25th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পুজোর ছুটির অতিরিক্ত খরচের পর বাজেট সামলাবেন কীভাবে?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


পুজো মানেই আনন্দ। নতুন জামাকাপড়, গয়না, সাজগোজ, পরিবারের জন্য উপহার, বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, প্যান্ডেল দেখা, বাইরে ঘোরা, দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া—বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই কয়েকটি দিনে খরচটা যে একটু বাড়বে, তা স্বাভাবিক। বরং পুজোর আনন্দের একটা অংশ যেন এই খরচের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। কিন্তু উৎসবের আলো নিভে গিয়ে যখন আবার চেনা কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে হয়, তখন মোবাইলের ব্যাঙ্কিং অ্যাপ খুলে অনেকেরই মনে হতে পারে, ‘এত টাকা গেল কোথায়?’পুজোর পরে তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত আতঙ্কিত না হয়ে হিসেবটা বোঝা। উৎসবের সময়ে কত খরচ হয়েছে, কোন খাতে হয়েছে, আর কতটা প্রয়োজনীয় ছিল—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করলেই ছবিটা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। শুধু মোট টাকার অঙ্ক দেখে ভয় পাওয়ার বদলে খরচকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করুন। পোশাক, যাতায়াত, খাবার, উপহার, বেড়ানো, বাড়ির পুজোর খরচ, অনলাইন কেনাকাটা—সব আলাদা করে দেখলে কোথায় বেশি খরচ হয়েছে তা সহজেই ধরা পড়বে।

অনেক সময় দেখা যায়, বড় কোনও একটি কেনাকাটার চেয়ে ছোট ছোট খরচ মিলিয়েই মোট অঙ্কটা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। প্যান্ডেলের সামনে জলখাবার, কফি, রাস্তার খাবার, ক্যাব ভাড়া, অনলাইন অর্ডার, হঠাৎ পছন্দ হয়ে যাওয়া কোনও ছোটখাটো জিনিস—প্রতিটি খরচ আলাদা করে খুব বড় মনে হয় না। কিন্তু কয়েকদিন ধরে একইভাবে চললে তার প্রভাব মাসের বাজেটে যথেষ্ট পড়ে।তাই পুজোর পরে ‘কোথায় ভুল হল’ ভাবার চেয়ে ‘এখন কীভাবে সামলাব’ ভাবাটা বেশি জরুরি। যদি কিছুটা বেশি খরচ হয়েই থাকে, পরের মাসে নিজের প্রয়োজনীয় খরচের একটি পরিষ্কার তালিকা তৈরি করুন। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, বাজার, ওষুধ বা অন্যান্য আবশ্যিক খরচ আগে। তার পরে বিনোদন, বাইরে খাওয়া, কেনাকাটা বা অন্যান্য ইচ্ছাধীন খরচের জন্য কতটা রাখা সম্ভব, সেটি ঠিক করুন।

পুজোর পরে একেবারে সব আনন্দ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তও সবসময় কার্যকর নয়। ‘এই মাসে আর কোথাও খাব না’, ‘কিছু কিনব না’, ‘একেবারেই বাইরে যাব না’—এই ধরনের অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম কয়েকদিন পরেই ভেঙে যেতে পারে। বরং নিজের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সীমা তৈরি করুন। যেমন সপ্তাহে একদিন বাইরে খাওয়া হলে সেটিকে একদিনেই সীমাবদ্ধ রাখা, অপ্রয়োজনীয় অনলাইন কেনাকাটা কিছুদিন বন্ধ রাখা কিংবা কাছাকাছি জায়গায় কম খরচে সময় কাটানো।বিশেষ করে পুজোর পর অনলাইন শপিংয়ের দিকে একটু নজর দেওয়া দরকার। উৎসবের সময়ে অনেকেই নানা অফার দেখে এমন জিনিস কিনে ফেলেন, যা আসলে খুব প্রয়োজনীয় নয়। পুজো শেষ হওয়ার পর গৃহস্থালির জিনিস, পোশাক, প্রসাধনী বা অন্য কেনাকাটার তালিকা একবার দেখে নিন। কোনও জিনিস ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকলে এবং সেটি সত্যিই প্রয়োজন না হলে সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিন। শুধু ‘অফার ছিল’ বলে কেনা জিনিসকে প্রয়োজনীয় খরচ হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনও মানে নেই।

ক্রেডিট কার্ড বা কিস্তিতে কেনাকাটা করলে বিষয়টি আরও সচেতনভাবে দেখা দরকার। উৎসবের সময়ে একটি বড় অঙ্ক একসঙ্গে না দিয়ে মাসিক কিস্তিতে নেওয়া সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু একাধিক কিস্তি একসঙ্গে চললে পরবর্তী কয়েক মাসের আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ আগেই চলে যায়। তাই পুজোর পরে নিজের চলতি কিস্তি, নির্ধারিত বিল এবং অন্যান্য আর্থিক দায় এক জায়গায় লিখে রাখুন। কোন তারিখে কত টাকা দিতে হবে, সেটি পরিষ্কার থাকলে হঠাৎ চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে।যদি পুজোর খরচ মেটাতে সঞ্চয় থেকে টাকা ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী কয়েক মাসে সেই সঞ্চয়টি ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করুন। এক মাসেই পুরো ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত ছোট অঙ্ক আলাদা করে রাখুন। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে সঞ্চয়ের অভ্যাসটিও সহজ হয়। উৎসবের আনন্দের জন্য সঞ্চয় ভাঙা অপরাধ নয়; কিন্তু সেই সঞ্চয় আবার তৈরি করার দায়িত্বটিও নিজের কাছেই রাখতে হবে।

পুজোর পর বাজেট সামলানোর ক্ষেত্রে ‘নো-স্পেন্ড ডে’ বা অপ্রয়োজনীয় খরচহীন দিনের অভ্যাসও কাজে লাগতে পারে। সপ্তাহে কয়েকটি দিন ঠিক করে নিন, যেদিন প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া অতিরিক্ত কোনও টাকা খরচ করবেন না। বাড়ির খাবার, নিজের সঙ্গে থাকা জল, গণপরিবহণ ব্যবহার—এই ছোট অভ্যাসগুলি কয়েক সপ্তাহ চালিয়ে গেলে মোট খরচে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।তবে বাজেট কমানোর নামে খাবারের মতো প্রয়োজনীয় খাতে অযথা কাটছাঁট করা উচিত নয়। বাইরে খাওয়া কমানো যেতে পারে, কিন্তু বাড়ির নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে স্বাস্থ্য, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, জরুরি যাতায়াত বা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় খরচকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে বাদ দেওয়া উচিত নয়।

পুজোর পর বাড়ির বাজারের ক্ষেত্রেও একটু পরিকল্পনা করলে খরচ কমানো যায়। ফ্রিজে কী কী রয়েছে আগে দেখে নিন। তারপর সপ্তাহের বাজারের তালিকা তৈরি করুন। বাড়িতে থাকা জিনিস ব্যবহার না করে নতুন করে একই জিনিস কিনে ফেলা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ায়। বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা তৈরি করা এবং সেই তালিকা মেনে কেনাকাটা করা তাই খুব সাধারণ হলেও কার্যকর অভ্যাস।

উৎসবের সময়ে পাওয়া উপহারগুলিও বাজেট সামলানোর ক্ষেত্রে একটি ছোট সুবিধা এনে দিতে পারে। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া ব্যবহারযোগ্য জিনিস থাকলে সেগুলিকে পরিকল্পনা করে ব্যবহার করুন। নতুন করে একই ধরনের জিনিস কেনার প্রয়োজন নেই। পুজোয় নতুন পোশাক হয়েছে বলে পরের মাসেই আবার পোশাক কেনার দরকার নেই। বরং নতুন পোশাকগুলিকে অন্যভাবে সাজিয়ে পরার চেষ্টা করা যায়। উৎসবের ফ্যাশনকে দৈনন্দিন পোশাকে ব্যবহার করার মধ্যেও এক ধরনের সৃজনশীলতা আছে।

পুজোর পরে বেড়ানোর পরিকল্পনা থাকলে সেখানেও হিসেব জরুরি। উৎসবের কয়েকদিনের খরচের পর আবার বড়সড় ভ্রমণ করলে বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ভ্রমণ বাতিল করতেই হবে এমন নয়; বরং ছোট, কাছাকাছি এবং কম খরচের একদিনের বেড়ানো বেছে নেওয়া যায়। আনন্দের জন্য সবসময় বড় বাজেট প্রয়োজন হয় না।

একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—পুজোর খরচ নিয়ে অপরাধবোধে ভোগা কোনও সমাধান নয়। উৎসব বছরে একবার আসে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বহুদিন পরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, নিজের জন্য নতুন কিছু কেনা বা প্রিয় মানুষকে উপহার দেওয়া—এসবেরও মূল্য আছে। বাজেটের উদ্দেশ্য আনন্দ বন্ধ করা নয়; বরং আনন্দের সঙ্গে আর্থিক দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি করা।

আগামী বছরের পুজোর জন্য এখন থেকেই একটি ছোট সঞ্চয় শুরু করা যেতে পারে। পুজোর সম্ভাব্য খরচকে বারো মাসে ভাগ করে দেখুন। প্রতি মাসে অল্প অল্প করে একটি আলাদা তহবিলে রাখলে পরের বছর উৎসবের সময় একসঙ্গে বড় অঙ্কের চাপ অনেকটাই কমে যায়। চাইলে পোশাক, উপহার, ভ্রমণ বা বাড়ির পুজোর মতো আলাদা খাতও রাখা যায়। এতে উৎসবের বাজেট আগে থেকেই চোখের সামনে থাকে।

আরও একটি অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে খুব কাজে দেয়—পুজোর পরে নিজের খরচের ধরনটি বিশ্লেষণ করা। শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে তা নয়, কোন খরচটি সত্যিই আনন্দ দিয়েছে এবং কোনটি পরে মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয়। যে খরচের পরে মনে হয়েছে ‘এটা না কিনলেও চলত’, পরের বছর সেটিই প্রথমে বাদ দেওয়ার জায়গা হতে পারে। আর যে খরচটি পরিবারকে সত্যিই আনন্দ দিয়েছে, তার জন্য পরের বছর আগে থেকেই বাজেট রাখা যায়।শিশুদের ক্ষেত্রেও পুজোর পর বাজেটের ধারণা তৈরি করা যায়। উৎসবের সময়ে সবকিছু কিনে দেওয়ার বদলে তাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা যায় কোন জিনিসটি সত্যিই প্রয়োজন এবং কোনটি শুধু মুহূর্তের ইচ্ছা। এতে ছোট থেকেই প্রয়োজন ও ইচ্ছার পার্থক্য বোঝার অভ্যাস তৈরি হয়।

সবশেষে, পুজোর পর বাজেট সামলানোর সবচেয়ে সহজ সূত্র হতে পারে—হিসেব করুন, অগ্রাধিকার ঠিক করুন, কিছুদিন খরচ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং আবার নিয়মিত সঞ্চয়ের ছন্দে ফিরুন। উৎসবের কয়েকটি অতিরিক্ত খরচকে কেন্দ্র করে পুরো মাসকে কঠিন করে তোলার প্রয়োজন নেই। আবার ‘পুজো তো বছরে একবার’ বলে হিসেবহীন খরচকেও স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পুজোর আলো যেমন ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে থেকে ভিতরে ফিরে আসে, তেমনই উৎসবের উচ্ছ্বাসের পর জীবনের হিসেবও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরুক। আনন্দের স্মৃতি থাকুক, নতুন পোশাক থাকুক, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো সময় থাকুক—তার পাশাপাশিই থাকুক একটু পরিকল্পনা, একটু সঞ্চয় আর আগামী দিনের নিশ্চিন্ত থাকার প্রস্তুতি।কারণ ভালো বাজেট মানে আনন্দ কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং আজকের আনন্দকে এমনভাবে উপভোগ করা, যাতে আগামী দিনের প্রয়োজনের সময়ও নিজের হাতে থাকে নিশ্চিন্তির জায়গা।

Archive

Most Popular