স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শিশুরা বড় হতে হতে নানা অভ্যাস গড়ে তোলে। কেউ আঙুল চোষে, কেউ চুল পাকায়, কেউ আবার অজান্তেই দাঁত দিয়ে নখ কাটতে শুরু করে। এই অভ্যাসটির চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম Onychophagia যা শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বেশ সাধারণ। অনেক অভিভাবক এটিকে “খারাপ অভ্যাস” বলে তিরস্কার করেন, কিন্তু বিষয়টি কেবল শাসনের নয়; এর পেছনে থাকে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও শারীরিক নানা কারণ। তাই বকাঝকা নয়, বোঝাপড়া ও সঠিক পদক্ষেপই পারে শিশুকে এই অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করতে।
কেন শিশুরা দাঁত দিয়ে নখ কাটে?
১.পরীক্ষার চাপ, স্কুলে নতুন পরিবেশ, বন্ধুদের সঙ্গে অমিল, বাড়িতে অশান্তি এসব কারণে শিশুর মনে অজান্তেই উদ্বেগ তৈরি হয়। নখ কামড়ানো অনেক সময় একধরনের “self-soothing” আচরণ অর্থাৎ নিজেকে শান্ত করার উপায়।
২.টিভি দেখার সময়, পড়তে বসে, বা গল্প শুনতে শুনতে অনেক শিশু অচেতনভাবে নখ কাটে। এটি অনেকটা “অভ্যাসগত প্রতিক্রিয়া” যেখানে তারা বুঝতেই পারে না যে কী করছে।
৩.শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে। যদি বাড়ির কারও নখ কামড়ানোর অভ্যাস থাকে, শিশুও সেটি রপ্ত করতে পারে।
৪.কিছু শিশু নখের সামান্য খসখসে অংশ বা ময়লা দেখলেই অস্বস্তি বোধ করে এবং তা দাঁত দিয়ে সরাতে চায়।
এই অভ্যাসের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি:
১.নখের নিচে অসংখ্য জীবাণু জমে থাকে। দাঁত দিয়ে নখ কাটলে সেই জীবাণু সরাসরি মুখে যায়। এতে পেটের সমস্যা, সর্দি-কাশি বা অন্যান্য সংক্রমণ হতে পারে।
২.নিয়মিত নখ কামড়ালে দাঁতের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যেতে পারে, এমনকি দাঁত বেঁকে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
৩.নখের চারপাশের ত্বক ছিঁড়ে গেলে সেখানে ব্যথা, ফোলা বা পুঁজ হতে পারে। কখনও কখনও Paronychia নামের সংক্রমণও দেখা যায়।
৪.বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা নিজেদের চেহারা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সচেতন হয়। নখ কামড়ানোর কারণে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে।
কখন চিন্তার করা প্রয়োজন?
যদি নখ কামড়ানো এতটাই বেড়ে যায় যে রক্ত বের হয়।
যদি শিশুর আঙুলে বারবার সংক্রমণ হয় অথবা যদি এর সঙ্গে অতিরিক্ত উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। এক্ষেত্রে শিশু-মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কী করবেন? অভিভাবকের করণীয়
১.প্রথমেই মনে রাখুন শিশু ইচ্ছা করে আপনাকে বিরক্ত করতে নখ কাটছে না। তাই “এই নোংরা অভ্যাস ছাড়ো!” বলে ধমকালে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। বরং শান্তভাবে বলুন, “তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি নখ কাটছ?”
২.কখন সে বেশি নখ কাটে পড়ার সময়? টিভি দেখার সময়? না কি উদ্বিগ্ন হলে? পরিস্থিতি বুঝে বিকল্প ব্যবস্থা নিন।
৩.বিকল্প অভ্যাস তৈরি করুন। হাতে ছোট স্ট্রেস বল দিন। আঁকার খাতা বা পাজল দিন। নখ কাটার প্রয়োজন হলে নিয়মিত নখ কেটে পরিষ্কার রাখুন।
৪.একটি “reward chart” বানাতে পারেন। এক সপ্তাহ নখ না কাটলে ছোট পুরস্কার দিন যেমন প্রিয় গল্প শোনানো বা একসঙ্গে খেলাধুলা।
৫.নখ পরিষ্কার ও ছোট রাখুন। নখ বড় হলে কামড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। নিয়মিত কেটে পরিষ্কার রাখলে অভ্যাস কমতে পারে।
৬.বাজারে বিশেষ তেঁতো স্বাদের নেইল কোটিং পাওয়া যায়, যা শিশু নখ মুখে দিলেই বিরক্তিকর স্বাদ পায়। তবে ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৭.বাড়িতে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন। শিশুর সঙ্গে সময় কাটান, গল্প করুন। প্রয়োজনে যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন শেখাতে পারেন।
শিশুর সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন?
শিশুকে আলাদা করে ডেকে বলুন “তুমি কি জানো, নখে অনেক জীবাণু থাকে? আমরা যদি একসঙ্গে চেষ্টা করি, তুমি নিশ্চয়ই এই অভ্যাসটা কমাতে পারবে।” এই ধরনের কথোপকথন শিশুকে লজ্জিত না করে সচেতন করে তোলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, নখ কামড়ানো অনেক সময় Obsessive-Compulsive আচরণের হালকা রূপ হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে তা রোগ নয়। শিশুর সামগ্রিক আচরণ, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক সবকিছু বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষকেরাও যদি সচেতন থাকেন, তবে ক্লাসে শিশুকে আলতোভাবে মনে করিয়ে দিতে পারেন। তবে প্রকাশ্যে অপমান নয় ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করা উচিত। অনেক মা-বাবা জানান, সন্তানকে বেশি বকাঝকা করলে অভ্যাস বেড়ে যায়। কিন্তু ধৈর্য ধরে পাশে থাকলে ধীরে ধীরে তা কমে। কেউ কেউ দেখেছেন, খেলাধুলায় মন দিলে বা নতুন শখ তৈরি হলে নখ কামড়ানো নিজে থেকেই কমে যায়।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন?
যদি অভ্যাসটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং অন্য মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা যায়, তবে শিশু-মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে আচরণগত থেরাপি (Behavior Therapy) কার্যকর হতে পারে। প্রতিরোধে ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন ৫-১০ মিনিট “quality time” দিন।নিয়মিত রুটিন মেনে চলুন।
পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। প্রতিদিনের তালিকায় পুষ্টিকর খাদ্য রাখুন। শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা। শিশুর প্রতিটি অভ্যাসই তার বেড়ে ওঠার অংশ। কিছু অভ্যাস সাময়িক, কিছু সংশোধনযোগ্য। নখ কামড়ানোও তেমনই একটি আচরণ যা সময়, সহানুভূতি ও সচেতনতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
দাঁত দিয়ে নখ কাটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়। কিন্তু এর পেছনে থাকতে পারে শিশুর অদৃশ্য উদ্বেগ বা অস্থিরতা। তাই শাসনের চেয়ে ভালোবাসা, বকাঝকার চেয়ে বোঝাপড়া, আর চাপের চেয়ে সমর্থন এই তিনটিই হোক আপনার প্রধান হাতিয়ার। শিশুর হাত ধরে ধৈর্য নিয়ে এগোলে, সে নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে এই অভ্যাস ছেড়ে দিতে পারবে। মনে রাখবেন প্রতিটি শিশুই আলাদা, তার বেড়ে ওঠার পথও আলাদা। আপনার সহানুভূতিই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।