18th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ডাবল চিন ও নিষ্প্রাণ ত্বকের সমাধান কি ফেস যোগাতেই লুকিয়ে?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই হঠাৎ লক্ষ্য করেন, মুখের নীচে যেন আরেকটি চিবুক তৈরি হয়েছে। মুখের রেখা আগের মতো স্পষ্ট নেই, গালের টানটান ভাবও কমে গেছে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় নিষ্প্রাণ, ক্লান্ত দেখানো ত্বক, তাহলে উদ্বেগ আরও বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে একাধিক ভিডিও—কেউ বলছেন দিনে মাত্র ১০ মিনিট ফেস যোগা করলেই ডাবল চিন উধাও, কেউ আবার দাবি করছেন, কোনও প্রসাধনী বা চিকিৎসা ছাড়াই ফেস যোগার মাধ্যমে ফিরে পাওয়া সম্ভব তারুণ্যের উজ্জ্বলতা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সত্যিই কি ডাবল চিন এবং নিস্তেজ ত্বকের সমাধান ফেস যোগার মধ্যেই লুকিয়ে আছে?ফেস যোগা বা মুখের ব্যায়াম নতুন কোনও ধারণা নয়। বহু বছর ধরেই বিভিন্ন দেশে এটি জনপ্রিয়। তবে গত কয়েক বছরে সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে এর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়েছে। ফেস যোগার মূল ধারণা হল, শরীরের অন্যান্য পেশির মতো মুখের পেশিগুলিকেও ব্যায়ামের মাধ্যমে সক্রিয় রাখা যায়। নির্দিষ্ট কিছু মুখভঙ্গি, স্ট্রেচিং এবং পেশি সংকোচনের অনুশীলনের মাধ্যমে মুখের পেশিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়।মানুষের মুখে প্রায় ৪০টিরও বেশি পেশি রয়েছে, যেগুলি হাসা, কথা বলা, চোখের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়। ফেস যোগার সমর্থকদের মতে, এই পেশিগুলিকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সক্রিয় রাখলে মুখের গঠন আরও দৃঢ় দেখাতে পারে এবং বয়সের ছাপ কিছুটা কম দৃশ্যমান হতে পারে। তবে এই দাবিগুলির কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।প্রথমে ডাবল চিনের প্রসঙ্গে আসা যাক। ডাবল চিন সাধারণত কয়েকটি কারণে তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, বয়সের সঙ্গে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং ঘাড় বা মুখের পেশির পরিবর্তন—সবই এর জন্য দায়ী হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, শুধু চিবুকের ব্যায়াম করলেই ওই অংশের চর্বি গলে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের কোনও নির্দিষ্ট অংশের চর্বি শুধুমাত্র সেই অংশের ব্যায়ামের মাধ্যমে কমানো সম্ভব নয়। এই ধারণাকে ‘স্পট রিডাকশন’ বলা হয়, যার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।তবে এর অর্থ এই নয় যে ফেস যোগা পুরোপুরি অকার্যকর। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মুখের ব্যায়াম মুখের কিছু পেশিকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে মুখের নির্দিষ্ট অংশ কিছুটা টোনড বা দৃঢ় দেখাতে পারে। চিবুক এবং ঘাড়ের পেশির জন্য করা কিছু ব্যায়াম অস্থায়ীভাবে মুখের রেখাকে আরও স্পষ্ট দেখাতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র ফেস যোগার মাধ্যমে ডাবল চিন পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।ত্বকের উজ্জ্বলতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিষ্প্রাণ বা ম্লান ত্বকের পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, জল কম খাওয়া, দূষণ, পুষ্টির ঘাটতি, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব এবং বয়সজনিত পরিবর্তন—সবই ত্বকের জৌলুস কমিয়ে দিতে পারে। ফেস যোগা করার সময় মুখে রক্তসঞ্চালন কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে অনুশীলনের পর ত্বক সাময়িকভাবে সতেজ এবং উজ্জ্বল দেখাতে পারে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল বলে মনে করেন।চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের স্বাস্থ্য মূলত নির্ভর করে তার আর্দ্রতা, কোলাজেনের পরিমাণ, সূর্যের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা এবং সামগ্রিক শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর। ফেস যোগা রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি ত্বকের বয়সজনিত পরিবর্তন বা কোলাজেনের ক্ষয় পুরোপুরি রোধ করতে পারে না। ফলে একে ত্বকের যত্নের সহায়ক অভ্যাস হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু অলৌকিক সমাধান হিসেবে নয়।তবে ফেস যোগার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। নিয়মিত অনুশীলনের সময় মানুষ নিজের মুখ এবং শরীরের প্রতি সচেতন হন। অনেকের কাছে এটি মানসিক প্রশান্তিরও একটি উপায়। ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া, মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন করা এবং নিজের জন্য কিছু সময় বের করা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। আর মানসিক চাপ কমলে তার ইতিবাচক প্রভাব ত্বকের উপরও পড়তে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ফেস যোগাকে ঘিরে যে প্রচার দেখা যায়, তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত। ‘সাত দিনে ডাবল চিন গায়েব’, ‘এক মাসে ১০ বছর কম বয়সি দেখাবে মুখ’—এই ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। বাস্তবে মুখের গঠন, ত্বকের অবস্থা এবং বয়সজনিত পরিবর্তন এত দ্রুত বদলে যায় না। ফলে এমন প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ভুলভাবে বা অতিরিক্ত জোর দিয়ে মুখের ব্যায়াম করলে উল্টো অস্বস্তিও হতে পারে। যাঁদের চোয়ালের সমস্যা, টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টের সমস্যা বা মুখের পেশিতে ব্যথার প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ফেস যোগা করা ঠিক নয়।ডাবল চিন কমানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের সামগ্রিক চর্বি কমাতে সাহায্য করে। অনেক সময় ওজন কমলে ডাবল চিনের উপস্থিতিও কম চোখে পড়ে। একইভাবে ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জলপান, সানস্ক্রিন ব্যবহার, সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত স্কিনকেয়ার।চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বর্তমানে ডাবল চিন বা ত্বকের বয়সজনিত পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে। তবে সেগুলির প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।সব মিলিয়ে বলা যায়, ফেস যোগা একটি উপকারী স্ব-যত্নের অভ্যাস হতে পারে। এটি মুখের পেশিকে সক্রিয় রাখতে, রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মুখকে আরও সতেজ দেখাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ডাবল চিন পুরোপুরি দূর করা বা নিষ্প্রাণ ত্বককে রাতারাতি কাচের মতো উজ্জ্বল করে তোলার ক্ষমতা এর নেই। বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর ভরসা করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, ফেস যোগাকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত। সুন্দর ত্বক এবং সুগঠিত মুখের জন্য কোনও একক ব্যায়াম বা কৌশল নয়, বরং নিয়মিত যত্ন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

Archive

Most Popular