স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
রাতের ঘুম মানুষের শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনের ক্লান্তি দূর করা, শরীরকে নতুন করে শক্তি দেওয়া এবং মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য ভালো ঘুমের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার নানা অভ্যাসের কারণে অনেকের ঘুমের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। তার মধ্যে একটি সাধারণ অভ্যাস হলো আলো জ্বেলে ঘুমানো। অনেকেই মনে করেন, সামান্য আলো জ্বালিয়ে ঘুমালে কোনও সমস্যা নেই। কেউ আবার অন্ধকারে ঘুমোতে অস্বস্তি বোধ করেন বলে নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস অজান্তেই শরীরের জন্য নানা সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই প্রাকৃতিক ঘড়ি দিন ও রাতের আলো–অন্ধকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। দিনের আলো শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং রাতের অন্ধকার শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে। যখন আমরা অন্ধকারে ঘুমাই, তখন শরীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত হয়, যার নাম মেলাটোনিন। এই হরমোন ঘুম নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং শরীরকে বিশ্রামের সংকেত দেয়।
কিন্তু যদি ঘুমের সময় ঘরে আলো জ্বলে থাকে, তাহলে শরীর সেই অন্ধকারের সংকেত পায় না। ফলে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর ফলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে এবং শরীর ঠিকভাবে বিশ্রাম পায় না। অনেক সময় দেখা যায়, আলো জ্বেলে ঘুমালে ঘুম ভেঙে যায় বারবার অথবা গভীর ঘুম হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস থাকলে তার প্রভাব শরীরের ওপর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। পর্যাপ্ত এবং গভীর ঘুম না হলে ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং বিরক্তি বাড়তে পারে। অনেক সময় সকালে ঘুম থেকে উঠেও শরীর ফ্রেশ লাগে না। কাজের ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
আলো জ্বেলে ঘুমানোর আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে চোখের ওপর। ঘুমের সময় আমাদের চোখ বন্ধ থাকলেও আশপাশের আলো পুরোপুরি এড়ানো যায় না। দীর্ঘ সময় ধরে আলোর উপস্থিতি চোখের স্বাভাবিক বিশ্রামের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে চোখে ক্লান্তি বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।
শুধু তাই নয়, অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে রাতে আলোতে থাকার ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়ার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস থাকলে শরীরের ওজন বৃদ্ধি বা বিপাকজনিত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবুও অন্ধকারে ঘুমানোর অভ্যাসকে স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়।
এখন প্রশ্ন হল, যারা একেবারেই অন্ধকারে ঘুমোতে পারেন না, তাদের কী করা উচিত? অনেকেই ছোটবেলা থেকে নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে ঘুমানোর অভ্যাসে অভ্যস্ত। হঠাৎ করে পুরো অন্ধকারে ঘুমোতে গেলে অস্বস্তি হতে পারে। এই ক্ষেত্রে খুব হালকা বা নরম আলো ব্যবহার করা যেতে পারে, যা সরাসরি চোখের সামনে না পড়ে। আলো যেন খুব উজ্জ্বল না হয়, সেটাও খেয়াল রাখা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন, টিভি বা ল্যাপটপের স্ক্রিন ব্যবহার কমানো। এই সব ডিভাইসের আলোও শরীরের ঘুমের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ঘুমানোর অন্তত আধঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকলে ঘুমের মান ভালো হতে পারে।
শোবার ঘরের পরিবেশও ভালো ঘুমের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘর যেন শান্ত, আরামদায়ক এবং অল্প আলোযুক্ত হয়, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। অনেক সময় ভারী পর্দা ব্যবহার করলে বাইরের আলো ঘরে ঢুকতে পারে না, ফলে ঘর আরও অন্ধকার থাকে এবং ঘুমও ভালো হয়।
আলো জ্বেলে ঘুমানো হয়তো অনেকের কাছে ছোট একটি অভ্যাস বলে মনে হয়, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর পড়তে পারে। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ভালো ঘুম অত্যন্ত জরুরি, আর সেই ঘুমের জন্য অন্ধকার পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। তাই সম্ভব হলে ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করা ভালো। এতে শুধু ঘুমের মানই উন্নত হবে না, বরং শরীর ও মনও থাকবে অনেক বেশি সতেজ ও সুস্থ।