স্বাস্থ্য
অভ্রান্ত রায়
খুব অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ধরা পড়েছে। একটা সময় ছিল, এই ঘটনা বেশ তোলপাড় তুলত। কিন্তু এই সমস্যা আজ আর নতুন নয়। ঘরে ঘরে ১৬/১৭ বছর বয়সে ধরা পড়ছে এই হাই ব্লাড প্রেশার। অনেকেরই আবার দুবেলা ওষুধ খাওয়ার পরেও নিয়ন্ত্রণে থাকছে না প্রেশার। এ ক্ষেত্রে ওষুধের থেকেও বেশি কাজে দেয় লাইফস্টাইল পরিবর্তন। জীবনযাপনে খুব ছোট ছোট বদল এনে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় নিজেকে।
বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলুন
ডাক্তারি হিসেব বলে অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে ফেলতে পারলে নিয়ন্ত্রণে থাকবে আপনার ব্লাড প্রেশার। ২২ পাউন্ড করালে ১ মিলিমিটার/পারদ ব্লাড প্রেশার কমে যায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কোমরের মাপ যদি ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার কোমরের মাপ যদি ৩৫ ইঞ্চির বেশি হয়, অবিলম্বে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলতে হবে।
নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা করুন
সপ্তাহে ১৫০ মিনিট, অর্থাৎ পাঁচদিন ৩০ মিনিট করে হালকা থেকে ভারী শরীরচর্চা করুন। ব্রিস্ক ওয়াক, মানে ঘাম ঝরিয়ে হাঁটলে, সাইক্লিং করলে অথবা সাঁতার কাটলে শরীর চনমনে থাকে। ব্লাড প্রেশারও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
স্বাস্থ্যকর ডায়েটে থাকুন
বাজার থেকে যখন জিনিস কিনবেন, প্যাকেটের গায়ে থাকা উপাদান কী অনুপাতে রয়েছে দেখে নিন। অবশ্যই পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার, শাক সবজি, ফল, জল প্রচুর পরিমাণে খান। কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে প্রোটিন খাওয়া বাড়ান।
ডায়েট থেকে বাদ দিন সোডিয়াম
খাবার পাতে নুন খাবেন না। রান্নায় যথাসম্ভব নুন কমিয়ে দিন। প্রসেসড খাওয়ার বর্জন করুন। ফ্রেশ রান্না করা খাবার খান।
ধূমপান ছাড়ুন, মদ্যপান কমান ধূমপান পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে স্বাভাবিক নিয়মেই হার্টের অবস্থার উন্নতি হবে। তার সঙ্গে কমিয়ে ফেলতে হবে অ্যালকোহল জাতীয় সমস্ত পানীয়র অভ্যেস।
কফি কম খান
যারা নিয়মিত কফি খান, তাঁরা হয়তো তেমন বুঝতে পারবেন না বদলটা। কিন্তু যাদের সেই অভ্যাস নেই, তাঁরা হঠাৎ এই অভ্যাসটা ধরবেন না। আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন, কফি খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে একবার ব্লাড প্রেশার মাপুন। তারপর কফি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে মাপুন। নিজের চোখেই দেখতে পাবেন ফারাকটা।
স্ট্রেস লেভল কমান
মানসিক চাপ থেকে ব্লাড প্রেশার বাড়ার ঘটনা আকছার ঘটছে। এবার চাপ কমানো আপনার হাতেই অনেকটা। মানসিক চাপ উদ্বেগ আসতে পারে, এ ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন। সাংঘাতিক উচ্চাশা থাকলে চাপ হবেই। আপনি যা কিছু নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তা নিয়েই কাজ করুন।
ঘরেই নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন
এখন রক্তচাপ মাপার ডিজিটাল যন্ত্র সবার ঘরে ঘরেই থাকে। নিয়মিত তাতে আপনার রক্তচাপ মাপুন। একটু কম বেশি হলে ক্ষতি নেই। তবে হঠাৎ অনেকটা ফ্লাকচুয়েট করা শুরু করলে অবশ্যই চিকিৎকের পরামর্শ নিন।
রক্তচাপ কমিয়ে আনার প্রাকৃতিক উপায়
উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) ভারতে ক্রমবর্ধমান হারে ঘরে ঘরে। অনুমান করা হচ্ছে যে ভারতে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ বা প্রিহাইপারটেনশন আছে। যদিও একজন ডাক্তার চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু কার্যকর ওষুধেরপরামর্শ দিতে পারবেন তবে সেগুলির বেশিরভাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। রক্তচাপ কমাতে অনেক প্রমাণিত প্রাকৃতিক ও নন-ফার্মাকোলজিকাল পদ্ধতি রয়েছে, তবে কোনটা কাজ করে আর কোনটা করেনা, সেটা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। এখানে আছে হাইপারটেনশন এর বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিকারের একটি তালিকা যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
লবণ কমানো
আপনার খাদ্যে সোডিয়াম (লবণ) এর পরিমাণ হ্রাস করাই হচ্ছে প্রথম কাজ। বেশিরভাগ মানুষ প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ গ্রাম লবণ ব্যবহার করেন। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ৫ গ্রামের থেকে বেশি। অতিরিক্ত লবণের পরিমান অর্ধেক করুন। কম সোডিয়ামযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন।
ডার্ক চকোলেট
ডার্ক চকোলেটে (৭০% বা তার থেকে বেশি কোকো) রয়েছে উপকারী যৌগ, যা পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েড নামে পরিচিত। এই যৌগগুলি শুধুমাত্র রক্তচাপই কমায় না বরং নানারকম হৃদরোগ সম্পর্কিত অন্যান্য পরিমিতি সমূহ আরও উন্নত করতে সহায়তা করে।
বেরি
আপনার নিয়মিত স্বাভাবিক ডায়েটের পাশাপাশি এক পোর্শন বেরি, পলিফেনলসের আকারে অতিরিক্ত সুবিধা যোগ করে, যা আপনার কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়তা করে। চিনিযুক্ত কোমল পানীয় বাদ দিন
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে সোডা বা চিনিযুক্ত কোমলপানীয় উচ্চ মাত্রায় চিনির কারণে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রোটিন:
প্রোটিন (৫৬ গ্রাম) আপনার ডায়েটে যোগ করলে আপনার রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে; উপরন্তু, এটি কার্ডিওভাসকুলার এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অন্যান্য পরামিতি সমূহ উন্নত করতে পারে।
রসুন
রসুন আপনার রক্তচাপ উন্নত করার জন্য একটি কার্যকর এবং নিরাপদ পদ্ধতি। আপনার খাবারে রসুন যোগ করলে তা স্বাস্থ্যকর এবং সুস্বাদু উভয় হবে।
যোগ ব্যায়াম এবং ধ্যান
চাপ (স্ট্রেস) খুব দৃঢ়ভাবে হাইপারটেনশন এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই, যেকোনও কিছু যা চাপকে হ্রাস করতে পারে, তা অবশ্যই রক্তচাপ হ্রাসেও অনিবার্য সুবিধা প্রদান করবে। আপনার দৈনন্দিন জীবনে যোগব্যায়াম, ধ্যান এবং প্রাণায়াম এর মত অনুশীলন যুক্ত করুন।
টু কফি অর নট টু কফি:
এটা সত্য যে কফি (বা চা এবং নরম পানীয় সহ অন্য কোনওরূপের ক্যাফিন) রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, তবে সেটি খুব সামান্য বৃদ্ধি হয়। এছাড়াও, বিভিন্ন ব্যক্তি কফির প্রতি ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া করেন এবং কিছু গবেষণা রক্তচাপের উপর ক্যাফিনের কোন প্রভাব খুঁজে পায়নি। সংক্ষেপে, বর্তমানে, ক্যাফিন এবং উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে কোনও শক্তিশালী সম্পর্ক নেই।
প্রেসার লো? হাতের কাছেই রয়েছে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়
উচ্চ রক্তচাপ স্বাস্থ্যের জন্য কী পরিমাণে ভয়ংকর সে সম্পর্কে সবারই ধারণা রয়েছে কিন্তু নিম্ন রক্তচাপও কখনও কখনও ভয়ংকর প্রমানিত হতে পারে। নিম্ন রক্তচাপকে হাইপারটেশন বলা হয়। যদি ব্লাড প্রেশার ৯০ বা ৯০ এর নিচে হয় তবে নিম্ন রক্তচাপ আছে ধারণা করা হয়। ঘরোয়া কিছু উপায় আছে যার মাধ্যমে নিম্ন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নুন জল নুনে সোডিয়াম আছে যা রক্তচাপকে বাড়িয়ে দেয়। তবে অতিরিক্ত নুন গ্রহণ করা উচিত নয়। এক গ্লাস জলে আর্ধেক চামচ নুন মিশিয়ে নিন। প্রতিদিন ২ গ্লাস নুন জল খান। দেখবেন রক্তচাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
হাই ব্লাড প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণসমূহ
বর্তমানে এমন কোনও একটি বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে কোনও একজন হাইপারটেনশনের রোগী নেই। উচ্চ রক্তচাপের একেবারে সুনির্দিষ্ট কোনও লক্ষণ সেভাবে প্রকাশ পায় না। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
১। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করা, মাথা গরম হয়ে যাওয়া এবং মাথা ঘোরানো
২। ঘাড় ব্যথা করা
৩। বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
৪। অল্পতেই রেগে যাওয়া বা অস্থির হয়ে শরীর কাঁপতে থাকা
৫। রাতে ভালো ঘুম না হওয়া
৬। মাঝে মাঝে কানে শব্দ হওয়া
৭। অনেক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলা
এসব লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে হবে। এবং ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণ
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
পরিবারে কারও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে
প্রতিদিন ছয় গ্রাম অথবা এক চা চামচের বেশি লবণ খেলে
উচ্চ রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণ
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেশারকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কেননা, অনেকের ক্ষেত্রে এই রোগ খুব সহজে না হলে বা প্রেশার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা অনেক রোগের ধরা যায় না। আবার ধরা পড়ার পর এর সঠিক চিকিৎসা কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সবথেকে ভালো উপায় হলো জীবনযাত্রা বা লাইফস্টাইল পরিবর্তন করা। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ বা ওষুধ গ্রহণই এর একমাত্র চিকিৎসা নয়, ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়। যেমন অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করে গ্রহণযোগ্য ওজন বজায় রাখা।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা।
নিয়মিত ব্যায়াম করা।
রাতে সঠিকভাবে ঘুমানো।
অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলা।
ধূমপান থেকে বিরত থাকা।