বিনোদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
স্টাইল কথাটি উচ্চারণ করলেই চোখে ভেসে ওঠে ঝকঝকে পোশাক, ঝলমলে রঙ, ট্রেন্ডি হেয়ারস্টাইল। কিন্তু বাঙালির কাছে স্টাইল শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রকাশ নয় এ এক আত্মপ্রকাশ, আত্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। আর তাই বাংলার স্টাইল আইকনরা শুধু ফ্যাশনের ধারক-নয়, তাঁরা সংস্কৃতি, চিন্তা আর সাহসিকতার প্রতীক..
রবীন্দ্রনাথের পোশাক ছিল তাঁর দর্শনেরই সম্প্রসারণ। পাঞ্জাবি, ধুতি, শান্তিনিকেতনি স্টাইলের চাদর সব মিলিয়ে এক অভিজাত অথচ স্বাভাবিক সৌন্দর্য। তাঁর চোখে চশমা, মাথায় ঢেউ খেলানো চুল, আর দীর্ঘ দাড়ির সঙ্গে তাঁর পোশাক গড়ে তুলেছিল এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। বাংলা পুরুষদের কাছে তিনি এক অনন্ত স্টাইল স্টেটমেন্ট। লম্বা গঠন, ধুতি-পাঞ্জাবি বা কুর্তা-পাজামা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর ঠোঁটে সিগারেট সত্যজিৎ রায় যেন এক চলমান বাঙালি ক্লাসিক। তাঁর ফ্যাশনে ছিল না বাহুল্য, ছিল পরিশীলিততা ও মাধুর্য। চশমার ফ্রেম থেকে কলম ধরার ধরন সব কিছুতেই ছিল স্টাইল।
মহানায়ক উত্তম কুমার ছিলেন এক নিখুঁত গ্ল্যামার আইকন। তাঁর পরনে স্মার্ট হাফ শার্ট, প্যান্ট-কোট বা কেশ বিন্যাস বাঙালি পুরুষদের কাছে এক অনুকরণীয় ট্রেন্ড হয়ে ওঠে। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হালকা সুগন্ধি, হালকা চুলের ঝাঁকুনি এক সুদর্শন পুরুষের সংজ্ঞা যেন তিনিই! বাঙালি নারীর প্রথম সত্যিকারের গ্ল্যামার আইকন। সুচিত্রার হালকা কোট, ভরাট চোখের কাজল, নিখুঁত বিনুনি কিংবা খোঁপা, পরিপাটি শাড়ি পরার ভঙ্গি সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ডিভা। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁর স্টাইলের আলো ছড়িয়েছে যুগের পর যুগ! ছবিতে তাঁর স্টাইল একদিকে ছিল ঊনবিংশ শতকের শালীনতা, অন্যদিকে আধুনিক নারীর আত্মবিশ্বাস। তাঁর শাড়ি পরার স্টাইল, চোখে চশমা আর ঠোঁটে একটুকরো নির্ভার হাসি এই ছিল ইনটেলেকচুয়াল গ্ল্যামার-এর অনন্য সংজ্ঞা।
অপর্ণা সেনের বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, হালকা মেকআপ, কাঁথা কাজের শাড়ি, বড় টিপ ও সিলভার গয়না এইসব মিলে তিনি হয়ে উঠেছেন সুবোধ বাঙালি ফ্যাশন-এর মুখ। অপরাজিতা ঘোষদাস ও অন্যান্য সমসাময়িক অভিনেত্রীরাও ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে নতুন পথ তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ছিলেন শান্ত অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রতীক। আবার মহাশ্বেতা দেবীর ধুতি-কুর্তি পরিহিত ঝাঁঝালো উপস্থিতি এই দুই মিলে উঠে এসেছে বাঙালি নারীর দুটি বিপরীত কিন্তু শক্তিশালী স্টাইল স্টেটমেন্ট।
সৃজিত মুখার্জি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী কিংবা অনির্বাণ ভট্টাচার্য আজকের তারকারা স্টাইলকে দিয়েছেন নতুন সংজ্ঞা। কেউ ফিউশন শাড়ি পরেন, কেউ আবার ডেনিমের সঙ্গে কাঁথার জ্যাকেট মিলিয়ে দেন। চুলের কাটিং, গয়নার সিলেকশন, এমনকি ইনস্টাগ্রাম রিলের ক্যাপশনও আজ স্টাইলের অংশ। কেবল শহরেই নয় গ্রামের মাটির গন্ধমাখা স্টাইলের মধ্যেও আছে অনন্যতা। গ্রামের বুড়িমা শীতের সকালে ধুতি-পেড়ে শাড়িতে যেমন অনবদ্য, তেমনই নবরূপে বউঠান একগাল টিপ, হাতে কাচের চুড়ি, শাঁখা-পলা পরে রোজ সকালে মন্দিরে যাচ্ছেন এই চিত্রও বাঙালি স্টাইলের অপরিহার্য রূপ।
বাঙালি স্টাইল মানে বাহ্যিক সাজ নয় এ এক চেতনা, আত্মবিশ্বাস আর নিজস্ব অবস্থান গড়ে তোলার উপায়। এই স্টাইল কখনোই নিছক ট্রেন্ড অনুগামী নয় বরং আত্মাভিমানী, চুপচাপ, গভীর। বাঙালির স্টাইল আইকনরা যুগের পর যুগ ধরে প্রমাণ করে দিয়েছেন স্টাইল বলতে শুধুই জামাকাপড় নয়, তা হল এক আত্মিক প্রকাশ, এক সাংস্কৃতিক স্থায়িত্ব। তাঁরা পোশাকের ভেতর দিয়েই সময়কে ছুঁয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন, প্রেম করেছেন, চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন। আজও তাঁদের থেকে আমরা শিখি স্টাইল হল কে তুমি সেই প্রশ্নের এক জবাব।