11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মরশুম বদলের সময় কেন বাড়ে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


আবহাওয়ার পরিবর্তন আমাদের শরীরের উপর গভীর প্রভাব ফেলে এই বিষয়টি আমরা প্রায়ই অনুভব করি। কখনও সর্দি-কাশি বাড়ে, কখনও ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়, আবার কখনও হজমের গোলমাল। কিন্তু অনেকেই জানেন না, মরশুম বদলের সময় কিডনি স্টোনের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গরম পড়া শুরু হলে বা শীতের পর হঠাৎ তাপমাত্রা বাড়লে অনেক মানুষের শরীরে কিডনি স্টোনের সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এই সময় শরীরের জলসমতা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনই এর অন্যতম প্রধান কারণ। কিডনি স্টোন বা বৃক্কে পাথর তৈরি হওয়া একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। কিডনির মধ্যে বিভিন্ন খনিজ ও লবণের জমাট বাঁধা থেকেই এই পাথর তৈরি হয়। এগুলো কখনও খুব ছোট হয়, আবার কখনও বড় আকার ধারণ করতে পারে। অনেক সময় এই পাথর মূত্রনালীর পথে নেমে এলে তীব্র ব্যথা, বমি, জ্বর বা প্রস্রাবে জ্বালার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাই এই সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

মরশুম পরিবর্তনের সঙ্গে কিডনি স্টোনের সম্পর্ক মূলত শরীরের জলশূন্যতার সঙ্গে জড়িত। গরমের সময় আমাদের শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় আমরা সেই পরিমাণ জল পান করি না। ফলে শরীরের মধ্যে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন ক্যালসিয়াম, অক্সালেট বা ইউরিক অ্যাসিড ঘন হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করে। এই জমাট বাঁধা পদার্থই ধীরে ধীরে কিডনির মধ্যে পাথরের আকার নিতে পারে। আবার শীতের সময়ও একটি ভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। শীতকালে অনেকেই তুলনামূলকভাবে কম জল পান করেন, কারণ তৃষ্ণা তেমন অনুভূত হয় না। এতে শরীরে জল কমে যায় এবং প্রস্রাবের পরিমাণও কম হয়। এর ফলে শরীরের বর্জ্য পদার্থ ঠিকভাবে বেরোতে পারে না এবং কিডনিতে জমে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই শীতের শেষে বা গরমের শুরুতে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।খাদ্যাভ্যাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মরশুম বদলের সময় অনেকেই খাবারের ধরনে পরিবর্তন আনেন। গরমে ঠান্ডা পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, বেশি লবণযুক্ত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এসব খাবারে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম বা চিনি শরীরে খনিজের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যা কিডনি স্টোন তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল শারীরিক সক্রিয়তার পরিবর্তন। গরমে অনেকেই বাইরে বেরোতে বা ব্যায়াম করতে অনীহা বোধ করেন। ফলে শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়াও কিছুটা ধীর হয়ে যায়। এতে শরীরের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ জমে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।চিকিৎসকদের মতে, কিডনি স্টোনের সমস্যা অনেক সময় প্রথমে বোঝা যায় না। কিন্তু যখন পাথরটি মূত্রনালীর পথে নামতে শুরু করে, তখন তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। সাধারণত কোমরের পাশ থেকে শুরু হওয়া এই ব্যথা পেটের নীচের দিকে বা কুঁচকির দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় বমি বমি ভাব, প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি বা জ্বালাও দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে সুখবর হল, কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পর্যাপ্ত জল পান করা। চিকিৎসকরা সাধারণত দিনে অন্তত দুই থেকে তিন লিটার জল পান করার পরামর্শ দেন। এতে শরীরের বর্জ্য পদার্থ সহজেই প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে এবং কিডনিতে জমাট বাঁধার সম্ভাবনা কমে।

খাদ্যাভ্যাসেও কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার বা অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা ভালো। একই সঙ্গে ফল, সবজি এবং আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া উচিত। লেবু বা অন্যান্য সাইট্রাস ফলও কিডনি স্টোন প্রতিরোধে সহায়ক বলে মনে করা হয়, কারণ এতে থাকা সাইট্রেট খনিজ জমাট বাঁধা রোধ করতে সাহায্য করে। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামও কিডনির সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা ব্যায়াম শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখে এবং বর্জ্য পদার্থ বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। এছাড়া যাদের আগে কিডনি স্টোনের সমস্যা হয়েছে, তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকা দরকার। কারণ একবার স্টোন হলে ভবিষ্যতে আবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

মরশুম বদলের সময় শরীরের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরও বিভিন্নভাবে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। এই সময় পর্যাপ্ত জল পান করা, সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করলে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সঠিক জীবনযাপনই পারে এই যন্ত্রণাদায়ক সমস্যাকে অনেকটাই দূরে রাখতে। তাই মরশুম বদলের সময় একটু বাড়তি সতর্কতা নিলেই কিডনিকে সুস্থ রাখা সম্ভব।

Archive

Most Popular