19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

কীভাবে সন্ন্যাসী হয়েও বিশ্বজয় করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ - ৪ জুলাই ১৯০২), জন্মসূত্রে নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত, ছিলেন এক অনন্য ভারতীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ ও সমাজচিন্তক। ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জাগরণে তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। তিনি ছিলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য এবং ভারতীয় বেদান্ত ও যোগদর্শনের বিশ্বব্যাপী প্রচারক। পাশ্চাত্য জগতে হিন্দুধর্মের পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং ভারতে আত্মমর্যাদাবোধ ও জাতীয়তাবাদের বীজ বপনে স্বামী বিবেকানন্দ এক অনস্বীকার্য নাম। কলকাতার এক শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্ম নেওয়া নরেন্দ্রনাথ ছোটোবেলা থেকেই প্রখর মেধা ও প্রশ্নবোধে উজ্জ্বল ছিলেন। শিল্পকলা, সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত পাঠের পাশাপাশি তিনি পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারাতেও সমানভাবে আগ্রহী ছিলেন। জেনারেল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশন (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ)-এ পড়াশোনার সময় তিনি ডেভিড হিউম, হেগেল, শোপেনহাওয়ার, জন স্টুয়ার্ট মিল, ডারউইন ও হারবার্ট স্পেনসারের দর্শন অধ্যয়ন করেন। স্পেনসারের Education গ্রন্থটি তিনি বাংলায় অনুবাদও করেছিলেন। কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি নরেন্দ্রনাথকে এক অসামান্য প্রতিভা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন! যৌবনে নরেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও ঈশ্বর ও ধর্ম সম্পর্কে তাঁর প্রশ্নের উত্তর সেখানে সম্পূর্ণরূপে মেলেনি। ‘ঈশ্বরকে কেউ দেখেছেন কি না’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তাঁর জীবনে এক ঐতিহাসিক মোড় আসে। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর জীবন আমূল বদলে দেয়। রামকৃষ্ণদেবের সরল অথচ গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নরেন্দ্রনাথকে নিশ্চিত করে যে মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা। গুরুদেবের তত্ত্বাবধানে তিনি কঠোর সাধনায় প্রবৃত্ত হন এবং কাশীপুরে নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন।

১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণদেবের মহাপ্রয়াণের পর নরেন্দ্রনাথ তাঁর গুরুভাইদের নিয়ে বরানগরে প্রথম রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে এই সন্ন্যাসী সংঘ। এই সময়েই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নামে পরিচিত হন। গুরুর নির্দেশে স্বামী বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীর বেশে দীর্ঘদিন ভারতভ্রমণ করেন। উত্তর থেকে দক্ষিণ সমগ্র ভারত ঘুরে তিনি প্রত্যক্ষ করেন ব্রিটিশ ভারতের দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর চিন্তাধারাকে দৃঢ় করে ভারতের মুক্তি আসবে মানবকল্যাণ, শিক্ষা ও আত্মশক্তির জাগরণের মধ্য দিয়ে। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভা-তে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ “আমেরিকার ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ” শুধু একটি বক্তৃতা নয়, তা ছিল ভারতের আত্মমর্যাদার বিশ্বঘোষণা। সেই মুহূর্ত থেকেই পাশ্চাত্যে হিন্দুধর্ম, বেদান্ত ও যোগদর্শনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, বর্তমান ভারত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, ভাববার কথা ইত্যাদি। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগীতজ্ঞ; তাঁর রচিত ভজন “খণ্ডন-ভব-বন্ধন” আজও রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনে গীত হয়। তাঁর অমর উক্তি, “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” আজও মানবতাবাদের শ্রেষ্ঠ মন্ত্র হিসেবে উচ্চারিত।

স্বামী বিবেকানন্দ কেবল একজন সন্ন্যাসী নন তিনি ছিলেন ভারতের আত্মার ভাষ্যকার। ধর্ম, দর্শন ও সমাজচিন্তাকে একসূত্রে বেঁধে তিনি যে মানবমুখী আধ্যাত্মিকতার পথ দেখিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাই তো তাঁকে বলা হয় ‘বীর সন্ন্যাসী’, আর তাঁর জন্মদিন ১২ জানুয়ারি পালিত হয় জাতীয় যুব দিবস হিসেবে যুবসমাজকে আত্মবিশ্বাস, কর্মস্পৃহা ও মানবসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার জন্য।

Archive

Most Popular