক, অন্যদিকে নারীর আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতার প্রতীক। সাহিত্য, কবিতা, চিত্রকলা থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সবখানেই দেবীর এই রূপ উদযাপিত হয়। বিশেষ করে বাংলায় মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীর মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান শুনে দুর্গোৎসবের সূচনা এ যেন এক অমোঘ সাংস্কৃতিক রীতি। এটি প্রমাণ করে কীভাবে পৌরাণিক কাহিনী ক্রমে জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপের পূজা মূলত এক শাশ্বত সত্যের প্রতীক অসুরশক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির জয়। এর সূচনা পুরাণে হলেও কালক্রমে এটি এক জীবন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলার দুর্গাপূজা আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেলেও, এর কেন্দ্রে রয়েছেন সেই সিংহবাহিনী দেবী, যিনি মহিষাসুরকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজও আমরা দেবীকে প্রণাম করি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসে নয়, বরং এই আশায় আমাদের ভেতরের মহিষাসুররূপী অন্ধকারকে তিনি বিনাশ করবেন, আর সমাজে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।