প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
পৌষ সংক্রান্তি বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক জীবনধারা ও লোকাচারের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি এই উৎসব পালিত হলেও, বাংলা সালের পৌষ মাসের অন্তিম লগ্নে এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। পৌষ সংক্রান্তি মানেই শীতের গভীরে পৌঁছে যাওয়া, নতুন ফসল ঘরে ওঠা, আর ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার, সামাজিক মিলন ও খাদ্যসংস্কৃতির সম্মিলনে এই দিনটি বাংলার গ্রাম থেকে শহর সবখানেই বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয়। পৌষ সংক্রান্তির মূল তাৎপর্য সূর্যের উত্তরায়ণ যাত্রা। এই দিনে সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করে, তাই একে মকর সংক্রান্তিও বলা হয়। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষ ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, উত্তরায়ণ সূর্যের শুভ সময় এই সময়ে দেবতারা জাগ্রত থাকেন এবং মানুষের পূণ্যকর্মের ফল বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বাংলায় এই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ছন্দ। আমন ধান ঘরে ওঠে, গোলা ভরে, সংসারে আসে স্বস্তি তারই আনন্দঘন প্রকাশ পৌষ সংক্রান্তি। গ্রামবাংলায় পৌষ সংক্রান্তি মানেই ভোরবেলা স্নান ও পুণ্যাচরণ। অনেক পরিবারে এখনও ভোরে উঠে নদী, পুকুর বা ঘাটে গিয়ে স্নান করার রীতি রয়েছে। বিশেষ করে গঙ্গা, দামোদর, অজয় বা কোপাই নদীর তীরে এই দিনে পুণ্যস্নানের প্রচলন বহু প্রাচীন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে স্নান করলে পাপক্ষয় হয় এবং সংসারে মঙ্গল আসে। স্নানের পর পরিষ্কার পোশাক পরে বাড়ির দেবতার সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা হয়। পৌষ সংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দান। এদিন দানকে বিশেষ পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। চাল, ডাল, তিল, গুড়, কাপড় বা অর্থ যা সম্ভব তাই দান করা হয় দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষের মধ্যে। অনেক জায়গায় “তিল দান”-এর প্রথা রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিল দান করলে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের আশীর্বাদ লাভ হয়। গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেক পরিবার এই নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে। তবে পৌষ সংক্রান্তি বলতেই বাঙালির মনে প্রথম যে বিষয়টি ভেসে ওঠে, তা হলো পিঠে-পুলির উৎসব। নতুন চাল ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পিঠে এই দিনের প্রধান আকর্ষণ। ভাপা পিঠে, পাটিসাপটা, দুধপুলি, চিতই পিঠে, তেল পিঠে, গোকুল পিঠে প্রতিটি পিঠের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে পারিবারিক স্মৃতি ও প্রজন্মান্তরের রেসিপি। শীতের সকালে উনুনে বা আঁচে বসে পিঠে বানানোর দৃশ্য আজও গ্রামবাংলায় পৌষ সংক্রান্তির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। খেজুরের গুড় ছাড়া পৌষ সংক্রান্তি যেন অসম্পূর্ণ। এই সময়েই খেজুর গাছ থেকে নতুন গুড় পাওয়া যায়, যা স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়। নলেন গুড় দিয়ে তৈরি পিঠে, পায়েস বা সন্দেশ সবকিছুর মধ্যেই শীতের বিশেষত্ব ধরা পড়ে। অনেক পরিবারে পৌষ সংক্রান্তির দিনে নলেন গুড়ের পায়েস রান্না করা হয়, যা বাড়ির সকলের মধ্যে ভাগ করে খাওয়ানো হয়। পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নানা লোকাচার ও গ্রাম্য উৎসব। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এই দিনে মেলা বসে, যাকে অনেক জায়গায় “পৌষমেলা” বলা হয়।শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা বিশ্ববিখ্যাত হলেও, গ্রামবাংলার ছোট ছোট পৌষমেলাও কম আকর্ষণীয় নয়। মেলায় পাটের জিনিস, মাটির খেলনা, কাঠের কাজ, লোকশিল্প, আর অবশ্যই নানা ধরনের খাবারের পসরা বসে। এই মেলা গ্রামবাসীর সামাজিক মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
অনেক অঞ্চলে পৌষ সংক্রান্তির দিনে বিশেষ ব্রত পালনের চল রয়েছে। গৃহস্থ নারীরা সংসারের মঙ্গল, সন্তানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য ব্রত করেন। কোথাও কোথাও চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকা হয়, যা শুভশক্তির প্রতীক বলে মনে করা হয়। এই আলপনায় সূর্য, ধান, পদ্ম বা জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দেখা যায়, যা বাংলার লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পৌষ সংক্রান্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পারিবারিক মিলন। অনেক পরিবারে এই দিনে আত্মীয়স্বজন একত্রিত হয়ে ভোজন করেন। শহুরে জীবনে যেখানে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময় কমে এসেছে, সেখানে পৌষ সংক্রান্তি এখনও সেই পারিবারিক বন্ধনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে গ্রামে, খোলা উঠোনে বা বারান্দায় সবাই একসঙ্গে বসে পিঠে-পুলি খাওয়ার দৃশ্য আজও চোখে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৌষ সংক্রান্তির উদযাপনে কিছু পরিবর্তন এলেও, এর মূল সুর আজও অটুট। শহরে এখন অনেক পিঠে উৎসব, থিমভিত্তিক অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক আয়োজন দেখা যায়। সামাজিক মাধ্যমে পিঠের ছবি, পৌষ সংক্রান্তির শুভেচ্ছা বিনিময় সব মিলিয়ে উৎসবের রূপ বদলেছে, কিন্তু আবেগ বদলায়নি। আসলে পৌষ সংক্রান্তি কেবল একটি ধর্মীয় বা ঋতুভিত্তিক উৎসব নয়; এটি বাঙালির জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান, পরিশ্রমের ফলকে সম্মান জানানো, ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা এবং পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রকাশ এই উৎসব। শীতের কনকনে হাওয়ার মধ্যেও পৌষ সংক্রান্তি বাংলার ঘরে ঘরে এনে দেয় উষ্ণতা, আনন্দ ও এক গভীর সাংস্কৃতিক তৃপ্তি। আজও তাই, আধুনিকতার ভিড়েও, পৌষ সংক্রান্তি বাংলার হৃদয়ে এক চিরন্তন উৎসব যেখানে অতীত ও বর্তমান মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।