স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গরমকাল মানেই শুধু রোদ, ঘাম আর অস্বস্তি নয়। এই সময় শিশুদের মধ্যে সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, জ্বর কিংবা বারবার ঠান্ডা লাগার সমস্যাও অনেক বেড়ে যায়। অনেক অভিভাবকই অবাক হয়ে ভাবেন, এত গরমের মধ্যেও বাচ্চারা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে কেন! আসলে গরমের সময় শরীরের উপর বাড়তি চাপ পড়ে। অতিরিক্ত ঘাম, হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডা পরিবেশে যাওয়া, অনিয়মিত খাবার বা কম জল খাওয়ার কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর তখনই সহজে ভাইরাল সংক্রমণ বা ঠান্ডা লাগার সমস্যা দেখা দেয়। শিশুদের শরীর বড়দের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাই আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেও তাদের শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ওষুধ নয়, বরং প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, পরিচ্ছন্নতা এবং জীবনযাত্রার উপরই অনেকটা নির্ভর করে শিশুদের ইমিউনিটি।
গরমের সময় বাচ্চাদের শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী রাখতে সবচেয়ে জরুরি হল পর্যাপ্ত জল খাওয়ানো। অনেক শিশু ঠিকমতো জল খেতে চায় না। ফলে শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হয় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শুধুমাত্র সাধারণ জল নয়, ডাবের জল, লেবুর শরবত, ঘরে তৈরি ফলের রস কিংবা হালকা ঘোলও খাওয়ানো যেতে পারে। এতে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং ক্লান্তিও কম হয়।
এই সময় শিশুদের প্যাকেটজাত ঠান্ডা খাবার বা অতিরিক্ত কোল্ড ড্রিংক খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার অনেক সময় গলা ব্যথা ও সর্দির কারণ হতে পারে। তাই আইসক্রিম বা ঠান্ডা পানীয় পুরোপুরি বন্ধ না করলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। তার বদলে বাড়িতে তৈরি ঠান্ডা ফল, দই বা স্বাস্থ্যকর পানীয় খাওয়ানো অনেক বেশি উপকারী।
শিশুদের ইমিউনিটি বাড়াতে সঠিক খাবারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, ডাল, দুধ, সবুজ শাকসবজি ও মৌসুমি ফল রাখা দরকার। বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন কমলালেবু, আমলকি বা লেবু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। অনেক সময় গরমে বাচ্চাদের খিদে কমে যায়, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানোর অভ্যাস করা ভালো।
শুধু খাবার নয়, পর্যাপ্ত ঘুমও শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মোবাইল, টিভি বা গেমের কারণে বাচ্চাদের ঘুম কমে যায়। কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম খুবই জরুরি। ভালো ঘুম শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও কমায়।
গরমের সময় অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের কারণেও অনেক শিশু বারবার ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাইরে প্রচণ্ড গরম থেকে হঠাৎ খুব ঠান্ডা ঘরে ঢুকলে শরীরের উপর চাপ পড়ে। তাই এসির তাপমাত্রা খুব কম না রেখে স্বাভাবিক রাখাই ভালো। ঘেমে থাকা অবস্থায় সরাসরি ঠান্ডা হাওয়ায় যাওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত।
শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শেখানোও অত্যন্ত জরুরি। বাইরে থেকে ফিরে বা খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনেক সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। গরমের সময় জীবাণুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ে, তাই শিশুদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখাও প্রয়োজন।
অনেক অভিভাবক গরমের ভয়ে বাচ্চাদের একেবারে ঘরের মধ্যে আটকে রাখেন। কিন্তু সকালে বা বিকেলের দিকে কিছুটা সময় খেলাধুলো করা শিশুদের শরীরের জন্য ভালো। হালকা শরীরচর্চা ও সক্রিয় জীবনযাত্রা ইমিউনিটি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তবে দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা উচিত।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সবসময় বকাঝকা, পড়াশোনার চাপ বা একঘেয়েমি থেকেও শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা বা খেলাধুলোয় উৎসাহ দেওয়াও তাদের সুস্থ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সামান্য সর্দি-কাশি হলেই নিজের মতো করে ওষুধ না খাওয়ানো। বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়। সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। গরমের সময় শিশুদের বারবার ঠান্ডা লাগা খুব সাধারণ সমস্যা হলেও সচেতন থাকলে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত জল, ভালো ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই শিশুদের শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে তোলে। ছোট ছোট যত্নই তাদের সুস্থ ও হাসিখুশি রাখার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।