19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাড়িতে বসেও সম্ভব স্বাস্থ্যরক্ষা। কীভাবে ?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। কাজের চাপ, যাতায়াতের সমস্যা, প্রযুক্তিনির্ভরতা সব মিলিয়ে বহু মানুষ আজ ঘরের মধ্যেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন। কেউ বাড়ি থেকে কাজ করছেন, কেউ সংসারের দায়িত্বে ব্যস্ত, আবার অনেকেই নানা কারণে বাইরে যাওয়া সীমিত রেখেছেন। এই বাস্তবতায় সুস্থ থাকার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাড়িতে বসে থাকলে কি আদৌ স্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব? বাস্তবে দেখা যায়, সামান্য সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চললেই ঘরেই গড়ে তোলা যায় সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন।

স্বাস্থ্য বলতে আমরা প্রায়ই শুধুমাত্র শারীরিক সুস্থতাকেই বুঝে থাকি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্বাস্থ্য হলো শরীর, মন এবং সামাজিক জীবনের সামগ্রিক সুস্থতা। শুধুমাত্র অসুখ না থাকলেই কেউ সুস্থ, এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও ধীরে ধীরে শরীরকে অসুস্থ করে তোলে। তাই বাড়িতে বসে স্বাস্থ্য রক্ষা করতে গেলে শারীরিক ও মানসিক দু’দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হয়।

বাড়িতে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিয়ম। ঘুম থেকে ওঠার সময় বদলে যায়, খাওয়ার সময় এলোমেলো হয়, কাজ ও বিশ্রামের সীমারেখা মুছে যায়। এই অনিয়মই নানা শারীরিক সমস্যার মূল কারণ। তাই সুস্থ থাকার প্রথম শর্ত হলো একটি নির্দিষ্ট দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করা। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, সময়মতো খাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোনোর অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে। সকালের কিছুটা সময় খোলা জানালার ধারে বা বারান্দায় কাটালে শরীর প্রাকৃতিক আলো ও তাজা বাতাস পায়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। অনেকে মনে করেন বাড়িতে বসে শরীরচর্চা করা কঠিন। কিন্তু বাস্তবে ঘরের মধ্যেই এমন অনেক ব্যায়াম রয়েছে, যেগুলির জন্য আলাদা যন্ত্রপাতি বা বড় জায়গার প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত হালকা স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম কিংবা নিজের ওজন ব্যবহার করে করা ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখে। দিনের মাত্র ত্রিশ মিনিট ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন ভালো করে, হাড় ও পেশিকে শক্ত রাখে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাঁরা সারাদিন বসে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই ব্যায়াম অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্য রক্ষার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যাভ্যাস। বাড়িতে থাকলে অনেক সময় খাওয়াদাওয়ার দিকে অতিরিক্ত অবহেলা হয় অথবা উল্টোভাবে অকারণে বেশি খাওয়া হয়ে যায়। বাইরের ফাস্টফুড, ভাজাভুজি বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাত খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তার পরিবর্তে ঘরোয়া রান্না করা খাবারই সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, শস্য ও পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। অতিরিক্ত তেল, নুন ও চিনি কমানো দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগ থেকে রক্ষা করে। বাড়িতে বসে কাজ করার সময় একটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, তা হলো জলপান। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করলেও জল খেতে ভুলে যান। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য পর্যাপ্ত জল অত্যন্ত জরুরি। দিনে পর্যাপ্ত জল না খেলে হজমের সমস্যা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এমনকি ত্বকের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। নিয়ম করে জল খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে ভিতর থেকে সুস্থ রাখে এবং কর্মক্ষমতাও বাড়ায়।

শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা বাড়িতে বসে থাকার ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটানা ঘরের মধ্যে থাকলে একাকিত্ব, বিরক্তি বা অকারণ উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। এই মানসিক চাপ দীর্ঘদিন চললে শরীরের উপরও তার প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা জরুরি। বই পড়া, গান শোনা, ধ্যান করা বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা মানসিক প্রশান্তি দেয়। অযথা অতিরিক্ত সংবাদ দেখা বা সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটানো মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে, তাই সেগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম সুস্থ থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত। বাড়িতে থাকার ফলে অনেকেই রাত জেগে মোবাইল বা টিভি দেখেন, যার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। ঘুম কম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ক্লান্তি বাড়ে। প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম শরীরকে নতুন করে শক্তি জোগায়। ঘুমোনোর আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা ও শান্ত পরিবেশ তৈরি করা ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক। বাড়ির পরিবেশ পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর না হলে সুস্থ থাকা কঠিন। নিয়মিত ঘর পরিষ্কার রাখা, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করা স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপরিষ্কার পরিবেশে সহজেই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই বাড়িকেই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর আশ্রয় হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। সবশেষে বলা যায়, সুস্থ থাকার জন্য সব সময় বাইরে যাওয়া বা বড় খরচের প্রয়োজন নেই। সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত অভ্যাস এবং সামান্য যত্নেই বাড়িতে বসে স্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব। ঘরই যদি হয় আমাদের কর্মক্ষেত্র ও বিশ্রামের জায়গা, তবে সেই ঘরকেই সুস্থতার কেন্দ্র করে তুলতে হবে। নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিলেই ঘরের মধ্যেই গড়ে উঠতে পারে সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন।

Archive

Most Popular