স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
চুল পাকা ঢাকতে, নিজের লুক বদলাতে কিংবা ফ্যাশনের কারণে আজকাল অনেকেই নিয়মিত হেয়ার কালার ব্যবহার করেন। বাজারে বিভিন্ন ধরনের হেয়ার ডাই ও কালার সহজলভ্য হওয়ায় এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। তবে আকর্ষণীয় চুলের রঙের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা শুধু চুল নয়, স্ক্যাল্প বা মাথার ত্বকের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হেয়ার কালার সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে বা অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে চুলের গঠন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে স্ক্যাল্পে অ্যালার্জি, জ্বালা বা অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই হেয়ার কালার ব্যবহারের আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
অধিকাংশ স্থায়ী হেয়ার কালারে অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান থাকে। এগুলি চুলের বাইরের স্তর খুলে দিয়ে রঙকে চুলের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এর ফলে চুলে দীর্ঘস্থায়ী রং আসে ঠিকই, কিন্তু বারবার এই প্রক্রিয়া চললে চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও শক্তি কমে যেতে পারে। নিয়মিত হেয়ার কালার করলে অনেকের চুল শুষ্ক, রুক্ষ এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। চুলের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা কমে যায় এবং চুল ভাঙা বা আগা ফাটার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ঘন ঘন ব্লিচিং বা হালকা রঙে চুল রাঙান, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
তবে শুধু চুলই নয়, স্ক্যাল্পও এই রাসায়নিকের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে হেয়ার ডাই ব্যবহারের পর মাথার ত্বকে চুলকানি, জ্বালা, লালচে ভাব বা র্যাশ দেখা যায়। কিছু মানুষের শরীর বিশেষ কিছু রাসায়নিকের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় অ্যালার্জির ঝুঁকিও থাকে। কখনও কখনও অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র হতে পারে যে মুখ, চোখ বা কপাল ফুলে যেতে পারে। স্ক্যাল্পের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে। এর ফলে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, খুশকির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই সোরিয়াসিস, একজিমা বা অন্য কোনও স্ক্যাল্পের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তবে হেয়ার কালার ব্যবহার করলেই যে অবশ্যই ক্ষতি হবে, এমন নয়। কিছু সহজ সতর্কতা মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। নতুন কোনও হেয়ার ডাই ব্যবহার করার আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করা উচিত। সাধারণত কানের পিছনে বা হাতের ভেতরের অংশে সামান্য পরিমাণ ডাই লাগিয়ে ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করলে অ্যালার্জির সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। খুব ঘন ঘন চুলে রং না করাই ভালো। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত রং করার মধ্যে পর্যাপ্ত বিরতি রাখার পরামর্শ দেন, যাতে চুল ও স্ক্যাল্প পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। পাশাপাশি কালার করা চুলের জন্য উপযোগী শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুলের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সুবিধা হয়।
রং করার আগে ও পরে চুলের বিশেষ যত্ন নেওয়াও জরুরি। নিয়মিত হেয়ার মাস্ক, তেল মালিশ এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস চুলকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক এবং ভিটামিন থাকলে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অনেকেই বাড়িতে নিজেরাই হেয়ার কালার করেন। সে ক্ষেত্রে নির্দেশিকা ভালোভাবে পড়ে সঠিক সময় পর্যন্ত রং লাগিয়ে রাখা উচিত। অতিরিক্ত সময় ধরে ডাই রেখে দিলে চুল ও স্ক্যাল্পের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সৌন্দর্যচর্চা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে, তবে তার সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই হেয়ার কালার ব্যবহারের আগে এবং পরে চুল ও স্ক্যাল্পের যত্ন নেওয়া জরুরি। সচেতনভাবে ব্যবহার করলে সুন্দর রঙিন চুলের পাশাপাশি মাথার ত্বকের সুস্থতাও বজায় রাখা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সুস্থ স্ক্যাল্পই সুন্দর চুলের ভিত্তি। তাই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিকে নয়, চুলের মূল স্বাস্থ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।