11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ঘন ঘন ব্ল্যাক-আউটের মুখোমুখি হন? শরীরে কোন রোগ বাসা বেঁধেছে?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


হঠাৎ করে চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে যাওয়া, মাথা ঘুরে ওঠা বা কয়েক মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এই ধরনের অভিজ্ঞতাকে সাধারণভাবে অনেকেই “ব্ল্যাক-আউট” বলে থাকেন। দৈনন্দিন জীবনে একবার-দু’বার এমনটা হলে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ভাবেন হয়তো ক্লান্তি, না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত গরমের কারণেই এমন হয়েছে। কিন্তু যদি এই ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে শুরু করে, তাহলে তা মোটেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়। কারণ বারবার ব্ল্যাক-আউট হওয়া শরীরের ভেতরে কোনও জটিল সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ব্ল্যাক-আউটের পেছনে বিভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় এটি সাময়িক হলেও কখনও কখনও এটি গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণও হতে পারে। তাই বারবার এই সমস্যা হলে তার কারণ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।

ব্ল্যাক-আউট সাধারণত তখনই ঘটে যখন মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গগুলির একটি। এর স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন ও পুষ্টি দরকার। কিন্তু কোনও কারণে যদি মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখনই মাথা ঘোরা, ঝিমুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সমস্যার একটি সাধারণ কারণ হলো নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাড প্রেসার। অনেকের ক্ষেত্রে হঠাৎ বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে যায় বা চোখে অন্ধকার দেখায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন’ বলা হয়। এই অবস্থায় শরীর দ্রুত রক্তচাপ সামঞ্জস্য করতে পারে না, ফলে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যায়।

রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়াও ব্ল্যাক-আউটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। শরীরে যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ হিমোগ্লোবিন থাকে না, তখন রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন পরিবহন কমে যায়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। এর ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলের ঘাটতিও অনেক সময় ব্ল্যাক-আউটের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গরমের সময় অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত জল না খেলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেও এই সমস্যা দেখা দেয়।

হার্টের কিছু সমস্যার কারণেও ব্ল্যাক-আউট হতে পারে। হৃদযন্ত্র যদি সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারে, তাহলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না। হৃদস্পন্দনের অনিয়ম বা হার্টের ভালভের সমস্যার ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। তাই ঘন ঘন ব্ল্যাক-আউট হলে হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে স্নায়বিক সমস্যাও এর জন্য দায়ী হতে পারে। যেমন মৃগী রোগের নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ক্ষেত্রে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। আবার মস্তিষ্কে রক্তনালীর সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। যদিও এই ধরনের কারণ তুলনামূলক কম দেখা যায়, তবুও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। মানসিক চাপ ও উদ্বেগও অনেক সময় ব্ল্যাক-আউটের মতো অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত উদ্বেগের ফলে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন ঘটে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরণ বদলে যেতে পারে। এতে মাথা ঘোরা বা চোখে অন্ধকার দেখার অনুভূতি হতে পারে।

এছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, ডিপ্রেশন বা ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অনেক সময় মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা দেখা যায়। তাই নতুন কোনও ওষুধ খাওয়ার পর যদি বারবার ব্ল্যাক-আউটের মতো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। এই ধরনের সমস্যাকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ব্ল্যাক-আউটের সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

এই সমস্যা এড়াতে কিছু সাধারণ অভ্যাস মেনে চলা জরুরি। প্রতিদিন পর্যাপ্ত জল পান করা, নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়ানো উচিত। হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ানোর বদলে ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করাও সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ। রক্তচাপ, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা দরকার। যদি ব্ল্যাক-আউটের ঘটনা ঘন ঘন ঘটে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।মাঝে মাঝে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনেক সময় সাধারণ কারণেও হতে পারে, কিন্তু ঘন ঘন ব্ল্যাক-আউট হওয়া শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনও সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই এই ধরনের লক্ষণকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো কারণ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়াই সুস্থ জীবনের প্রথম শর্ত।

Archive

Most Popular