বিনোদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলা সাহিত্য-ভুবনে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নাম সমরেশ বসু। ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর, কলকাতার সংলগ্ন এক মফস্বল অঞ্চলে তাঁর জন্ম। সমাজের বাস্তব জীবন, শ্রমজীবী মানুষের লড়াই, সময়ের আন্দোলন ও ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব এসবই তাঁর সাহিত্যের কেন্দ্রে ছিল। তাঁর লেখায় যেমন ছিল সময়ের প্রতিবাদী স্বর, তেমনই ছিল জীবনের প্রতি অগাধ মমত্ববোধ। ২০২৪ সালে, তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই জন্মশতবর্ষে আমরা নতুন করে উপলব্ধি করি তাঁর সাহিত্যকীর্তির বিশালতা এবং সময়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠা তাঁর চিন্তার ধারা। সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যে এক এমন অধ্যায়ের নাম, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী।
সমরেশ বসুর জীবন ছিল নানা টানাপোড়েনের গল্প। শৈশবেই তিনি বাবাকে হারান এবং অল্প বয়স থেকেই জীবিকার প্রয়োজনে নানা কাজ করতে হয়। শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্ম থেকে শ্রমিক বস্তির অন্ধকার গলি সবই তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতায় জায়গা করে নেয়। পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ ছিল। এই সংস্পর্শ তাঁকে সমাজের নিচুতলার মানুষের যন্ত্রণা ও স্বপ্নের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের মূলে রয়ে যায়। লেখালেখির শুরু হয় ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে। শুরু থেকেই তাঁর গল্প ও উপন্যাসে উঠে আসে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, প্রেম, হতাশা এবং আশার কথা। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং তিনি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
সমরেশ বসুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি উত্তর পুরুষ। এটি একটি গাথা কয়েক প্রজন্মের জীবন, সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক সংকট ও ব্যক্তি-মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের কাহিনি। এই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে এক পরিবার, এক সমাজ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জীবনের মূল স্পন্দন রয়ে যায় অবিকৃত। উত্তর পুরুষ কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি সমগ্র বাংলার সংগ্রামের ইতিহাসও।
কালকূট ছদ্মনামে রচিত এই উপন্যাস সমরেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। এখানে তিনি কুম্ভমেলার পটভূমিতে মানুষের অন্তর্নিহিত বিশ্বাস, কুসংস্কার, দুর্নীতি এবং আধ্যাত্মিক অন্বেষণের জটিল ছবি একসঙ্গে এঁকেছেন। কুম্ভমেলা যেমন একদিকে পবিত্রতার উৎস, তেমনি অন্যদিকে মানবিক লোভ-লালসারও রঙমেলা। সমরেশের লেখনী এখানে অসাধারণ গভীরতা পেয়েছে।
সমরেশ বসুর আরেকটি দিক তাঁর সামাজিক সাহসিকতা। প্রথম প্রতিশ্রুতি একটি নারীর জীবনসংগ্রামের গল্প, যেখানে একটি মেয়ে সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজে নিতে চায়। এই উপন্যাস প্রকাশের সময় যথেষ্ট বিতর্ক হয়, কারণ নারীর যৌনতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন তিনি অকপটে তুলেছিলেন। আজকের দিনে এই উপন্যাস পড়লে বোঝা যায়, সমরেশ কতটা সময়ের আগে ভাবতে পেরেছিলেন।
মহাকাল এক গভীর দার্শনিক উপন্যাস। এখানে তিনি মানুষের অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং সময়ের অব্যাহত প্রবাহকে বিশ্লেষণ করেছেন। এই উপন্যাসে তাঁর লেখনীর গভীরতা ও দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি পাঠককে অভিভূত করে।
সমরেশ বসু সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত নিয়মকানুন ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর লেখায় যৌনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক অবিচারের স্পষ্ট চিত্রায়ন তৎকালীন সমাজে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। শতাব্দীর সন্তান উপন্যাসটি প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং আদালতে তাঁকে লড়তে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তি পান এবং বাংলা সাহিত্য আরও একধাপ সাহসী হয়ে ওঠে। সমরেশ বসু প্রমাণ করেছিলেন যে সাহিত্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের আয়না যেখানে অবলীলায় উঠে আসবে মানুষের যাবতীয় আনন্দ, বেদনা, লালসা ও আকাঙ্ক্ষা।
সমরেশ বসুর সাহিত্য উত্তরাধিকার আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি সমাজের এমন দিকগুলো দেখিয়েছেন, যেগুলো সময়ের পরিবর্তনেও রয়ে গেছে দারিদ্র্য, বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নারীর অবদমিত কণ্ঠস্বর। আজকের দিনেও যখন আমরা সমাজের নানা স্তরে অবিচার দেখি, তখন সমরেশ বসুর সাহিত্য নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের কাছে তাঁর জীবন আর সাহিত্য এক মহামূল্যবান পাঠশালা। সমরেশ বসু দেখিয়েছেন কীভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজকে প্রশ্ন করা যায়, কীভাবে জীবনের গভীরতম সত্যকে নিঃসংকোচে প্রকাশ করা যায়। তাঁর সাহিত্যের শক্তি এই যে, তিনি পাঠকের সামনে এক অনাড়ম্বর, অকৃত্রিম জীবন তুলে ধরেছেন যা যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যের সেই অনন্য শক্তি, যিনি সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরকালীন হয়ে উঠেছেন। তাঁর সাহিত্যে যেমন আছে গভীর বাস্তববোধ, তেমনি আছে মানবিকতার দীপ্তি। জন্মশতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমরা কেবল একজন সাহিত্যিককে নয়, সময়ের অন্তর্দৃষ্টি এবং জীবনের অনন্য বীক্ষণকেও স্মরণ করি। সমরেশ বসু আজও আমাদের সাহস দেন, বেঁচে থাকার, সংগ্রাম করার এবং সত্য বলার প্রেরণা দেন। তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র প্রণতি।
সমরেশ বসুর সাহিত্য উত্তরাধিকার আজও অমলিন। আজকের দিনেও আমরা যখন সামাজিক বৈষম্য, নারীর অধিকারের জন্য সংগ্রাম, শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা দেখি, তখন সমরেশ বসুর লেখা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য যদি মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা নিতান্তই কৃত্রিম হয়ে পড়ে। জীবনের সঙ্গে সংযোগ রেখে, মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে হয় এই শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন। বর্তমান বাংলা সাহিত্যেও তাঁর প্রভাব সুস্পষ্ট। অনেক নতুন লেখক তাঁর পথ অনুসরণ করে সমাজের নানা স্তরের মানুষের গল্প বলছেন।