5th Sep 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সম্পর্কে বারবার ভুল বোঝাবুঝি? ‘অ্যাকটিভ লিসনিং’ কীভাবে বদলে দিতে পারে সমীকরণ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


প্রতিটি সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস, সম্মান এবং যোগাযোগ। কিন্তু অনেক সময় সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হয় কোনও বড় ঘটনার জন্য নয়, বরং একে অপরের কথা ঠিকমতো না শোনা বা না বোঝার কারণে। পরিবারের সদস্য, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা জীবনসঙ্গী—যে সম্পর্কই হোক, ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে থাকলে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। মনোবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ‘অ্যাকটিভ লিসনিং’ বা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস সম্পর্ককে আরও সুস্থ ও দৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করতে পারে।অ্যাকটিভ লিসনিং বলতে শুধু অন্যের কথা চুপচাপ শোনা বোঝায় না। এর অর্থ হলো, বক্তার কথার প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া, তাঁর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো, যাতে তিনি অনুভব করেন যে তাঁর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, বোঝার উদ্দেশ্যে শোনাই এই অভ্যাসের মূল ভিত্তি।বর্তমান সময়ে ব্যস্ত জীবন, মোবাইল ফোন, সামাজিক মাধ্যম এবং একাধিক কাজ একসঙ্গে করার প্রবণতা আমাদের মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছে। অনেক সময় কেউ কথা বলার সময় আমরা মোবাইল দেখি, অন্য কিছু ভাবি বা মাঝপথেই নিজের মতামত জানাতে শুরু করি। এতে অপর ব্যক্তি মনে করতে পারেন, তাঁর কথা গুরুত্ব পাচ্ছে না। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে সম্পর্কে অসন্তোষ বাড়তে পারে।অ্যাকটিভ লিসনিংয়ের প্রথম ধাপ হলো, কথা বলার সময় পুরো মনোযোগ অন্য ব্যক্তির দিকে রাখা। সম্ভব হলে মোবাইল বা অন্য বিভ্রান্তিকর জিনিস দূরে রাখুন। চোখে চোখ রেখে কথা শুনুন এবং মাঝেমধ্যে মাথা নেড়ে বা ছোট প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বোঝান যে আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। এতে বক্তা আরও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যের কথা শেষ হওয়ার আগে বাধা না দেওয়া। অনেক সময় আমরা পুরো কথা না শুনেই পরামর্শ দিতে শুরু করি বা নিজের অভিজ্ঞতা বলতে থাকি। কিন্তু সব সময় মানুষ সমাধান চান না; অনেক সময় তাঁরা শুধু চান কেউ তাঁদের কথা ধৈর্য নিয়ে শুনুক। তাই কথা শেষ হওয়ার সুযোগ দেওয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।অন্যের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়াও অ্যাকটিভ লিসনিংয়ের অংশ। যেমন, কেউ যদি বলেন তিনি কোনও বিষয়ে কষ্ট পেয়েছেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতিকে অস্বীকার না করে বলতে পারেন, “আমি বুঝতে পারছি বিষয়টি তোমার জন্য কঠিন ছিল।” এর অর্থ এই নয় যে আপনি সব বিষয়ে একমত, বরং আপনি তাঁর অনুভূতিকে সম্মান করছেন।কথা শোনার পরে নিজের ভাষায় বিষয়টি সংক্ষেপে পুনরাবৃত্তি করলে ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে। যেমন, “তুমি বলতে চাইছ যে…”—এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আপনি সঠিকভাবে বিষয়টি বুঝেছেন। এতে যোগাযোগ আরও পরিষ্কার হয়।অ্যাকটিভ লিসনিং শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই নয়, কর্মক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মী বা দলের সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে ভুল কম হয়, পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়ে এবং দলগত কাজ আরও কার্যকর হয়। একইভাবে বাবা-মা যদি সন্তানের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনেন, তাহলে শিশুরাও নিজেদের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে শেখে।তবে অ্যাকটিভ লিসনিং মানে নিজের মতামত বা অনুভূতি চেপে রাখা নয়। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর শান্তভাবে নিজের অনুভূতিও প্রকাশ করা জরুরি। সুস্থ সম্পর্কের জন্য দুই পক্ষেরই কথা বলার এবং শোনার সমান সুযোগ থাকা উচিত।যদি কোনও সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ঝগড়া, অবিশ্বাস, মানসিক নির্যাতন বা যোগাযোগের সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে শুধু অ্যাকটিভ লিসনিং যথেষ্ট নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মনোবিদ বা সম্পর্ক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে। কারণ সব সম্পর্কের সমস্যার সমাধান একইভাবে হয় না।

একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ নিজেকে নিরাপদ এবং সম্মানিত মনে করেন। আর সেই অনুভূতি তৈরির অন্যতম সহজ উপায় হলো মন দিয়ে অন্যের কথা শোনা। অ্যাকটিভ লিসনিং কোনও জটিল কৌশল নয়; এটি একটি সচেতন অভ্যাস। প্রতিদিনের ছোট ছোট কথোপকথনে যদি আমরা আরও ধৈর্যশীল, মনোযোগী এবং সহানুভূতিশীল হতে পারি, তাহলে অনেক ভুল বোঝাবুঝিই সহজে দূর করা সম্ভব। সম্পর্ককে আরও গভীর, আন্তরিক এবং দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে এই ছোট্ট অভ্যাসই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

Archive

Most Popular