6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

নারীর শরীর, নারীর যত্ন.. ৫০-এর পর কী কী মেনে চলবেন?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


পঞ্চাশ পেরোনো মানেই জীবনের গতি থেমে যাওয়া নয়। বরং এই সময়টা হতে পারে নিজের শরীর, মন এবং জীবনযাপনের দিকে একটু বেশি মন দেওয়ার সময়। এতদিন সংসার, সন্তান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার সবকিছুর দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের শরীরের ছোটখাটো সংকেতকে অনেক নারীই গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পঞ্চাশের পর শরীরের কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হয়, বিশেষ করে মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার সময়কে ঘিরে। হরমোনের ওঠানামার সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, গরম লাগা বা হট ফ্ল্যাশ, মেজাজের পরিবর্তন, ওজন বাড়া, ত্বক ও চুলের পরিবর্তন, যোনিপথে শুষ্কতা কিংবা যৌনস্বাস্থ্যের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এগুলিকে বয়সের অবধারিত কষ্ট বলে চুপ করে সহ্য না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

পঞ্চাশের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শরীরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। এই বয়সে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য না খেয়ে থাকা বা হঠাৎ কঠোর ডায়েট শুরু করা ঠিক নয়। বরং প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ডাল, বিভিন্ন ধরনের সম্পূর্ণ শস্য, ফল, বাদাম-বীজ, মাছ, ডিম বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখা দরকার। অতিরিক্ত মিষ্টি, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত ভাজাভুজি, অতিরিক্ত নুন এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব কমানো ভালো। খাবারের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম কমে গেলে আগের মতোই বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে ওজন সহজেই বাড়তে পারে। তবে প্রত্যেকের প্রয়োজন আলাদা, তাই কোনও নির্দিষ্ট ‘৫০-এর পরের ডায়েট’ অনুসরণ করার আগে নিজের ওজন, শারীরিক সমস্যা ও ওষুধের কথা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

এই বয়সে হাড়ের যত্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার ফলে কিছু নারীর হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমতে পারে এবং অস্টিয়োপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই খাবারে ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর পর্যাপ্ত উৎস রাখা জরুরি। দুধ, দই, কিছু ধরনের মাছ, ক্যালশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার, শাকসবজি ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। শুধু ক্যালশিয়াম খেলেই হবে না; নিয়মিত শরীরচর্চা, বিশেষ করে হাঁটা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ওজন বহনকারী ও পেশি শক্ত করার ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের অস্টিয়োপোরোসিসের জন্য হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করার সুপারিশ রয়েছে। ৬৫ বছরের কম বয়সী মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রেও যদি ঝুঁকি বেশি থাকে, চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

শুধু হাড় নয়, পঞ্চাশের পর হৃদ্‌যন্ত্রের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং ওজন এই কয়েকটি বিষয় নিয়মিত নজরে রাখা উচিত। মেনোপজের সময় শরীরের গঠন ও বিপাকীয় পরিবর্তনের কারণে অনেকের ওজন, বিশেষ করে পেটের মেদ, বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কিংবা যোগব্যায়াম অভ্যাসে আনা যেতে পারে। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকার অভ্যাসও কমানো ভালো। তবে আগে থেকে হৃদ্‌রোগ, হাঁটুর সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও অসুস্থতা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

নারীর স্বাস্থ্য মানেই শুধু স্ত্রীরোগ নয়। পঞ্চাশের পর স্তনস্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন। স্তনে নতুন কোনও গাঁট, আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, নিপল থেকে অস্বাভাবিক স্রাব কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোনও পরিবর্তন চোখে পড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য-নির্দেশিকায় স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের বয়স ও ব্যবধান নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, মার্কিন USPSTF গড় ঝুঁকির নারীদের ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি দুই বছর অন্তর ম্যামোগ্রাফির সুপারিশ করে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী আপনার ক্ষেত্রে অন্য সময়সূচি প্রয়োজন হতে পারে।

জরায়ুমুখের স্বাস্থ্যও অবহেলা করা চলবে না। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন কতদিন থাকবে তা নির্ভর করে বয়স, আগের পরীক্ষার ফল, HPV-এর ইতিহাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শের উপর। অনেক নারী মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর মনে করেন আর কোনও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ধারণাটি ঠিক নয়। অস্বাভাবিক রক্তপাত, মেনোপজের পর রক্তপাত, অস্বাভাবিক স্রাব, তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা যৌনমিলনে নতুন করে ব্যথা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মেনোপজের পর যেকোনও রক্তপাতকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নেওয়া উচিত নয়।

এই বয়সে ডায়াবেটিসের দিকেও নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে ওজন বেশি হলে বা পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। একইভাবে থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তাল্পতা, কিডনি বা লিভারের সমস্যা আছে কি না, তা ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় একসঙ্গে অনেক ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, আয়রন বা ‘মেনোপজ সাপ্লিমেন্ট’ খাওয়া ঠিক নয়। কোনও সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হলে পরীক্ষার ফল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়াই ভালো।

পঞ্চাশের পর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও শরীরের যত্নেরই অংশ। সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে ব্যস্ত, কর্মজীবনে পরিবর্তন, অবসর, দাম্পত্যে নতুন সমীকরণ কিংবা প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া, এই সময় জীবনে অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। তার সঙ্গে মেনোপজের হরমোনগত পরিবর্তন যোগ হয়ে মন খারাপ, উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যা বাড়তে পারে। সবসময় নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা না করে প্রয়োজনে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা দরকার। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, কোনও কাজে আগ্রহ না থাকা, ঘুম বা খাওয়ার বড় পরিবর্তন, অতিরিক্ত উদ্বেগ কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া—এসবকে বয়সের স্বাভাবিক অংশ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।ঘুমের ক্ষেত্রেও একটু শৃঙ্খলা প্রয়োজন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে শোয়া ও ওঠা, সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি কমানো, শোওয়ার আগে মোবাইল বা অন্য পর্দার ব্যবহার কমানো এবং দিনের বেলায় শরীরচর্চা ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। মেনোপজের কারণে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে বা দীর্ঘদিন অনিদ্রা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কারণ অনিদ্রা শুধু পরদিনের ক্লান্তিই বাড়ায় না, দীর্ঘমেয়াদে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানও কমিয়ে দিতে পারে।

ত্বক ও চুলের পরিবর্তন নিয়েও এই বয়সে অনেকের উদ্বেগ থাকে। ত্বক আগের তুলনায় শুষ্ক হতে পারে, সূক্ষ্ম রেখা বাড়তে পারে, চুল পাতলা বা শুষ্ক লাগতে পারে। এর সমাধান হিসেবে একসঙ্গে অনেক প্রসাধনী ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। মৃদু ক্লিনজার, প্রয়োজন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার এবং নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারই ত্বকের যত্নের ভালো ভিত্তি। চুলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। হঠাৎ খুব বেশি চুল পড়া শুরু হলে শুধু তেল বা ঘরোয়া প্যাকের উপর নির্ভর না করে কারণ খুঁজে দেখা উচিত।

যৌনস্বাস্থ্য নিয়েও এই বয়সে খোলামেলা হওয়া দরকার। মেনোপজের পরে যোনিপথের শুষ্কতা বা অস্বস্তির কারণে যৌনসম্পর্কে ব্যথা হতে পারে। অনেক নারী লজ্জায় বিষয়টি কাউকে জানান না। অথচ এর জন্য চিকিৎসা ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার নানা উপায় রয়েছে। নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোনও হরমোন-ভিত্তিক চিকিৎসা নিজে থেকে শুরু করা একেবারেই উচিত নয়।

পঞ্চাশের পর নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করা তাই অত্যন্ত জরুরি। তবে ‘প্রতি বছর সব পরীক্ষা’ করতেই হবে—এমন কোনও একক নিয়ম নেই। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, পূর্বের অসুখ, ওষুধ, ধূমপানের অভ্যাস, ওজন এবং অন্যান্য ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষার প্রয়োজন আলাদা হয়। স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং, জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, চোখ ও দাঁতের পরীক্ষা এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী অস্টিয়োপোরোসিস স্ক্রিনিং—কোনটি কখন দরকার, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য-পরিকল্পনা তৈরি করা সবচেয়ে ভালো।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, পঞ্চাশ কোনও ‘শেষ অধ্যায়’ নয়; বরং নিজের জন্য নতুন করে সময় বের করার বয়স। শরীরের ওজন একটু বাড়লেই নিজেকে দোষ দেওয়া নয়, মেনোপজের উপসর্গ হলেই ভয় পাওয়া নয়, আবার কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে বয়সের অজুহাতে উপেক্ষাও নয়। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত নড়াচড়া, পর্যাপ্ত ঘুম, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা, মানসিক স্বস্তি এবং নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, এই কয়েকটি অভ্যাস পঞ্চাশের পরের জীবনকে অনেক বেশি সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ করে তুলতে পারে। বয়স বাড়বে, কিন্তু যত্নের অভাবে শরীর যেন অকারণে বুড়িয়ে না যায় এইটুকু দায়িত্ব নিজের প্রতি প্রত্যেক নারীরই।

Archive

Most Popular