স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শুধু ভারতই নয়, পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বের ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ পেটের সমস্যায় ভুগছেন। গ্যাস-অম্বল থেকে আলসার! হতে পারে লিভারের অসুখও। সাবধান! পেটের এইসব সমস্যা কমিয়ে দিতে পারে জীবনযাত্রার মান। অসচেতন ও অজ্ঞতা মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে মুহূর্তেই আপনাকে। এইসব সমস্যায় কীভাবে নিজেকে তৈরি করবেন, সামলাবেন, সে বিষয়ে জেনে নিন।
বনলতা সেন।
না। একে আপনারা চিনবেন না।
ইনি কবি জীবনানন্দের মানস প্রিয়া নন। না ইনি নাটোরে থাকেন। বত্রিশ বছরের যুবতী। থাকেন কলকাতার শহরতলিতে। বারাকপুরে। স্বামী জীবনানন্দ গোস্বামী কর্পোরেটের মানুষ। বনলতা একটা স্কুলে পড়ান। স্বামী তাঁর জগতে ভয়ঙ্কর ব্যস্ত। অফিস ও কাজের প্রতি যত তাড়া, খাওয়ার প্রতি নয়। চলছিল তো বেশ। চল্লিশ পেরোতেই বাঁধল গোল। কথায় কথায় পেটের সমস্যা। যা থায় অম্বল হয়ে যায়। হাতের কাছে অ্যান্টাসিট থাকে, টুক করে খেয়ে নেওয়া।
তখনও খুব একটা পাত্তা দেয়নি। কেবল মাঝে মাঝে বনলতাকে বলে, বন্যা, পেটে একটা সমস্যা হচ্ছে জানো। আসিডিটির প্রবলেম! কি যে করি! দুচারবার শুনেই বনলতা সোজা ফোন কলিগের ডক্টর হাজব্যান্ড অপূর্বদাকে। ডক্টর অপূর্ব বললেন, উনি কি বারবার ওয়াশ রুমে যাচ্ছেন? বিশেষ করে বেরোবার আগে? বনলতা লক্ষ করেছে, এমন ঘটনা তো ঘটছে। ইদানিং খুব বেশি রকমের হচ্ছে। ডক্টর স্পষ্টতই জানিয়ে দিলেন, অ্যাসিডের সমস্যা যেমন আছে, তেমনই আছে আইবিএস।
সেটা আবার কী?
সেদিন সন্ধ্যেবেলা জীবনানন্দ ও বনলতা গোস্বামী ছুটল সল্টলেক। বনলতার কলিগ নীরা ও অপূর্বর বাড়িতে। নেমন্তন্ন রক্ষা। সেই সঙ্গে ডক্টর অপূর্বর সঙ্গে একবার আলোচনা করেও নেওয়া জীবনানন্দের সমস্যাটা নিয়েও। ডক্টর অপূর্ব, অপূর্ব ভাষায় জানালেন....
পেটের অসুখ আইবিএস কী
আইবিএস আসলে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের একটি ফাংশনাল বা কার্যগত সমস্যা। এখানে পরিপাকতন্ত্রের কোনও গঠনগত পরিবর্তন বা সমস্যা হয় না। এই সমস্যা সাধারণত যুবক বয়সেই শুরু হয়। যাঁরা সব সময় উদ্বিগ্ন বা মানসিক চাপে থাকেন, তাঁরা এতে বেশি ভোগেন। এখন পর্যন্ত আইবিএসের সঠিক কারণ ভালোভাবে জানা যায়নি। তবে কিছু থিওরি রয়েছে। পরিপাকনালির পেশির অস্বাভাবিক সংকোচন, প্রসারণ, স্নায়ুর সংকেতজনিত সমস্যা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ, পরিপাকতন্ত্রের সহজাত ও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন ইত্যাদি কারণ শনাক্ত করা হয়েছে এর পেছনে। অনেক খুঁজেও পরিপাকতন্ত্রে কোনও বড় সমস্যা পাওয়া যায় না বলে কারণ অনুসন্ধানে কোনও লাভ হয়নি কারোর।
কীভাবে বুঝবেন আপনার আইবিএস আছে
এই রোগের কারণে মূলত দুই ধরনের সমস্যা হয়। একটি হলো পেটে ব্যথা অনুভব করা, অন্যটি হলো মল ত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন। পেটের ব্যথা সাধারণত মলত্যাগের পর চলে যায় বা কমে যায়। এতে ওজনহ্রাস, জ্বর, রক্তশূন্যতা বা মলের সঙ্গে রক্তপাত ইত্যাদি দেখা যায় না। তবে সমস্যাটি খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িত। কিছু খাবার খেলে এই সমস্যা বেড়ে যায় বইকি। এটা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কিন্তু দুধ ও দুধজাতীয় খাবার এবং শাকসবজি ও স্যালাডের মতো খাবারে সাধারণত বেশি বাড়ে। তবে ভালো বিষয় হলো যে এটা মারাত্মক কোনও রোগ নয়। এ থেকে বড় কোনও জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়
পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা আইবিএস নির্ণয় করতে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ বা রোম ক্রাইটেরিয়া ব্যবহার করে থাকেন। এই রোগ দুরকম হতে পারে, যেমন আইবিএস ডি. যেখানে পেটে ব্যথার সঙ্গে পাতলা বা নরম পটি হয় এবং আইবিএস সি, যেখানে পেটে ব্যথার সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে। কারও কারও দুটিই থাকতে পারে। রোগের লক্ষণ ও ইতিহাস শুনে রোগ শনাক্ত করা হয়, তবে এরসঙ্গে অনেক সময় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হয় যে, অন্যকোনও পরিপাকজনিত রোগ বা জটিলতা নেই। বেশির ভাগ পরীক্ষারই রিপোর্ট স্বাভাবিক পাওয়া যায়।
পরিত্রাণের উপায় কী
দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে এই সমস্যার পুরোপুরি কোনও সমাধান নেই। তবে একে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন। আনা দরকার। দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, শাক ইত্যাদি যেসক খাবারে সমস্যা বাড়ে, সেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। রোজকার খাদ্যপঞ্জি মেনে চলার অভ্যাস থাকলে রোগী সহজেই বুঝতে পারবেন কবে কোন খাবারে তাঁর সমস্যা হয়েছিল। এ ছাড়া মানসিক চাপ কমাতে হবে। যদিও জীবনবাবুর পক্ষে কতটা সম্ভব, তা একটা বড় প্রশ্ন। প্রয়োজন হলে উপসর্গ বুঝে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিছু ওষুধ দিতে পারেন। তবে আইবিএসের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই আপনার নিজের হাতে। স্বাস্থ্যকর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করলে ভালো থাকবেন।
আইবিএস নিয়ে ভালো থাকার উপায়
১। যেসব খাবারে পেটের সমস্যা বাড়ে, সেসব খাবার এড়িয়ে চলুন। দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, শাক, অতিরিক্ত তেলে ভাজা বা ডিপ ফ্রাই খাবার, অতিরিক্ত মসলা দিয়ে রান্না করা খাবার, বেকারি, কৃত্রিম চিনি, ক্যাফেন ইত্যাদি এড়িয়ে চলা ভালো।
২। নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটির চেষ্টা করুন। এতে পেটের গ্যাস বা ফাঁপা ভাব কমবে।
৩। একসঙ্গে অনেক না খেয়ে সারা দিনে অল্প অল্প করে ভাগ করে খান। খাবারের টাইমটেবিল বজায় রাখুন।
৪। মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমাতে ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন করতে পারেন। দরকার হলে বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নিন। পজেটিভ ভাবনা ও ভালো গান শোনা খুব কাজের হতে পারে কিন্তু।