স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে বাইরে বেরোনো মানেই শরীরের ওপর বাড়তি চাপ। বিশেষ করে উত্তর ও পূর্ব ভারতের বহু অঞ্চলের মতোই আমাদের এখানেও গরমের দিনে হঠাৎ করে শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক সমস্যাগুলির একটি হল ‘লু লাগা’ যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হিটস্ট্রোক বলা হয়। অনেকেই এটিকে সাধারণ গরম লেগে যাওয়া বা ক্লান্তি বলে এড়িয়ে যান, কিন্তু সময়মতো সতর্ক না হলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। লু লাগা মূলত তখনই হয়, যখন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। সাধারণত আমাদের শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু প্রচণ্ড গরমে বা দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং তা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
লু লাগার প্রাথমিক লক্ষণগুলি অনেক সময় সাধারণ গরমের ক্লান্তির মতোই মনে হয়। যেমন অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, মাথাব্যথা বা বমি বমি ভাব। অনেক সময় শরীর খুব গরম লাগে কিন্তু ঘাম হয় না এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। ত্বক লাল ও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, এবং শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হতে পারে। এই অবস্থায় যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, আচরণে পরিবর্তন, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি, এবং তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
লু লাগার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দ্রুত শরীরকে ঠান্ডা করা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। শরীরের অতিরিক্ত কাপড় খুলে দিতে হবে এবং ঠান্ডা জল দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে বা ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। যদি সম্ভব হয়, ফ্যান বা কুলারের বাতাসে রাখা যেতে পারে। তবে বরফ ঠান্ডা জল সরাসরি ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ এতে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ করে কমে গিয়ে অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।জলশূন্যতা লু লাগার একটি বড় কারণ, তাই আক্রান্ত ব্যক্তি যদি সচেতন থাকেন, তাহলে তাকে অল্প অল্প করে জল, ওআরএস বা লবণ-চিনির জল খাওয়ানো যেতে পারে। তবে যদি তিনি অচেতন হন বা গিলতে অসুবিধা হয়, তাহলে জোর করে কিছু খাওয়ানো উচিত নয়।
এখন প্রশ্ন হল কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন? যদি শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি হয়, যদি ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়েন, বা তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তাহলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এমনকি প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেও যদি তা দ্রুত না কমে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। লু লাগা প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। গরমের দিনে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বাইরে না যাওয়াই ভালো। যদি যেতেই হয়, তাহলে মাথা ঢেকে বেরোনো, হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং সঙ্গে জল রাখা অত্যন্ত জরুরি। শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা অর্থাৎ পর্যাপ্ত জল, লেবুর শরবত, ডাবের জল ইত্যাদি পান করা লু প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং যাঁদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে লু লাগার ঝুঁকি বেশি। তাই এই গোষ্ঠীর মানুষদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
অনেক সময় আমরা গরমকে হালকাভাবে নিই, ভাবি ‘এতে কিছু হবে না’। কিন্তু বাস্তবতা হল, লু লাগা একটি গুরুতর শারীরিক অবস্থা, যা অবহেলা করলে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, গরমের দিনে নিজের শরীরের প্রতি একটু বেশি যত্ন নেওয়া মানেই অনেক বড় সমস্যাকে এড়িয়ে চলা। লু লাগা প্রতিরোধ করা কঠিন নয়, যদি আমরা সচেতন থাকি এবং কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলি। আর যদি কখনও মনে হয় পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আপনার সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই বাঁচাতে পারে একটি মূল্যবান জীবন।