প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বিয়ের মরশুম মানেই আলমারি খুলে নতুন পুরোনো শাড়ির সমারোহ। আর সেই তালিকায় সবার আগে থাকে বেনারসি কারণ বেনারসি শুধু একটি পোশাক নয়, একধরনের ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং প্রজন্মের উত্তরাধিকার। বেনারসির রেশমের মসৃণতা, জরি কাজের উজ্জ্বলতা এবং ওয়েভিং প্যাটার্নের সূক্ষ্মতা তাকে অন্য সব শাড়ির থেকে আলাদা করে তোলে। তাই বিয়ের মৌসুমে যখন নিত্য ব্যবহার, যাতায়াত, হালকা ঠান্ডা এবং মাঝে মাঝে ঘাম সব মিলিয়ে শাড়িকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়, তখন সঠিক যত্ন না নিলে এর সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বেনারসি খুব স্পর্শকাতর, তাই তাকে যত্ন দিতে হয় অত্যন্ত সচেতনভাবে। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে যত্ন নিলে বেনারসি দীর্ঘদিন তার একই ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখবে তা নিয়েই এই বিশদ আলোচনা।
শুরুতেই বলা দরকার, বেনারসির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আর্দ্রতা। শীতে সাধারণত বাইরে শুকনো থাকলেও ঘরের ভেতরে বদ্ধ আর্দ্রতা জমে থাকে, যা রেশমের তন্তুকে দুর্বল করে এবং জরি নষ্ট করে দিতে পারে। তাই বিয়ের মরশুমে শাড়ি পরার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাতাসে ছায়ায় মেলে দিতে হবে, যাতে শরীরের ঘামের আর্দ্রতা বেরিয়ে যায়। অনেকেই শাড়ি পরেই সরাসরি ফোল্ড করে ব্যাগে ভরে রাখেন, যা একেবারেই ভুল। এতে ভাঁজের জায়গায় স্থায়ী দাগ পড়ে এবং জমা আর্দ্রতায় জরি অক্সিডাইজ হয়ে কালচে হতে থাকে। তাই বেনারসি ব্যবহার করার পর অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা ছায়ায় রেখে শুকনো করতে হবে।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাঁজ। বেনারসিকে কখনো একই ভাঁজে বারবার রাখা উচিত নয়। এতে ভাঁজের লাইনে রেশম দুর্বল হয়, জরি কাজ ভেঙে পড়তে পারে। তাই কয়েক মাস পরপর শাড়ির ভাঁজ পাল্টাতে হবে। অনেকে প্লাস্টিকের কভার ব্যবহার করেন, কিন্তু প্লাস্টিক বদ্ধ করে রাখে আর্দ্রতা। ফলে শীতে বাইরে ঠান্ডা লাগলেও ঘরের আর্দ্রতা প্লাস্টিকের মধ্যে জমে ফাঙ্গাস তৈরি করতে পারে। তাই বেনারসি রাখার জন্য সেরা হল মসলিন বা কটন ব্যাগ, যা বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং রেশমকে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে সাহায্য করে। এছাড়াও শাড়ির মাঝে মাঝে টিস্যু পেপার বা মসলিন কাপড় ব্যবহার করলে জরি ও রেশমের ঘর্ষণ কম হয়।
জরি বা মেটালিক থ্রেডের রঙ ধরে রাখতে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। শীতে অনেকেই সুগন্ধি, বডি মিস্ট বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করেন, যা প্রায়শই সরাসরি শাড়িতে লেগে যায়। কিন্তু জরি সোনালি বা রুপোলি রঙের হোক, স্প্রে-জাত পণ্যের অ্যালকোহল ও কেমিক্যাল এতে দাগ বা কালচে ভাব এনে দিতে পারে। তাই শাড়ি পরে স্প্রে করবেন না; বরং স্প্রে করে তারপর শাড়ি পরা উচিত। এছাড়াও বিয়ের বাড়িতে আলো, ধূপ, আগরবাতির ধোঁয়া এসব থেকেও শাড়িকে দূরে রাখতে হবে, কারণ ধোঁয়ার কণা জরির উপর দ্রুত জমে রঙকে নিস্তেজ করে দেয়।
রোল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ বেনারসির জন্য এক অসাধারণ পন্থা। অনেক ডিজাইনার হাউস ও বুটিক বেনারসি রোল করে রাখার পরামর্শ দেন, যাতে ভাঁজ পড়ে না এবং জরি একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে না যায়। বড় মসলিন বা সুতি চাদর দিয়ে শাড়িকে পেঁচিয়ে রোল করে রাখলে শাড়ির বডি ও আঁচল একইরকম মসৃণ থাকে। শীতকালে যেহেতু বিয়েবাড়ির নানান কাজ থাকে, বারবার শাড়ি পরার সুযোগও বাড়ে তাই রোল করে রাখলে ব্যবহার করা আরও সুবিধাজনক হয়।
অনেক সময় বিয়ের বাড়িতে খাবার পরিবেশন, আশীর্বাদ নেওয়া, ফটোশুট এসবের কারণে শাড়িতে ছোটখাটো দাগ পড়ে যায়। কিন্তু বেনারসির দাগ পরিষ্কার করার নিয়ম একেবারেই আলাদা। জল দিয়ে ঘষলেই দাগ যাবে এমন ভাবা ভুল। রেশমে জল দিলে দাগ ছড়িয়ে যেতে পারে এবং জরি কালচে হয়ে যেতে পারে। তাই হালকা দাগ হলে তৎক্ষণাৎ নরম, শুকনো কাপড় দিয়ে চাপ দিয়ে তুলতে হবে। তেল বা মেকআপের দাগ হলে একেবারেই বাড়িতে পরিষ্কার করা উচিত নয় এতে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। বরং বিশেষজ্ঞ ড্রাই ক্লিনিংই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
বেনারসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রাও বড় ভূমিকা রাখে। খুব গরম বা খুব ঠান্ডা দুটোই রেশমের জন্য ক্ষতিকর। শীতকালে অনেক বাড়িতে ঘর বেশি ঠান্ডা থাকে, এবং কাঠের আলমারিতে আর্দ্রতা জমে যায়। তাই আলমারির ভিতর সিলিকা জেল পাউচ বা নিমপাতা রাখা ভালো যা ফাঙ্গাস হওয়া আটকায়। তবে ন্যাপথলিন বা কর্পূর সরাসরি শাড়ির কাছে রাখবেন না; এতে রেশমের গন্ধ ও রং নষ্ট হতে পারে।
বিয়ের মরশুমে ছবি তোলার জন্য মোবাইল বা ক্যামেরার লেন্সে ব্যবহৃত লাইট বা স্টুডিও লাইট অনেক সময় শাড়ির উপর পড়ে অতিরিক্ত তাপ তৈরি করে। যদিও এটি চোখে পড়ে না, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ আলো পড়লে রেশমের রং ফিকে হয়ে যেতে পারে। তাই লাইটের ঠিক নিচে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা এড়ানো উচিত। এছাড়াও শাড়ি পরে বারবার বসা–ওঠা, সিঁড়ি ওঠা–নামা এসবের সময় খেয়াল রাখবেন যেন জরি চেয়ারের হাতল বা ধারালো কোনোকিছুর সঙ্গে আটকে না যায়।
স্ত্রীর, মায়ের বা ঠাকুমার বেনারসি যেটিই হোক, ভালো যত্নে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখা যায়। শীতের বিয়ের মরশুমে যতই ব্যবহার বাড়ুক, শাড়ির সৌন্দর্য ঠিক রাখতে ব্যবহার শেষে বাড়তি যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। মনে রাখতে হবে, বেনারসি শুধু ফ্যাশনের অংশ নয় এটি স্মৃতি ও আবেগের অংশ। বরফঠান্ডা আবহাওয়া, ধুলো, দাগ, আর্দ্রতা সব বাধা পার করে তাকে সুন্দর রাখতে হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। শাড়ি ব্যবহারের পরে ছায়ায় শুকনো করা, সঠিক ভাঁজে রাখা, প্লাস্টিক এড়িয়ে মসলিন ব্যাগে সংরক্ষণ, রোল পদ্ধতি ব্যবহার, রাসায়নিক স্প্রে থেকে দূরে রাখা এবং প্রয়োজনে ড্রাই ক্লিন করানো এই কয়েকটি সহজ পদ্ধতিই আপনার প্রিয় বেনারসিকে বছরের পর বছর নতুনের মতো উজ্জ্বল রাখবে।
বিয়ের মৌসুম আসে যায়, কিন্তু বেনারসির ঐতিহ্য চিরকাল থাকে। তাই সিদ্ধান্ত আপনার বেনারসিকে কেবল বিয়ের দিনের জন্য রাখবেন, নাকি যত্ন করে আগলে রেখে প্রজন্মের ইতিহাস হিসেবে তুলে দেবেন। সঠিক যত্নে বেনারসি যে কতটা দীর্ঘদিন সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারে, তার উদাহরণ আমাদের ঘরের বহু পুরোনো শাড়িতেই পাওয়া যায়। তাই সঠিক যত্নের অভ্যাস গড়ে তুলুন, শাড়িকে ভালোবাসুন কারণ বেনারসি কখনোই শুধু শাড়ি নয়, একসময়ের স্মৃতি, একদিনের আনন্দ, আর এক জীবনের আবেগ।