প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
স্কুলে পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক কার্যকলাপের জন্য শিশুদের পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টির প্রয়োজন। তাই স্কুল টিফিন শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং তাদের সারাদিনের পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় টিফিনে প্রতিদিন একই ধরনের খাবার দেওয়া হয়, আবার কখনও চিপস, বিস্কুট বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর নির্ভর করা হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, সামান্য পরিকল্পনা করলেই শিশুদের জন্য সুস্বাদু, বৈচিত্র্যময় এবং পুষ্টিকর টিফিন তৈরি করা সম্ভব।
একটি আদর্শ স্কুল টিফিনে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন, খনিজ এবং আঁশের সুষম সমন্বয় থাকা উচিত। কার্বোহাইড্রেট শিশুকে শক্তি জোগায়, প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি ও পেশি গঠনে সাহায্য করে, আর ফল ও শাকসবজি ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণ করে। তাই শুধু একটি খাবার নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর উপাদান রাখাই ভালো।
টিফিনের জন্য রুটি বা হোল হুইট ব্রেড দিয়ে তৈরি সবজি স্যান্ডউইচ, সবজি পরোটা, রুটি-রোল, সবজি দিয়ে উপমা, ইডলি, চিঁড়ের পোলাও বা সবজি-খিচুড়ি ভালো বিকল্প হতে পারে। এগুলির সঙ্গে ডিম, পনির, সয়াবিন, ছোলা, ডাল বা মুরগির মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান যোগ করলে খাবারের পুষ্টিমান আরও বেড়ে যায়।
ডিম শিশুদের জন্য একটি সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাবার। সেদ্ধ ডিম, ডিমের অমলেট বা ডিম দিয়ে রুটি রোল টিফিনে দেওয়া যেতে পারে। নিরামিষভোজী শিশুদের জন্য পনির, টোফু, সেদ্ধ ছোলা, রাজমা বা অঙ্কুরিত মুগ ডালও ভালো প্রোটিনের উৎস। প্রতিদিন একই খাবার না দিয়ে পরিবর্তন আনলে শিশুর খাওয়ার আগ্রহও বাড়ে।
টিফিনে একটি মৌসুমি ফল রাখা ভালো অভ্যাস। আপেল, কলা, পেয়ারা, কমলা, পেঁপে, আঙুর বা তরমুজের মতো ফল শিশুদের ভিটামিন, খনিজ এবং আঁশ সরবরাহ করে। ফল ছোট ছোট টুকরো করে দিলে খেতে সুবিধা হয়। তবে কাটা ফল দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই পরিষ্কার ও বায়ুরোধী পাত্রে রাখা উচিত।
দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারও গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্কুলের নিয়মে অনুমতি থাকে, তাহলে টক দই বা ঘরে তৈরি দই ছোট পাত্রে দেওয়া যেতে পারে। এটি ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে গরমের সময় খাবার যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
অনেক শিশুই টিফিনে চকলেট, প্যাকেটজাত জুস, সফট ড্রিংকস বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার পছন্দ করে। এগুলি মাঝে মাঝে খাওয়া গেলেও প্রতিদিনের টিফিনে না রাখাই ভালো। কারণ এতে অতিরিক্ত চিনি ও কম পুষ্টি থাকে। একইভাবে চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা অতিরিক্ত নোনতা প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়াও স্বাস্থ্যকর নয়।
টিফিনের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। খুব বেশি খাবার দিলে শিশু শেষ করতে পারে না, আবার খুব কম দিলে ক্ষুধার্ত থাকতে পারে। তাই শিশুর বয়স, ক্ষুধা এবং স্কুলে থাকার সময় অনুযায়ী টিফিনের পরিমাণ ঠিক করা উচিত। টিফিন এমন হওয়া উচিত, যা সহজে খাওয়া যায় এবং খুব বেশি সময় না লাগে।
পানীয়ের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো পানীয় হলো সাধারণ জল। তাই প্রতিদিন পরিষ্কার জলের বোতল সঙ্গে দিতে ভুলবেন না। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে জল পান করার অভ্যাস ছোট থেকেই গড়ে তোলা উচিত।
খাবার তৈরির সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। টিফিন বক্স প্রতিদিন ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে ব্যবহার করুন। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব টিফিনে ভরে দিন। বিশেষ করে গরমকালে দ্রুত নষ্ট হওয়া খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।
পুষ্টিবিদদের মতে, শিশুদের সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পরিবারের সবাই স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া। শিশুকে জোর করে নয়, বরং নতুন খাবারের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় করিয়ে দিলে তারা সহজেই তা গ্রহণ করতে শেখে। টিফিনকে রঙিন ও আকর্ষণীয়ভাবে সাজালেও শিশুদের খাওয়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।
স্কুল টিফিন শুধু দিনের একটি খাবার নয়, বরং শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রতিদিনের টিফিনে সুষম পুষ্টি, বৈচিত্র্য এবং পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সামান্য পরিকল্পনা ও যত্নেই শিশুদের জন্য তৈরি করা যায় এমন একটি টিফিন, যা হবে সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং তাদের সারাদিনের প্রাণশক্তির অন্যতম উৎস।