26th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ভারী মেকআপের যুগ শেষ? সৌন্দর্যদুনিয়ায় এখন ‘গ্লাস স্কিন’-এর জয়জয়কার!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


একসময় নিখুঁত সৌন্দর্যের মানদণ্ড বলতে বোঝানো হত ঘন ফাউন্ডেশন, কনট্যুরিং, ভারী আই মেকআপ এবং স্তরে স্তরে প্রসাধনীর ব্যবহার। বিশেষ অনুষ্ঠান হোক বা সামাজিক মাধ্যমের ছবি, অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটিহীন ও সম্পূর্ণ মেকআপনির্ভর লুকই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু গত কয়েক বছরে সৌন্দর্যদুনিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারী মেকআপের বদলে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাভাবিক, উজ্জ্বল এবং স্বাস্থ্যবান ত্বক। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘গ্লাস স্কিন’।

‘গ্লাস স্কিন’ শব্দটির উৎপত্তি দক্ষিণ কোরিয়ার সৌন্দর্যচর্চার জগৎ থেকে। এর মূল ধারণা হল এমন ত্বক, যা এতটাই মসৃণ, স্বচ্ছ এবং আর্দ্র থাকবে যে তা কাচের মতো আলো প্রতিফলিত করবে। এখানে লক্ষ্য শুধুমাত্র মেকআপের সাহায্যে ত্বক ঢেকে দেওয়া নয়; বরং ত্বককে এমনভাবে পরিচর্যা করা যাতে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে।সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের ফলে এই ধারণা দ্রুত বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সৌন্দর্যপ্রেমীরা বুঝতে শুরু করেন যে দীর্ঘস্থায়ী এবং স্বাস্থ্যকর সৌন্দর্যের ভিত্তি আসলে সুস্থ ত্বক। ফলে শুধুমাত্র মেকআপের উপর নির্ভর না করে স্কিনকেয়ারের প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে বহু প্রসাধনী সংস্থা তাদের পণ্যের প্রচারে ‘গ্লো’, ‘হাইড্রেশন’ এবং ‘স্কিন-ফার্স্ট বিউটি’-র মতো ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লাস স্কিন আসলে কোনও নির্দিষ্ট পণ্য বা একদিনের রূপচর্চার ফল নয়। এটি মূলত নিয়মিত ত্বক পরিচর্যার ফলাফল। ত্বকের পর্যাপ্ত আর্দ্রতা, সঠিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই ত্বক উজ্জ্বল এবং মসৃণ দেখায়।এই প্রবণতার অন্যতম কারণ হল সৌন্দর্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আগে যেখানে ত্বকের সমস্ত দাগ, ছোপ বা অসমতা ঢেকে ফেলার উপর জোর দেওয়া হত, এখন অনেকেই ত্বকের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ করতে শিখছেন। ফ্রেকলস, হালকা দাগ বা ত্বকের প্রাকৃতিক টেক্সচারকে লুকিয়ে ফেলার পরিবর্তে তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে ভারী মেকআপের পরিবর্তে হালকা এবং ত্বককেন্দ্রিক সৌন্দর্যচর্চা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির সময় এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে। দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকার ফলে অনেকেই মেকআপের পরিবর্তে স্কিনকেয়ারে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করেন। সেই সময় থেকেই হাইড্রেটিং সিরাম, ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। মানুষ বুঝতে পারেন, সুস্থ ত্বকই সুন্দর ত্বকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।তবে গ্লাস স্কিনের জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, ততই কিছু ভুল ধারণাও তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই এমন ছবি বা ভিডিও দেখা যায়, যেখানে ত্বককে সম্পূর্ণ নিখুঁত এবং দাগহীন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এমন ত্বক অধিকাংশ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই আলো, ফিল্টার এবং ডিজিটাল সম্পাদনার সাহায্যে এই ধরনের চিত্র তৈরি করা হয়। ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, গ্লাস স্কিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ত্বক, অবাস্তব নিখুঁততা নয়।চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের ধরন, বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। তাই এক ব্যক্তির জন্য কার্যকর কোনও স্কিনকেয়ার রুটিন অন্য কারও ক্ষেত্রে একই ফল নাও দিতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল কোনও পণ্য বা উপাদান ব্যবহার করার আগে নিজের ত্বকের প্রয়োজন বোঝা জরুরি।গ্লাস স্কিনের মূল ভিত্তি হল ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা। এই কারণেই হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, গ্লিসারিন, সিরামাইড এবং বিভিন্ন ময়েশ্চারাইজিং উপাদান বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাশাপাশি সানস্ক্রিন ব্যবহারকেও অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। কারণ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের অকাল বার্ধক্য, দাগ এবং শুষ্কতার অন্যতম কারণ।খাদ্যাভ্যাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত জলপান, ফল, শাকসবজি এবং পুষ্টিকর খাদ্য ত্বকের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও ত্বকের জৌলুস বজায় রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ গ্লাস স্কিন কোনও প্রসাধনীর জাদু নয়; এটি একটি সামগ্রিক জীবনযাপনের প্রতিফলন।তবে এর অর্থ এই নয় যে মেকআপের জনপ্রিয়তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং সৌন্দর্যদুনিয়ায় এখন ‘স্কিন-লাইক মেকআপ’ বা ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়ছে। হালকা ফাউন্ডেশন, টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার, ক্রিম ব্লাশ এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বাড়ানোর পণ্যগুলি এখন বেশি জনপ্রিয়। লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি লুক তৈরি করা, যা সতেজ এবং স্বাভাবিক দেখায়।সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন আসলে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অংশ। মানুষ এখন শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বাভাবিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে স্কিনকেয়ার এবং ওয়েলনেসের মধ্যে সম্পর্কও আরও দৃঢ় হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারী মেকআপের যুগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে—এমন বলা ঠিক হবে না। তবে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যে বদলাচ্ছে, তা স্পষ্ট। বর্তমানে ত্বককে ঢেকে দেওয়ার বদলে তার যত্ন নেওয়ার উপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। আর সেই কারণেই গ্লাস স্কিন শুধুমাত্র একটি বিউটি ট্রেন্ড নয়; এটি স্বাস্থ্যকর, পরিচর্যাপ্রাপ্ত এবং আত্মবিশ্বাসী ত্বকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

অতএব, সৌন্দর্যদুনিয়ায় গ্লাস স্কিনের জয়জয়কার আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—নিখুঁত দেখানোর চেয়ে সুস্থ থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যিকারের উজ্জ্বলতা প্রসাধনীর স্তরের আড়ালে নয়, বরং সুস্থ ও যত্নে রাখা ত্বকের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।

Archive

Most Popular