11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাচ্চাদের স্ক্রিন টাইম কতটা হওয়া উচিত? বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



বর্তমান ডিজিটাল যুগে বড়দের মতোই বাচ্চাদের জীবনেও স্ক্রিন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, টেলিভিশন, ল্যাপটপ সব মিলিয়ে যেন এক নতুন জগৎ তৈরি হয়েছে, যেখানে পড়াশোনা, বিনোদন, এমনকি বন্ধুত্বও অনেক সময় স্ক্রিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে অনলাইন ক্লাসের পর থেকে শিশুদের স্ক্রিন নির্ভরতা আরও বেড়েছে। অনেক বাবা-মা মনে করেন, বাচ্চা যদি মোবাইল বা টিভিতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে তারা নিশ্চিন্তে নিজেদের কাজ করতে পারেন। কিন্তু এই ‘সহজ সমাধান’-এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের বড় সমস্যা।

শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশের জন্য বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটালে এই অভিজ্ঞতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে কম বয়সে। কারণ এই সময়ে তাদের মস্তিষ্ক দ্রুত শেখে এবং বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগই তাদের শেখার প্রধান মাধ্যম। বিশ্বজুড়ে শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্ক্রিন টাইম নিয়ে স্পষ্ট কিছু নির্দেশিকা দিয়েছেন। দুই বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন একেবারেই না দেওয়াই ভালো, কারণ এই সময়ে তাদের চোখ, মস্তিষ্ক এবং আচরণগত দক্ষতা গড়ে ওঠে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা হয়েছে, তাও যেন তা হয় মানসম্মত ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট। ৬ বছর বা তার বেশি বয়সের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া এবং স্ক্রিন ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে সবচেয়ে সাধারণ যে সমস্যা দেখা যায়, তা হল চোখের সমস্যা। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, জ্বালা, মাথাব্যথা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। এর পাশাপাশি ঘুমের ব্যাঘাতও একটি বড় বিষয়। স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (blue light) মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে বাচ্চারা দেরিতে ঘুমোতে যায় এবং ঘুমের গুণমানও খারাপ হয়। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও আচরণগত দিক থেকেও এর প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে বাচ্চাদের মনোযোগের ঘাটতি, বিরক্তি, রাগ, এমনকি সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তারা বাস্তব জীবনের খেলাধুলা বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে তাদের সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যায়।

তাহলে কি স্ক্রিন একেবারেই নিষিদ্ধ করা উচিত? বাস্তবতা হল, আজকের দিনে তা সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন সঠিক ব্যবহার শেখানো। বাবা-মায়েদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাচ্চাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম ঠিক করে দেওয়া দরকার এবং তা মেনে চলা উচিত। দ্বিতীয়ত, কী ধরনের কনটেন্ট তারা দেখছে, তা নজরে রাখা জরুরি। সহিংস বা অনুপযুক্ত কনটেন্ট এড়িয়ে শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল কনটেন্ট বেছে নেওয়া উচিত। এছাড়া, ‘স্ক্রিন-ফ্রি টাইম’ তৈরি করা খুবই জরুরি। যেমন খাওয়ার সময়, ঘুমানোর আগে বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় স্ক্রিন ব্যবহার না করা। এতে বাচ্চারা বুঝতে শেখে, জীবনের সব মুহূর্তই স্ক্রিন নির্ভর নয়। পরিবারের সবাই যদি এই নিয়ম মেনে চলে, তাহলে বাচ্চাদের জন্য তা অনুসরণ করা সহজ হয়। বিকল্প কার্যকলাপের দিকে উৎসাহ দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়া, আঁকাআঁকি, গল্প শোনা, খেলাধুলা—এইসব কার্যকলাপ বাচ্চাদের সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং তাদের মন ভালো রাখে। বিশেষ করে বাইরে খেলাধুলা তাদের শারীরিক বিকাশের জন্য খুবই উপকারী। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা—এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাদের শৈশবকে সমৃদ্ধ করে।

অনেক সময় দেখা যায়, বাচ্চারা কান্না বা জেদ করলে তাদের শান্ত করতে মোবাইল দেওয়া হয়। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে তাদের স্ক্রিনের প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে। তাই এই ধরনের পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে অন্যভাবে তাদের মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করা উচিত। সবশেষে বলা যায়, স্ক্রিন আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর সঠিক ব্যবহারই আসল চাবিকাঠি। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ তাদের ভবিষ্যৎ বিকাশ এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে স্ক্রিনকে শত্রু নয়, বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। শিশুদের সুস্থ, স্বাভাবিক এবং আনন্দময় শৈশব গড়ে তুলতে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে দায়িত্বও।

Archive

Most Popular