18th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মোবাইলে ডুবে বাবা-মা, একাকিত্বে সন্তান, ‘ফাবিং’-এর ফাঁদে নতুন প্রজন্ম!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


একসময় পরিবারের সবাই দিনের শেষে একসঙ্গে বসে গল্প করত, খাওয়া-দাওয়া করত, দিনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিত। এখন সেই দৃশ্য ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। একই ঘরে বসে থাকলেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা যেন আলাদা আলাদা জগতে বাস করছেন। কারও চোখ মোবাইলের পর্দায়, কেউ ব্যস্ত সামাজিক মাধ্যমে, কেউ আবার অফিসের মেইল বা অনলাইন ভিডিওতে ডুবে রয়েছেন। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে তৈরি হচ্ছে একটি নতুন সামাজিক সমস্যা—‘ফাবিং’।

‘ফাবিং’ শব্দটি এসেছে ‘ফোন’ এবং ‘স্নাবিং’ শব্দ দুটির সমন্বয়ে। অর্থাৎ, সামনে থাকা মানুষকে উপেক্ষা করে মোবাইল ফোনে মনোযোগ দেওয়া। প্রথমে বিষয়টি খুব সাধারণ বা নিরীহ বলে মনে হলেও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই আচরণ চলতে থাকলে তা সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে বারবার মোবাইলের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তখন শিশুদের মানসিক বিকাশেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করে।বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কাজ, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন—সবকিছুই এখন অনেকাংশে মোবাইলনির্ভর। ফলে ফোন ব্যবহার পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ভার্চুয়াল জগত বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করতে শুরু করে। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সন্তান কিছু বলতে এলে বাবা বা মা ফোন থেকে চোখ তুলছেন না। কখনও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছেন, কখনও বলছেন ‘একটু পরে বলছি’, আবার কখনও সন্তানের কথা শুনতেই পাচ্ছেন না। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলি শিশুর মনে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনেক সময় বড়রা বুঝতে পারেন না।শিশুমন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য বাবা-মায়ের মনোযোগ এবং আবেগগত উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা শুধু খাবার, পোশাক বা শিক্ষার উপর নির্ভর করে বড় হয় না; তারা নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতিও খোঁজে। যখন কোনও শিশু বারবার অনুভব করে যে তার কথা বা উপস্থিতির চেয়ে ফোন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন তার মধ্যে অবহেলিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ শিশুর আত্মবিশ্বাস, ভাষা বিকাশ এবং সামাজিক দক্ষতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অন্যদিকে নিয়মিত উপেক্ষার অভিজ্ঞতা একাকিত্ব, হতাশা এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অবশ্যই সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটা গুরুতর হয় না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা শুধু কথার মাধ্যমে নয়, আচরণ দেখেও শেখে। যদি তারা নিয়মিত দেখে যে বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত, তাহলে তারাও প্রযুক্তিনির্ভর আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করে। ফলে পরিবারে মুখোমুখি কথোপকথনের পরিমাণ কমে যায় এবং প্রত্যেকে ধীরে ধীরে নিজের ডিজিটাল জগতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।ফাবিংয়ের প্রভাব শুধু শিশুদের উপরই পড়ে না। পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বন্ধুদের সম্পর্ক কিংবা কর্মক্ষেত্রের যোগাযোগেও এর প্রভাব দেখা যায়। সামনের মানুষটির দিকে মনোযোগ না দিয়ে বারবার ফোন দেখা হলে অপর পক্ষ নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মান এবং মনোযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফাবিং সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।বর্তমান সময়ে অনেক বাবা-মা যুক্তি দেন যে তাঁরা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছেন, তাই ফোনে ব্যস্ত থাকা প্রয়োজন। এই যুক্তির বাস্তবতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল বিষয় ফোন ব্যবহার নয়, বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণ। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় যদি সন্তানদের জন্য একান্তভাবে বরাদ্দ করা যায়, তাহলে পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন সম্ভব।শিশুরা সাধারণত খুব বেশি সময় চায় না; তারা চায় মনোযোগ। একজন বাবা বা মা যদি প্রতিদিন কিছু সময় সম্পূর্ণভাবে ফোন সরিয়ে রেখে সন্তানের সঙ্গে কথা বলেন, খেলেন বা তার দিনের গল্প শোনেন, তাহলে সেই সময়ের মান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর সঙ্গে নিয়মিত মানসম্পন্ন সময় কাটানো তার আবেগগত সুস্থতা এবং পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।করোনার পরবর্তী সময়ে এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। অনলাইন কাজ এবং ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়ার ফলে অনেক পরিবারেই কাজ ও ব্যক্তিগত সময়ের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরও অনেকেই ফোন বা ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকেন। ফলে সন্তানদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সময় কমে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে সচেতন সীমারেখা তৈরি করা জরুরি।বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ অভ্যাসের উপর জোর দিচ্ছেন। যেমন, খাওয়ার সময় ফোন ব্যবহার না করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন সাইলেন্ট রাখা, শোয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় প্রযুক্তিমুক্ত থাকা এবং শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। এই ছোট ছোট পরিবর্তনই সম্পর্কের গুণগত মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অনেক সময় বাবা-মা নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে তাঁরা ফাবিংয়ের অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছেন। কারণ ফোন দেখা এখন প্রায় স্বয়ংক্রিয় আচরণে পরিণত হয়েছে। কোনও নোটিফিকেশন না এলেও অনেকেই অকারণে ফোন হাতে তুলে নেন। তাই প্রথম পদক্ষেপ হল নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া।প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগকে দ্রুত করেছে এবং তথ্যের জগৎকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি আমাদের সবচেয়ে কাছের সম্পর্কগুলির মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। শিশুদের শৈশব খুব দ্রুত কেটে যায়। আজ যে সন্তান বাবা-মায়ের মনোযোগের জন্য অপেক্ষা করছে, কয়েক বছর পর হয়তো সে নিজের জগৎ তৈরি করে নেবে। তখন হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

ফাবিং কোনও রোগ নয়, কিন্তু এটি আধুনিক জীবনের এমন একটি অভ্যাস, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের উষ্ণতাকে কমিয়ে দিতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করলেও তাকে যেন সম্পর্কের বিকল্প না হতে দেওয়া হয়। সন্তানদের জন্য সবচেয়ে দামি উপহার নতুন গ্যাজেট নয়, বরং বাবা-মায়ের সময়, মনোযোগ এবং উপস্থিতি। আর সেই উপস্থিতিই তাদের মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের সম্পর্ক গঠনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। নতুন প্রজন্মকে একাকিত্বের ফাঁদ থেকে দূরে রাখতে তাই প্রয়োজন শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, প্রযুক্তির সঙ্গে সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখার সচেতনতা।

Archive

Most Popular