19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

খাবারের পরিমাণ না কমিয়ে ফিট থাকুন!

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


ফিটনেস নিয়ে আজকের মানুষ অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু অধিকাংশেরই ভুল ধারণা, ফিট থাকতে হলে প্রথমেই খাবারের পরিমাণ কমাতে হবে। অর্থাৎ কম খাওয়া মানেই ওজন কমানো। অথচ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। শরীর সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি হল সুষম খাদ্যাভ্যাস, সঠিক সময়ে খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা। খাবার কমিয়ে দিলে শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়, হজমের সমস্যা হয় এবং মনও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। তাই আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে খাবারের পরিমাণ না কমিয়েও ফিট থাকা সম্ভব।


সবার আগে জানতে হবে সুষম আহার কী। আমাদের শরীরের প্রয়োজন প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার। এই উপাদানগুলির সঠিক ভারসাম্যই শরীরকে সক্রিয় রাখে। কেউ যদি শুধু কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাট একেবারে বাদ দিয়ে দেয়, তাহলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের খাদ্যতালিকা এমনভাবে সাজানো উচিত যাতে সমস্ত উপাদানই নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। সকালে দুধ বা দইয়ের সঙ্গে ওটস বা মুড়ি, দুপুরে ভাত-ডাল-সবজি-প্রোটিন, বিকেলে বাদাম বা ছোলা, আর রাতে হালকা রুটি-সবজি ও প্রোটিন — এই রুটিন অনুসরণ করলে শরীর পায় প্রয়োজনীয় শক্তি, আবার অতিরিক্ত ক্যালোরিও জমে না।


খাবারের পরিমাণ নয়, গুণগত মানের উপর নজর দেওয়াই আসল বিষয়। অনেক সময় দেখা যায় আমরা প্রচুর খাবার খাই, কিন্তু সেই খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে না। যেমন, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত রান্না বা ময়দা জাতীয় পদ—এগুলো শরীরের ক্ষতি করে। তাই খাবারের মান বাড়াতে হবে। ভাজাভুজির বদলে গ্রিল বা স্টিম করা খাবার, কোমল পানীয়ের বদলে ফলের রস বা লেবুর জল, সাদা চালের বদলে ব্রাউন রাইস—এই ছোট ছোট পরিবর্তনেই শরীরে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।


ফিট থাকতে গেলে শুধু কী খাব তা নয়, কখন খাব সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অনিয়মিতভাবে খান—কখনও সকালের নাস্তা বাদ দেন, কখনও দেরি করে রাতের খাবার খান। এতে শরীরের মেটাবলিজমের ছন্দ নষ্ট হয়। সঠিক সময়ে খাওয়া শরীরের হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং চর্বি জমা রোধ করে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আধা ঘণ্টার মধ্যে হালকা কিছু খাওয়া, দুপুরে ১টা থেকে ২টার মধ্যে পূর্ণ আহার, বিকেলে হালকা নাশতা, আর রাতে ৮টার আগেই ডিনার—এই নিয়ম মেনে চললে শরীর নিজের ছন্দে কাজ করে।


এর পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা হল ফিট থাকার আরেকটি মূল উপাদান। শুধু খাবার ঠিক রাখলেই চলবে না, সেটি শরীরে সঠিকভাবে ব্যবহারও করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন। সকালে একটু যোগ বা প্রণায়াম করুন। এতে রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে, পেশি সক্রিয় হয়, এবং মনও প্রশান্ত থাকে। সপ্তাহে দুই দিন সাঁতার, সাইক্লিং বা নাচও শরীর ও মনকে সতেজ রাখে।


ফিটনেস মানে কিন্তু ক্ষুধা দমন নয়। বরং ‘স্মার্ট স্ন্যাকিং’ অভ্যাস গড়ে তুলুন। চিপস, কুকিজ বা কোমল পানীয়র বদলে বেছে নিন ফল, দই, বাদাম, বা ভাজা ছোলা। এগুলো ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু বাড়তি ক্যালোরি দেয় না।


পর্যাপ্ত জলপানও ফিট থাকার অন্যতম চাবিকাঠি। শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেওয়া, হজমশক্তি বৃদ্ধি, ত্বকের উজ্জ্বলতা—সবই নির্ভর করে জলপানের উপর। প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার জল পান করা উচিত। সকালে খালি পেটে হালকা গরম জলে লেবু মিশিয়ে খেলে মেটাবলিজম বাড়ে এবং শরীরের চর্বি গলাতে সাহায্য করে।


তবে শুধু শরীর নয়, মনও ফিট থাকা দরকার। মানসিক চাপ শরীরের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। স্ট্রেস থাকলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে চর্বি জমে এবং হজমশক্তি কমে যায়। তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় রাখুন ধ্যান, হাঁটা বা প্রিয় শখের কাজে। রাতের ভালো ঘুমও ফিটনেসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত থেকে আট ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম শরীরের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।


বাইরের খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। রেস্তরাঁর খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম, চিনি ও প্রিজারভেটিভ থাকে। বাড়ির রান্নায় তেল-মশলা নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সরষের তেল বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন, ভাজাভুজির বদলে বেক বা স্টিম করা পদ বেছে নিন, আর দিনে অন্তত একবেলা শাকসবজি রাখুন।


ফিটনেসের জন্য বড় পরিবর্তনের দরকার নেই। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পার্থক্য আনতে পারে। যেমন—লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার, অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাঁটা, রাতে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট না খাওয়া এবং প্রতিদিন অন্তত একটি ফল খাওয়া।


ফিট থাকা মানে শুধু শরীর নয়, এটি এক জীবনযাপন পদ্ধতি। এটি এমন একটি মানসিকতা, যেখানে খাদ্য, শরীর ও মন—তিনটিই সমন্বয়ে থাকে। যখন বুঝবেন যে “খাবার কমানো নয়, সচেতনভাবে খাওয়া”-ই ফিট থাকার মূল মন্ত্র, তখনই নিজের ভিতরে এক ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করবেন।


অতএব, খাবার কমিয়ে নয়, বরং সঠিকভাবে খেয়ে ফিট থাকা সম্ভব। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি দিন, নিয়ম মেনে খান, পর্যাপ্ত জল পান করুন, নিয়মিত শরীরচর্চা করুন এবং মনকে প্রশান্ত রাখুন। ফিটনেস কোনো অস্থায়ী ট্রেন্ড নয়, এটি এক দীর্ঘমেয়াদি প্রতিজ্ঞা—নিজেকে ভালোবাসার, নিজের শরীরকে শ্রদ্ধা করার। খাবার ভালোবাসুন, শরীরের যত্ন নিন, আর জীবনকে উপভোগ করুন পূর্ণ উদ্যমে।

Archive

Most Popular