19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

করসেট স্টেটমেন্ট!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ফ্যাশনের জগতে কিছু পোশাক শুধু পোশাক নয় তারা হয়ে ওঠে সমাজের প্রতিচ্ছবি, প্রতিবাদ, কিংবা ক্ষমতার প্রতীক। “করসেট” ঠিক সেইরকম একটি পোশাক। একদিকে এটি নারীর শরীরকে বাঁধার যন্ত্র বলে সমালোচিত, অন্যদিকে এটি আত্মবিশ্বাস ও সৌন্দর্যের প্রতীক বলেও প্রশংসিত। তবে সাম্প্রতিক কালে করসেট স্টেটমেন্ট (Corset Statement) আর কেবল ফ্যাশনের অংশ নয় এটি হয়ে উঠেছে নারীর আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা, এবং ঐতিহ্যের সীমা ভাঙার এক ভাষা। আজকের এই প্রবন্ধে আমরা করসেটের ইতিহাস থেকে শুরু করে, আধুনিক করসেট ফ্যাশন, এর সামাজিক-নারীবাদী অর্থ, শরীরচেতনা ও শিল্পকলার প্রভাব সব দিক বিশদে বিশ্লেষণ করব।


ইউরোপের রাজসভা থেকে নারীর দৈনন্দিনে

করসেটের জন্ম ইউরোপে, প্রায় ষোড়শ শতাব্দীতে। তখন এটি ছিল এক রাজকীয় পোশাক, যা রাজরানী ও সম্ভ্রান্ত নারীরা পরতেন শরীরের গঠন আদর্শ দেখানোর জন্য পেট চ্যাপ্টা, কোমর সরু, বক্ষ উঁচু। কুইন এলিজাবেথ প্রথম থেকে শুরু করে মেরি অ্যান্টোয়ানেট সবাই করসেটের মাধ্যমে তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন করতেন। ১৯শ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে করসেট নারীর শালীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সমাজ বলত একজন ভদ্র নারী মানেই সে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সোজা হয়ে হাঁটে, এবং কখনওই স্বাভাবিকভাবে দম নেয় না! অর্থাৎ করসেট কেবল পোশাক নয় এটি ছিল নারীর ওপর আরোপিত সামাজিক শৃঙ্খলার এক যন্ত্র। যখন করসেট নারীর শরীরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল, তখনই সেটি তাকে অসুবিধায় ফেলেছিল—শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা ইত্যাদি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। নারীবাদীরা তাই করসেটকে বলতেন A cage for women’s bodies. তবে, এর উল্টো দিকও আছে। অনেকে বলেন, করসেটই নারীদের প্রথম আর্মার একটি রক্ষাকবচ, যা তাদের শক্ত ও গর্বিত করে তুলত। তাই করসেটের ইতিহাস একই সঙ্গে দমন ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।


প্রথম বিদ্রোহ: ২০শ শতকের সূচনায়

২০শ শতকের প্রথমার্ধে, নারীরা করসেট খুলে ফেললেন। কারণ তাঁরা ভোটাধিকার, স্বাধীনতা, চাকরি সবকিছুর জন্য লড়ছিলেন। করসেট তখন আর ফ্যাশন নয়, বরং পুরনো সমাজব্যবস্থার প্রতীক। কোকো শ্যানেল বলেন, I want women to breathe and feel free. এই বাক্য থেকেই করসেটের শৃঙ্খল ভাঙার সূচনা।


পুনর্জাগরণ: ১৯৮০ থেকে ২০২০

মজার ব্যাপার হলো যা একসময় দমন ও নিপীড়নের প্রতীক ছিল, সেটিই পরে ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে ফিরে আসে। ১৯৮০ সালে মাদোনার বিখ্যাত কনসার্টে জঁ-পল গল্টিয়ের ডিজাইন করা করসেট পরা সেই চিত্রই ইতিহাস। সেটি আর নারীর শরীর বাঁধার জন্য নয়, বরং দেখানোর জন্য আমিই আমার শরীরের মালিক। এরপর থেকে করসেট নতুন অর্থ পেল ফ্যাশনের স্টেটমেন্ট। রিহানা, বিয়ন্সে, কিম কার্দাশিয়ান থেকে দীপিকা পাড়ুকোন সকলেই করসেটকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।


করসেট এখন আর পোশাক নয়

বর্তমানে করসেট স্টেটমেন্ট মানে হলো সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের শরীরকে গ্রহণ করার ঘোষণা। এটি সমাজের তৈরি সৌন্দর্যের মাপকাঠিকে চ্যালেঞ্জ করে বলে

আমার শরীর যেমন, তেমনই সুন্দর।

করসেট এখন পরা হয় জ্যাকেটের ওপর, শাড়ির সঙ্গে, এমনকি পুরুষ মডেলরাও ফ্যাশন শো-তে এটি ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ এটি এখন লিঙ্গনিরপেক্ষ এক আত্মপ্রকাশের প্রতীক।


শরীরচেতনা ও করসেট সংস্কৃতি

সোশ্যাল মিডিয়া যুগে পারফেক্ট বডি ধারণা আরও তীব্র হয়েছে। আওয়ারগ্লাস ফিগার মানে সরু কোমর, যা করসেট দিয়েই তৈরি হয়।
তবে, মনোবিজ্ঞানীরা বলেন এই অতিরিক্ত চাপ নারীর আত্মমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখন অনেকেই waist trainer নামে করসেট ব্যবহার করেন শরীর গঠন করার জন্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরের পেশি দুর্বল করে দিতে পারে। তাই করসেটকে ফ্যাশন হিসেবে দেখা উচিত, জীবনধারা হিসেবে নয়।


ভারতীয় ও বাংলা প্রেক্ষাপটে করসেট

ভারতে ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা কখনও পশ্চিমা করসেট পরেননি, তবে চোলি বা ব্লাউজ কিছুটা একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো বক্ষগঠনকে সুশৃঙ্খল দেখানো। আজকের দিনে ভারতীয় ডিজাইনাররা করসেটকে দেশীয় ধাঁচে উপস্থাপন করছেন শাড়ির সঙ্গে করসেট ব্লাউজ, লেহেঙ্গার ওপর করসেট টপ ইত্যাদি।

বাংলা ফ্যাশনে করসেট

কলকাতার ফ্যাশন হাউসগুলো এখন করসেটকে আঞ্চলিক রঙে নতুন করে গড়ছে। যেমন

  • করসেটের ওপর জামদানি নকশা,

  • টাসেল বা সিকুইন দিয়ে সাজানো করসেট ব্লাউজ,

  • বেনারসি শাড়ির সঙ্গে করসেট বডিস সব মিলিয়ে এক মিশ্র ফ্যাশন চেতনা।

এটি নারীর ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।


করসেট স্টেটমেন্টের মনস্তাত্ত্বিক অর্থ

একজন নারী যখন করসেট পরে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়ান, তখন তা কেবল তাঁর শরীরের নয়, মনেরও শক্তি প্রকাশ করে। করসেট তাঁকে শৃঙ্খলিত করে না, বরং তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। করসেট এখন শরীররাজনীতির অংশ। এটি জানায়—নারীর শরীরের ওপর তারই অধিকার। সমাজ বা মিডিয়া নয়, নারী নিজেই ঠিক করবেন কীভাবে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করবেন।


করসেট শিল্প, সিনেমা ও সংস্কৃতিতে


সিনেমায় করসেটের প্রতীক

  • Titanic ছবিতে রোজের করসেট পরার দৃশ্যটি নিপীড়নের প্রতীক।

  • আবার Moulin Rouge-এ নিকোল কিডম্যানের করসেট একেবারে বিপরীত—স্বাধীনতার রূপ।

  • বলিউডেও “বাজিরাও মস্তানি” বা “পদ্মাবত”-এর করসেট ব্লাউজ নন্দনতত্ত্ব ও নারীত্বের প্রতীক।

শিল্পে করসেটের রূপ

ফ্যাশন ফটোগ্রাফি ও পেইন্টিং-এ করসেটকে ব্যবহৃত হয় নারীসত্তার অভিব্যক্তি হিসেবে। কোনো কোনো শিল্পী করসেটকে “দেহ ও সমাজের সংঘাতের প্রতীক” হিসেবেও ব্যবহার করেন।


করসেট: বাধন না মুক্তি?

দিকইতিবাচক দিকনেতিবাচক দিক
ফ্যাশনশরীরের আকৃতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেঅতিরিক্ত নির্ভরতা শারীরিক ক্ষতি করতে পারে
সমাজচেতনাআত্মবিশ্বাস ও নারীর স্বাধীনতার প্রতীকসৌন্দর্যের মাপকাঠি তৈরি করে চাপ সৃষ্টি করে
সংস্কৃতিঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণপশ্চিমা অনুকরণের অভিযোগ
মানসিক প্রভাবআত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে“পারফেক্ট বডি” ধারণা জোরদার করে

ভবিষ্যতের ফ্যাশনে করসেট

বর্তমানে ডিজাইনাররা করসেট তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব কাপড় দিয়ে জুট, কটন, ব্যাম্বু ফ্যাব্রিক ইত্যাদি। এছাড়া ফ্লেক্সিবল ফিতেয় তৈরি হচ্ছে নতুন “ইকো-ফ্রেন্ডলি করসেট”, যা শরীরকে চাপ না দিয়ে স্টাইল বজায় রাখে। আজকের যুগে করসেট আর শুধু নারীর পোশাক নয়। পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার ও নন-বাইনারি ব্যক্তিরাও করসেট পরছেন আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। এটাই করসেটের প্রকৃত মুক্তি। করসেট আজ আর নিপীড়নের প্রতীক নয়, বরং এক প্রজন্মের ঘোষণা

আমি আমার দেহকে ভালোবাসি, আমি যেভাবে আছি সেভাবেই সুন্দর।

এখন করসেট স্টেটমেন্ট মানে

  • নিজেকে গ্রহণ করা,

  • নিজের নিয়মে বাঁচা,

  • সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে নতুন করে লেখা।

করসেট তাই ফ্যাশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আত্মপরিচয়ের এক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

করসেটের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক আসলে নারীসত্তার এক এক পর্যায় বাধন থেকে মুক্তি, নিপীড়ন থেকে আত্মবিশ্বাস, লজ্জা থেকে গর্ব।
আজকের করসেট স্টেটমেন্ট তাই কেবল পোশাকের ট্রেন্ড নয়, এটি সমাজের এক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। যখন একজন নারী নিজের শরীরের বাঁক, আকার, বা গঠন নিয়ে গর্বিত হন, এবং তাতে লুকোনোর কিছুই নেই বলে বিশ্বাস করেন তখনই করসেট হয়ে ওঠে এক প্রতীক, এক গর্ব, এক স্বাধীনতা।

Archive

Most Popular