স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
ওজন কমানোর কথা উঠলেই প্রথম যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তা হলো ক্যালোরি। অনেকেই মনে করেন, যত কম খাবেন, তত দ্রুত ওজন কমবে। তাই ভাত, রুটি, তেল, এমনকি অনেক সময় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শুধু ক্যালোরি গুনলেই হবে না, শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত প্রোটিন না খেলে ওজন কমলেও শরীর সুস্থ নাও থাকতে পারে।প্রোটিন শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এটি পেশি, ত্বক, হাড়, হরমোন এবং বিভিন্ন এনজাইম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরের ক্ষয় হওয়া কোষ মেরামত করা থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা—সব ক্ষেত্রেই প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। তাই ওজন কমানোর সময়ও শরীরের এই চাহিদা পূরণ হওয়া জরুরি।বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যালোরির ঘাটতি তৈরি করেই ওজন কমাতে হয়। অর্থাৎ শরীর যত ক্যালোরি খরচ করে, তার চেয়ে কিছুটা কম ক্যালোরি গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে ওজন কমে। তবে যদি সেই খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকে, তাহলে শরীর শুধু চর্বি নয়, পেশিও ভাঙতে শুরু করতে পারে। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিপাকক্রিয়ার হারও কমে যেতে পারে।প্রোটিনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে। কার্বোহাইড্রেটজাত খাবারের তুলনায় প্রোটিন ধীরে হজম হয়। ফলে বারবার ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কমে এবং অপ্রয়োজনীয় স্ন্যাকস বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। যারা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।খাবার হজম করতেও শরীরকে শক্তি ব্যয় করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় থার্মিক এফেক্ট অব ফুড। প্রোটিন হজম করতে কার্বোহাইড্রেট বা চর্বির তুলনায় শরীরকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। যদিও শুধু এই কারণে উল্লেখযোগ্য ওজন কমে যায় না, তবে এটি শরীরের মোট শক্তি ব্যয়ের একটি অংশ বাড়াতে সাহায্য করে।ওজন কমানোর সময় নিয়মিত ব্যায়াম করলে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের পরে পেশির পুনর্গঠন এবং মেরামতের জন্য শরীরের প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে ব্যায়ামের সুফলও অনেকটাই কমে যেতে পারে।অনেকের ধারণা, প্রোটিন মানেই শুধু মাংস বা ডিম। বাস্তবে প্রোটিনের উৎস অনেক। মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, দুধ, টক দই, ছানা, ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, টোফু, মুগ ডাল কিংবা বিভিন্ন বাদাম থেকেও ভালো পরিমাণে প্রোটিন পাওয়া যায়। নিরামিষভোজীরাও সঠিক পরিকল্পনা করলে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে পারেন।তবে প্রোটিন বেশি খেলেই যে দ্রুত ওজন কমবে, এমন ধারণাও ভুল। অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরিও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, শাকসবজি, ফল এবং প্রোটিন—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। একক কোনও পুষ্টি উপাদানের উপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যকর ওজন কমানো সম্ভব নয়।প্রোটিনের প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়ামের মাত্রা এবং শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে কতটা প্রোটিন দরকার তা পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক প্রোটিনের একটি নির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে, তবে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা ওজন কমানোর পরিকল্পনায় আছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো।ওজন কমাতে গিয়ে অনেকেই সকাল বা দুপুরের খাবার বাদ দেন। এতে শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায় না এবং পরে একসঙ্গে বেশি খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এর বদলে প্রতিটি প্রধান খাবারে কিছুটা প্রোটিন রাখলে রক্তে শর্করার ওঠানামা কম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি বজায় থাকে। উদাহরণ হিসেবে সকালের নাস্তায় ডিম বা টক দই, দুপুরে ডাল ও মাছ, বিকেলে ছোলা বা বাদাম এবং রাতে ডাল, ছানা বা মুরগির মাংস রাখা যেতে পারে।পুষ্টিবিদদের মতে, স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানোর লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমানো, পেশি নয়। আর সেই কারণেই শুধু ক্যালোরি কমানোর দিকে নজর না দিয়ে খাদ্যের গুণগত মানের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, পর্যাপ্ত জল পান এবং সুষম খাদ্যের সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকলে ওজন কমানোর পথ অনেকটাই সহজ ও টেকসই হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, ওজন কমানোর সমীকরণে ক্যালোরি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ কথা নয়। শরীরকে সুস্থ রেখে, পেশি রক্ষা করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রোটিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় না খেয়ে থাকার পরিবর্তে, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে সুস্থভাবে ওজন কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।