প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
আধুনিক দাম্পত্য সম্পর্কে এক নতুন প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আইনি বিচ্ছেদের বদলে ‘সাইলেন্ট ডিভোর্স’। বাইরে থেকে দেখলে দম্পতি এখনও একসঙ্গে আছেন, কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কের ভিতরে বিচ্ছেদ অনেক আগেই ঘটে গেছে। এই নীরব বিচ্ছেদের পথ কেন বেছে নিচ্ছেন বহু দম্পতি তার সামাজিক, মানসিক ও বাস্তব কারণগুলো প্যারাগ্রাফ আকারে তুলে ধরা হলো।
সাইলেন্ট ডিভোর্স বলতে বোঝায় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে স্বামী-স্ত্রী আইনত আলাদা হন না, কিন্তু মানসিক, আবেগিক এবং অনেক সময় শারীরিকভাবেও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তারা এক ছাদের নীচে থাকেন, সংসার চালান, সন্তান মানুষ করেন কিন্তু সম্পর্কে আর ঘনিষ্ঠতা, বন্ধন বা পারস্পরিক অংশগ্রহণ থাকে না। সম্পর্কটি তখন শুধুই একটি সামাজিক কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রবণতার অন্যতম বড় কারণ হলো আইনি বিচ্ছেদের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা। ডিভোর্স মানেই আদালত, উকিল, বছরের পর বছর মামলা, মানসিক চাপ এবং আর্থিক ক্ষতি।
অনেক দম্পতি এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চান না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা কর্মজীবী দম্পতির কাছে এই লড়াই অত্যন্ত ক্লান্তিকর বলে মনে হয়, ফলে তারা সম্পর্কের ভিতরে থেকেই আলাদা হয়ে থাকার পথ বেছে নেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সামাজিক চাপ ও পারিবারিক প্রত্যাশা।
আমাদের সমাজে এখনও বিবাহবিচ্ছেদকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয় বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর প্রশ্ন, কটাক্ষ বা সহানুভূতিই অনেককে আইনি বিচ্ছেদ থেকে দূরে রাখে। তাই সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থাকার জন্য অনেকেই নীরবে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
সন্তানের ভবিষ্যৎও সাইলেন্ট ডিভোর্স বেছে নেওয়ার একটি বড় কারণ। বহু দম্পতির ধারণা, আইনি বিচ্ছেদ সন্তানের মানসিক ক্ষতি করবে বা সমাজে তাদের অবস্থান প্রশ্নের মুখে ফেলবে। তাই সন্তানের স্কুল, পড়াশোনা, সামাজিক স্থিতিশীলতার কথা ভেবে বাবা-মা আইনত একসঙ্গেই থেকে যান, যদিও ব্যক্তিগত সম্পর্কে তারা অনেক দূরে সরে যান।
আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রেই এক পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে অপর পক্ষের উপর নির্ভরশীল। বিচ্ছেদের পর একা থাকা, নতুন করে বাড়ি, খরচ, সন্তান লালন, এই বাস্তব দিকগুলো ভেবে অনেকেই আইনি ডিভোর্সে যেতে সাহস পান না। সাইলেন্ট ডিভোর্সে অন্তত আর্থিক কাঠামো অটুট থাকে, যদিও সম্পর্ক ভেঙে যায়।
বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তির ধারণাও বদলেছে। অনেক দম্পতি বিশ্বাস করেন, প্রতিদিনের ঝগড়া, অভিযোগ আর মানসিক ক্লান্তির চেয়ে দূরত্ব বজায় রেখে শান্তিতে থাকা ভালো। তারা সম্পর্ক ‘টেনে নিয়ে যাওয়া’র বদলে সেটিকে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেন। এতে সরাসরি সংঘাত কমে, কিন্তু আবেগিক শূন্যতা তৈরি হয়।
তবে সাইলেন্ট ডিভোর্সের একটি গভীর দিক হলো এর মানসিক প্রভাব। বাইরে সব স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে জমে ওঠে একাকিত্ব, অবহেলা ও অপূর্ণতার অনুভূতি। অনেক সময় এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে ডিপ্রেশন, আত্মসম্মানহানি বা রাগে রূপ নেয়। দম্পতিরা কথা না বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যা সম্পর্কের সুস্থ সমাধানের পথ বন্ধ করে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, সাইলেন্ট ডিভোর্স কোনো সমাধান নয়, বরং এটি এক ধরনের আপস। এটি সমাজ, আইন ও বাস্তব জীবনের চাপ থেকে জন্ম নেওয়া একটি নীরব প্রতিবাদ। কেউ এটি বেছে নিচ্ছেন বাঁচার তাগিদে, কেউ শান্তির খোঁজে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে খোলাখুলি কথা বলা, কাউন্সেলিং নেওয়া বা সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে সুস্থ পথ নীরবতায় হারিয়ে যাওয়া নয়।