19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া: মুখের ব্যথার এক জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক রূপ

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


মুখের এক পাশে আচমকা বিদ্যুৎচমকানো ব্যথা যদি বারবার হয় এবং সেই ব্যথা এত তীব্র হয় যে সাধারণ কাজ যেমন কথা বলা, দাঁত ব্রাশ করা, এমনকি বাতাসে মুখ লাগলেও সেটা সহ্য করা যায় না তাহলে সেটা হতে পারে একটি স্নায়বিক রোগ, যার নাম ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া (Trigeminal Neuralgia)। এটি বিরল হলেও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক একটি অবস্থা, যার ফলে রোগীর জীবনযাপন চরমভাবে ব্যাহত হতে পারে।


রোগটির পরিচয়

ট্রাইজেমিনাল নার্ভ কী?

মানবদেহে মোট ১২টি ক্র্যানিয়াল নার্ভ রয়েছে, তার মধ্যে ৫ নম্বরটি হলো ট্রাইজেমিনাল নার্ভ, যা আমাদের মুখ, চোয়াল, দাঁত, চোখ, ও কপালের সংবেদন নিয়ন্ত্রণ করে। এই নার্ভেই যদি কোনো কারণে সমস্যা দেখা দেয়, তখনই হয় ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া।


লক্ষণ: কীভাবে চিনবেন এই রোগ?

প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • মুখের এক পাশে হঠাৎ অত্যন্ত তীব্র ব্যথা

  • ব্যথার ধরণ হয় বিদ্যুৎচমকানো, ছুরির ঘা-এর মতো বা জ্বালা করা

  • ব্যথা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে, দিনে বারবার হতে পারে

  • মুখ ধোয়া, চিবোনো, কথা বলা, দাঁত ব্রাশ করা, বা হালকা ছোঁয়া – এসব থেকেই ব্যথা শুরু হতে পারে

  • অনেক সময় মুখে স্পর্শ করলেই ব্যথা হয়, যাকে trigger zones বলা হয়


কারণ: কেন হয় এই রোগ?

সাধারণত তিনটি প্রধান কারণে ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া হতে পারে:

  1. নার্ভে চাপ পড়া (Nerve compression): ট্রাইজেমিনাল নার্ভের উপর রক্তনালী চাপ দিলে নার্ভ অতিসংবেদনশীল হয়ে যায়।

  2. নিউরোলজিক্যাল রোগ: যেমন Multiple Sclerosis, যা নার্ভের মাইলিন শীথ নষ্ট করে।

  3. টিউমার বা আঘাত: কোনো টিউমার বা ট্রমা নার্ভে চাপ সৃষ্টি করলে এটি হতে পারে।

কখনও কখনও এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না – একে তখন Idiopathic Trigeminal Neuralgia বলা হয়।


চিকিৎসা: কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

১. ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা (Drug Therapy):

  • Carbamazepine (কারবামাজেপিন) — সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর ওষুধ

  • Oxcarbazepine, Baclofen, Gabapentin — অন্যান্য ব্যবহৃত ওষুধ

  • এই ওষুধগুলো স্নায়ুর অতিসংবেদনশীলতা কমায় এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে

২. সার্জিকাল চিকিৎসা (Surgical Options):

যদি ওষুধে কাজ না হয় বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হয়, তবে নিচের পদ্ধতিগুলি প্রয়োগ করা হয়:

  • Microvascular Decompression (MVD): ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার সার্জিক চিকিৎসা

    Microvascular Decompression (MVD) হলো ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া-সহ কিছু নির্দিষ্ট নিউরোলজিক্যাল সমস্যার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত একটি কার্যকর সার্জিক্যাল পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মুখের ব্যথার মূল কারণ — স্নায়ুর ওপর রক্তনালীর চাপ — স্থায়ীভাবে দূর করা হয়।


    কী হয় এই প্রক্রিয়ায়?

    • ট্রাইজেমিনাল নার্ভে যেই রক্তনালী চাপ সৃষ্টি করছে, সেটি অপসারণ করা হয়।

    • রক্তনালী ও নার্ভের মাঝখানে একটি ছোট টেফলন প্যাড রাখা হয়, যাতে তারা পরস্পরের সংস্পর্শে না আসে।

    • এটি একটি মস্তিষ্কের বেসে (posterior fossa) হওয়া ডেলিকেট সার্জারি, সাধারণত সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে হয়।


    উপকারিতা:

    • ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ বা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়

    • দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ ছাড়াই আরাম পাওয়া যায়

    • নার্ভকে ধ্বংস না করেই সমস্যার সমাধান হয়


    সম্ভাব্য ঝুঁকি:

    • সাময়িক মাথাব্যথা বা ঝিমঝিম

    • শ্রবণশক্তি বা ব্যালেন্সের সমস্যা (অতি বিরল)

    • ইনফেকশন বা রক্তক্ষরণ (সার্জারির সাধারণ ঝুঁকি)


    কার জন্য উপযুক্ত?

    • যাঁরা ঔষধে আরাম পাচ্ছেন না বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে

    • দীর্ঘমেয়াদে ব্যথা মুক্ত থাকতে চান

    • শারীরিকভাবে সার্জারির জন্য ফিট আছেন


    MVD হল ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার অন্যতম স্থায়ী চিকিৎসা, যা স্নায়ুর মূল সমস্যার সমাধান করে। যদিও এটি একটি ইনভেসিভ পদ্ধতি, সঠিক ক্ষেত্রে এটি ব্যথামুক্ত জীবন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।

  • Radiofrequency Rhizotomy: তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি

    Radiofrequency Rhizotomy (RFR) হলো ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া-সহ নির্দিষ্ট স্নায়বিক ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি আধুনিক, কম ইনভেসিভ পদ্ধতি। এতে ট্রাইজেমিনাল নার্ভের সংবেদনশীল অংশকে নিয়ন্ত্রিত তাপে ক্ষতিগ্রস্ত করে ব্যথার সংকেত বন্ধ করে দেওয়া হয়।


    পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে?

    1. রোগীকে স্থানীয় অ্যানেস্থেশিয়া ও হালকা সিডেশন দিয়ে প্রস্তুত করা হয়।

    2. স্ক্যান (ফ্লুরোস্কোপি বা CT) এর সাহায্যে সঠিকভাবে একটি সূচি নার্ভে প্রবেশ করানো হয়।

    3. এরপর সেই সূচির মাধ্যমে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ পাঠানো হয়, যাতে নার্ভের ব্যথার অংশ হালকা পুড়ে যায়।

    4. ফলে ব্যথার সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে না।


    এই চিকিৎসার সুবিধা:

    • কম ইনভেসিভ: কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই হয়

    • দ্রুত ফল পাওয়া যায়: ব্যথা অনেকাংশে কমে যায় প্রথম সেশনেই

    • ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমে

    • বয়স বা শারীরিক সমস্যার কারণে যারা সার্জারি করতে পারেন না, তাঁদের জন্য আদর্শ


    সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:

    • মুখে কিছুটা অসাড়তা (temporary numbness)

    • মাঝে মাঝে ব্যথা ফিরে আসতে পারে

    • খুব কম ক্ষেত্রে ইনফেকশন বা রক্তক্ষরণ


    কার জন্য উপযুক্ত এই পদ্ধতি?

    • যাঁরা দীর্ঘদিন ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার ব্যথায় ভুগছেন

    • ওষুধে কাজ হচ্ছে না বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সমস্যা

    • Microvascular Decompression সম্ভব নয় বা ঝুঁকিপূর্ণ

    Radiofrequency Rhizotomy হলো ব্যথা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি, যা অল্প ঝুঁকিতে দ্রুত উপশম দিতে পারে। এটি নার্ভ ধ্বংস না করে কেবল ব্যথার সংকেত বন্ধ করে দিয়ে রোগীর জীবনযাত্রা সহজ করে তোলে।

  • Gamma Knife Radiosurgery: ব্যথাহীন অথচ অত্যন্ত নির্ভুল রেডিওথেরাপি পদ্ধতি

    Gamma Knife Radiosurgery একটি আধুনিক, নন-ইনভেসিভ (কাটা-ছেঁড়াহীন) রেডিওথেরাপি পদ্ধতি, যা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের ছোট ছোট সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া সহ বেশ কিছু নিউরোলজিক্যাল রোগে এটি বিশেষ কার্যকর।


    পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করে?

    • এই পদ্ধতিতে কোনো ছুরি ব্যবহার করা হয় না, বরং ১৯২টি রেডিওএক্টিভ বিম একত্রে এক নির্দিষ্ট লক্ষ্যে (যেমন ট্রাইজেমিনাল নার্ভের একাংশে) কেন্দ্রীভূত করা হয়

    • রেডিয়েশনের মাধ্যমে স্নায়ুর অতিসংবেদনশীলতা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ব্যথার সংকেত বন্ধ হয়।

    • পুরো প্রক্রিয়াটি একদিনেই সম্পন্ন হয় এবং রোগী একই দিনে বাড়ি ফিরতে পারেন।


    গামা নাইফ-এর সুবিধাসমূহ:

    • কোনো কাটাছেঁড়া নেই – সম্পূর্ণ নন-ইনভেসিভ

    • সর্বোচ্চ নির্ভুলতা, ফলে আশেপাশের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না

    • সাধারণত অ্যানেস্থেশিয়া লাগে না বা খুব অল্প লাগে

    • দীর্ঘমেয়াদে ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়

    • সার্জারি বা ইনজেকশনের ঝুঁকি নেই


    সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা:

    • ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে

    • কিছু ক্ষেত্রে একাধিক সেশন দরকার হতে পারে

    • ব্যথা ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে (কম)


    কার জন্য উপযুক্ত এই পদ্ধতি?

    • যাঁরা সার্জারি করাতে চান না বা শারীরিকভাবে উপযুক্ত নন

    • যাঁদের ক্ষেত্রে ওষুধে উপশম হয়নি

    • দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার কষ্টে ভুগছেন কিন্তু রিস্ক ফ্রি সমাধান চান

    Gamma Knife Radiosurgery হলো আধুনিক চিকিৎসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত—যেখানে না কাটা হয়, না ব্যথা হয়, তবু সমস্যার মূল লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানা যায়। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া-সহ অনেক জটিল স্নায়বিক রোগে এটি রোগীর জীবনে নতুন আশার আলো জাগাতে সক্ষম।

৩. অন্যান্য উপায়:

  • Laser Therapy বা Nerve Block: কখনো-কখনো অস্থায়ী উপশম দেয়


কাকে দেখাবেন?

এই রোগের ক্ষেত্রে একজন নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, বা পেইন ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট-এর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই রোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া একটি ছোট নার্ভের সমস্যা হলেও এর প্রভাব অনেক বড় – এটি একটি সাধারণ জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন এই রোগের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সঠিক সময়ে রোগ চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

Archive

Most Popular