প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সমাজ, জীবনযাত্রা এবং সম্পর্কের ধরণ। আগে পরিবার মানেই ছিল এক কঠোর নিয়মের কাঠামো—বাবা-মা সিদ্ধান্ত নিতেন, সন্তান সেই নির্দেশ মেনে চলত। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের পারিবারিক সম্পর্ক অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সমানুভূতিশীল। এই পরিবর্তনের ফলেই এখন একটি নতুন ধারণা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে—রিভার্স পেরেন্টিং। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও পারিবারিক গবেষণায় এই শব্দটি এখন বেশ আলোচিত। অনেক বাবা-মা বুঝতে পারছেন, সন্তানকে বড় করার সময় কখনও কখনও সন্তানদের কাছ থেকেও শেখার অনেক কিছু আছে। আর এই পারস্পরিক শেখা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ককেই বলা হচ্ছে রিভার্স পেরেন্টিং।
রিভার্স পেরেন্টিং বলতে বোঝায় এমন এক পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে সন্তান শুধু শেখে না, বরং বাবা-মাকেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। বিশেষ করে প্রযুক্তি, আধুনিক চিন্তাধারা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ—এসব ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্ম অনেক সময় তাদের অভিভাবকদের পথ দেখায়। আগে যেখানে বাবা-মা ছিলেন শুধুই নির্দেশদাতা, এখন অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরাও হয়ে উঠছে পরিবারের ‘গাইড’। এতে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া।
আজকের ডিজিটাল যুগে এই ধারণা আরও বেশি স্পষ্ট। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার—এসব ক্ষেত্রে অনেক বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের কাছ থেকেই শেখেন। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানই বাবা-মাকে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখাচ্ছে, অনলাইন প্রতারণা থেকে সাবধান থাকতে বলছে বা ডিজিটাল নিরাপত্তার নিয়ম বোঝাচ্ছে। এই শেখানোর প্রক্রিয়াই রিভার্স পেরেন্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তবে বিষয়টি শুধু প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক প্রজন্ম মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। স্ট্রেস, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা—এসব নিয়ে কথা বলা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক। অনেক সন্তানই এখন বাবা-মাকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে কাজের চাপ বা সামাজিক প্রত্যাশার কারণে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা করা উচিত নয়। কখনও কখনও সন্তানই বাবা-মাকে বিশ্রাম নিতে, নিজের পছন্দের কাজ করতে বা কাউন্সেলিং নেওয়ার পরামর্শ দেয়। এই ধরনের মানসিক সহমর্মিতাও রিভার্স পেরেন্টিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পরিবারে এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় দিক হল পারস্পরিক সম্মান। আগে অনেক পরিবারে সন্তানদের মতামতকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হত না। কিন্তু এখন অনেক বাবা-মা বুঝতে পারছেন যে সন্তানদের নিজস্ব চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সন্তানদের মতামতও বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে পরিবারে তৈরি হচ্ছে একটি স্বাস্থ্যকর আলোচনা ও বোঝাপড়ার পরিবেশ।
তবে রিভার্স পেরেন্টিং মানে এই নয় যে বাবা-মার ভূমিকা কমে যাচ্ছে। বরং সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে। বাবা-মা এখনও সন্তানদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা শিখছেন নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে নতুন কিছু গ্রহণ করতে। এই পারস্পরিক শেখা-শেখির সম্পর্কই পরিবারকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরণের সম্পর্ক শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। যখন সন্তান বুঝতে পারে যে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন সে নিজেকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করে। এতে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং সে আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। পাশাপাশি বাবা-মাও সন্তানদের মানসিক জগতকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
তবে এই পদ্ধতির কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। কখনও কখনও অতিরিক্ত স্বাধীনতা বা ভূমিকার অস্পষ্টতা পরিবারে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, রিভার্স পেরেন্টিং সফল করতে হলে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। বাবা-মাকে যেমন সন্তানদের কথা শুনতে হবে, তেমনি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তও জানাতে হবে।
ভারতীয় সমাজে এই ধারণা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে পরিবারগুলিতে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, প্রযুক্তি কিংবা জীবনযাত্রার নানা বিষয়ে দুই প্রজন্মের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে। এতে পারিবারিক সম্পর্ক আরও গভীর ও আন্তরিক হয়ে উঠছে। রিভার্স পেরেন্টিং হল পারিবারিক সম্পর্কের একটি আধুনিক রূপ। এখানে শেখার প্রবাহ একমুখী নয়, বরং দুই দিক থেকেই চলতে থাকে। সন্তান যেমন বাবা-মার কাছ থেকে জীবনবোধ শেখে, তেমনি বাবা-মাও নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে শেখেন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পথ। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কও বদলাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা ও জীবনদর্শন। রিভার্স পেরেন্টিং তারই একটি উদাহরণ যেখানে ভালোবাসা, সম্মান এবং শেখার সম্পর্ক দু’দিক থেকেই সমানভাবে প্রবাহিত হয়।