প্রতিবেদন
সুদেষ্ণা ঘোষ
নববধূকে পালকিতে তোলার ঐতিহ্য ও তার প্রতীকমূলক তাৎপর্য
বাঙালি বিয়েতে পালকি মানেই যেন এক চিরন্তন রোম্যান্স, এক প্রাচীন ঐতিহ্যের নরম ছোঁয়া। আধুনিক গাড়ির শব্দে হারিয়ে গেলেও পালকির ঘণ্টার ঝনঝন শব্দ যেন আজও বয়ে আনে অতীতের এক গন্ধমাখা হাওয়া। কিন্তু কখনও কি আমরা ভেবে দেখেছি কেন প্রাচীনকালে নববিবাহিত কনেকে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হত? শুধুই কি বাহারি আয়োজন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর অর্থ, ঐতিহ্য কিংবা পৌরাণিক প্রতীক?
সুরক্ষা ও সম্মান: কনেকে কেন্দ্র করে যত্নের প্রথা
প্রাচীন ভারতে কনেকে শুধুই এক নবাগত স্ত্রী নয়, বরং একটি পরিবারের সম্মান ও ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হত।
সূক্ষ্ম ও মূল্যবান: কনেকে কোমল, সংবেদনশীল এবং রক্ষার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হত।
নিরাপদ ভ্রমণ: দূরবর্তী গ্রামে যাওয়ার পথে রোদ, ধুলো বা ক্লান্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পালকি ছিল সবচেয়ে আরামদায়ক বাহন।
পালকি: রাজকীয়তা ও রীতি-রেওয়াজের ছাপ
পালকি শুধু একটি বাহন নয়, ছিল নববধূর সম্মানের প্রতীক।
বিলাসিতা ও মর্যাদা: কনের নতুন জীবনের শুভ সূচনার প্রতীক ছিল এই রাজকীয় শোভাযাত্রা।
উৎসবের অংশ: গীত, বাজনা ও আলোকসজ্জায় ঘেরা পালকি শোভাযাত্রা ছিল বিয়ের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক দৃশ্য।
পুরাণের ছায়ায় কনে: দেবীর রূপে আগমন
হিন্দু সমাজে কনেকে বরাবরই দেবী রূপে কল্পনা করা হয়েছে।
ঐশ্বরিক মর্যাদা: দেবী লক্ষ্মী বা পার্বতীর মতো, কনের প্রবেশ ছিল শুভ শক্তির আগমনরূপে বিবেচিত।
জীবনের রূপান্তর: পিতৃগৃহ থেকে শ্বশুরবাড়ি এই যাত্রা শুধু স্থান বদল নয়, এক পূর্ণতর জীবনে প্রবেশের প্রতীক, আর পালকি সেই রূপান্তরের পবিত্র বাহন।
আজ পালকি হয়তো বাস্তব ব্যবহারে বিলুপ্তপ্রায়, কিন্তু তার ঐতিহ্য ও তাৎপর্য এখনও জীবন্ত মন ও মনের সংস্কৃতিতে। পালকিতে করে নববধূর যাত্রা শুধু একটি আচার নয়, বরং নারীর প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা, স্নেহ ও নিরাপত্তার অঙ্গীকারের এক প্রতীক। পুরাণ, সংস্কার ও অনুভব মিলিয়ে এই প্রথা হয়ে উঠেছে এক চিরন্তন স্মারক নারীর জীবনের নতুন অধ্যায়ের এক মোহনীয় সূচনা।