প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
স্মার্টফোন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি কাজেই ফোনের ব্যবহার রয়েছে। তাই অনেকেই রাতে ঘুমানোর আগে ফোন চার্জে বসিয়ে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন, যাতে সকালে উঠে সম্পূর্ণ চার্জ পাওয়া যায়। এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি অভ্যাস হলেও, নিরাপত্তার দিক থেকে এর কিছু ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে চার্জার, ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ সংযোগে ত্রুটি থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে।বর্তমান সময়ের অধিকাংশ স্মার্টফোনে এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা ব্যাটারি ১০০ শতাংশ চার্জ হয়ে গেলে চার্জিংয়ের গতি কমিয়ে দেয় বা প্রয়োজন অনুযায়ী চার্জ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সারারাত চার্জে থাকলেই ব্যাটারি বিস্ফোরিত হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনও সতর্কতার প্রয়োজন নেই। নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে চার্জারের মান, ফোনের অবস্থা এবং চার্জ দেওয়ার পরিবেশের উপর।সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি হলো অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হওয়া। চার্জিংয়ের সময় ফোন ও চার্জার কিছুটা গরম হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ফোন যদি বালিশের নিচে, কম্বল বা গদির উপর রেখে চার্জ দেওয়া হয়, তাহলে সেই তাপ সহজে বেরোতে পারে না। এতে ফোনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ব্যাটারির ক্ষতি করার পাশাপাশি বিরল ক্ষেত্রে আগুন লাগার ঝুঁকিও বাড়ায়।তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফোন চার্জে দেওয়ার সময় সেটি সবসময় শক্ত ও সমতল জায়গায় রাখুন। কাঠের টেবিল বা খোলা জায়গা এ ক্ষেত্রে নিরাপদ। কখনওই বালিশের নিচে, বিছানায় বা সোফার উপর ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন না। এতে শুধু ফোন নয়, আশপাশের দাহ্য বস্তু থেকেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।চার্জারের মানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই কম দামে অচেনা ব্র্যান্ডের চার্জার বা কেবল ব্যবহার করেন। নিম্নমানের চার্জার অতিরিক্ত গরম হতে পারে বা শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ফোন প্রস্তুতকারী সংস্থার দেওয়া আসল চার্জার বা নিরাপত্তা মানসম্পন্ন সার্টিফায়েড চার্জার ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।চার্জিং কেবল বা অ্যাডাপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটিও বিপজ্জনক হতে পারে। তার ছিঁড়ে যাওয়া, প্লাগ ঢিলে হয়ে যাওয়া বা চার্জারের গায়ে ফাটল থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। এমন চার্জার ব্যবহার করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই কোনও ত্রুটি চোখে পড়লে দ্রুত সেটি বদলে ফেলাই ভালো।অনেকের অভ্যাস ফোন চার্জে রেখেই ভিডিও দেখা, গেম খেলা বা দীর্ঘক্ষণ কথা বলা। এতে ফোনের প্রসেসর ও ব্যাটারি একই সময়ে বেশি কাজ করে, ফলে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। মাঝে মাঝে জরুরি প্রয়োজনে এমনটা হলেও, নিয়মিত এই অভ্যাস এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।রাতে চার্জ দেওয়ার আরেকটি সমস্যা হলো ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য। আধুনিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে বারবার সম্পূর্ণ শূন্য থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করার প্রয়োজন নেই। অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মতে, সাধারণ ব্যবহারে ব্যাটারির চার্জ ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখার অভ্যাস ব্যাটারির আয়ু বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। যদিও অধিকাংশ আধুনিক ফোনে ব্যাটারি সুরক্ষার জন্য স্মার্ট চার্জিং প্রযুক্তিও যুক্ত থাকে।যদি চার্জ দেওয়ার সময় ফোন বা চার্জার অস্বাভাবিক গরম হয়ে যায়, পোড়া গন্ধ আসে বা চার্জিংয়ের সময় বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে চার্জার খুলে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে ফোন পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।বজ্রপাতের সময় বা বিদ্যুতের ওঠানামা বেশি হলে চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। ভালো মানের সার্জ প্রোটেক্টর ব্যবহার করলে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে একাধিক উচ্চক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্র একসঙ্গে একটি নিম্নমানের মাল্টিপ্লাগে ব্যবহার না করাই ভালো।অভিভাবকদেরও শিশুদের ফোন চার্জিংয়ের নিরাপদ অভ্যাস শেখানো উচিত। চার্জারে লাগানো ফোন নিয়ে ঘুমানো, ভেজা হাতে চার্জার স্পর্শ করা বা চার্জিংয়ের সময় তার টানাটানি করা নিরাপদ নয়। ছোট থেকেই এই সচেতনতা ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
রাতে ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া সবসময় বিপজ্জনক নয়, যদি সঠিক নিয়ম মেনে চার্জ দেওয়া হয় এবং ভালো মানের চার্জার ব্যবহার করা হয়। তবে ফোনকে বালিশের নিচে বা বিছানায় রেখে চার্জ দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত চার্জার ব্যবহার করা বা অতিরিক্ত তাপ তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চললেই ফোনের ব্যাটারিও ভালো থাকবে, আর আপনার বাড়ির নিরাপত্তাও অনেকটাই নিশ্চিত হবে।