স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শরীরের অন্দরমহলের নিঃশব্দ কর্মীবাহিনী যদি কেউ হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে যকৃত বা লিভার। এই অঙ্গটি রক্ত ছেঁকে টক্সিন ছাঁকনো থেকে শুরু করে বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, হজমে সাহায্যকারী উৎসেচক তৈরি, এমনকি গ্লাইকোজেন সংরক্ষণ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামলায় নীরবে, নিয়মিত। আর এই যকৃতের সুরক্ষায় আমাদের রান্নাঘরের বা বাজারের পরিচিত বহু খাবারের মধ্যে এক আধুনিক সংযোজন হয়ে উঠছে অ্যাভোক্যাডো।
অ্যাভোক্যাডো উৎপত্তিগতভাবে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার ফল হলেও বর্তমানে ভারতের বাজারেও এটি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। ডায়েট সচেতন মানুষের প্লেটেও জায়গা করে নিচ্ছে দ্রুত। বেশিরভাগ মানুষ অ্যাভোক্যাডোকে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং হৃদরোগ প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন। কিন্তু এটি যে লিভার বা যকৃতের স্বাস্থ্যের জন্যও একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ তা অনেকেই জানেন না।
একটি জাপানি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অ্যাভোক্যাডোতে এমন কিছু বিশেষ যৌগ থাকে, যা গ্যালাকটোসামিনের মতো যকৃতবিরোধী বিষাক্ত উপাদানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। প্রায় ২১টি চেনা-পরিচিত ফলের তুলনায়, যেমন তরমুজ, কলা বা পেঁপে, অ্যাভোক্যাডোই সবচেয়ে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে লিভারের ক্ষয় প্রতিরোধে। এই ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও ফাইটোকেমিক্যালস, যা যকৃতের কোষের পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অ্যাভোক্যাডো রাখলে যকৃতের ফ্যাটি স্তর কমে, ফলে হজমক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
অ্যাভোক্যাডোতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমিয়ে ভাল কোলেস্টেরল (HDL) বাড়ায়। এতে উপস্থিত পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। সমীক্ষা বলছে, প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুটি অ্যাভোক্যাডো খেলে করোনারি হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এমনকি হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও এর অবদান প্রমাণিত। অ্যাভোক্যাডোর মধ্যে থাকা ভিটামিন ই, সি ও বায়োটিন ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং বলিরেখা প্রতিরোধে সাহায্য করে। ত্বক শুষ্ক হলে বা সহজে র্যাশ উঠলে, খাদ্যতালিকায় এই ফল সংযোজন করলে উপকার মেলে।
অ্যাভোক্যাডো কাঁচাই খাওয়া ভালো। স্যালাডে টুকরো করে, টোস্টে চটকে বা স্মুদি বানিয়ে খাওয়া যায়। তবে যাঁরা প্রথমবার খাচ্ছেন, তাঁরা একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ হজমে সময় লাগতে পারে। অ্যাভোক্যাডো উপকারী বটে, তবে পরিমাণমতো। দিনে একটি বা সপ্তাহে ২–৩টি ফল যথেষ্ট। যাঁদের ল্যাটেক্স অ্যালার্জি বা পটাশিয়াম সংবেদনশীলতা আছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আজকের দিনে হরমোনগত সমস্যা, অনিয়মিত খাওয়া ও স্ট্রেসে লিভার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে বহুগুণ। তাই প্রতিরোধমূলক খাবার হিসেবে অ্যাভোক্যাডোর মতো প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ থাকা চাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায়। সুস্থ লিভার মানে শুধু হজম নয়, প্রাণবন্ত ত্বক, শক্তিশালী হৃদয় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার চাবিকাঠিও বটে।