6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

শেষ মুহূর্তে পার্লার নয়! ঘরেই কীভাবে ত্বককে করে তুলবেন উজ্জ্বল ও সতেজ?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


পুজোর দিন যত এগিয়ে আসে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটাকে যেন একটু অন্যরকম করে দেখতে ইচ্ছে করে। নতুন শাড়ি, গয়না, চুলের সাজ, সবকিছুর আগে তাই ত্বকটা থাকুক পরিষ্কার, সতেজ ও প্রাণবন্ত, এমনটাই চাওয়া। আর এই চাওয়াতেই পুজোর ঠিক কয়েক দিন আগে অনেকেই ছুটে যান পার্লারে। ফেসিয়াল, স্ক্রাব, পিল, ডি-ট্যানিং একসঙ্গে নানা কিছু করিয়ে ত্বককে রাতারাতি উজ্জ্বল করে তোলার চেষ্টা চলে। কিন্তু ত্বকের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে। নতুন কোনও প্রসাধনী বা আক্রমণাত্মক ট্রিটমেন্টে অ্যালার্জি, লালচে ভাব, জ্বালা বা ব্রণ দেখা দিলে পুজোর আনন্দটাই মাটি। তাই পুজোর আগে ত্বকের যত্নের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ‘কম, কিন্তু নিয়মিত’। দামি প্রসাধনীর স্তর সাজিয়ে দেওয়ার চেয়ে ত্বক পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনমতো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার এবং প্রতিদিন সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ডার্মাটোলজি-র বিশেষজ্ঞরাও ত্বকের দৈনন্দিন পরিচর্যায় ক্লেনজিং, ময়েশ্চারাইজিং এবং সান প্রোটেকশনকে ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেন।

পুজোর আগে ‘গ্লো’ মানে কী?

ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা আসলে কেবল ফর্সা দেখানোর নাম নয়। স্বাস্থ্যকর ত্বক সাধারণত মসৃণ, পর্যাপ্ত আর্দ্র, পরিষ্কার এবং অতিরিক্ত রুক্ষতা বা প্রদাহমুক্ত থাকে। ত্বকের উপর মৃত কোষ, অতিরিক্ত তেল, ধুলো-ময়লা ও দূষণের আস্তরণ জমলে মুখ নিস্তেজ দেখাতে পারে। আবার অতিরিক্ত স্ক্রাবিং বা একসঙ্গে অনেক ধরনের সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করলেও ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাবর্ম বা স্কিন ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ‘গ্লো’ আনার জন্য ত্বককে জোর করে পালিশ করার দরকার নেই; বরং তার স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখাই বেশি জরুরি।

প্রথম ধাপ—ত্বক পরিষ্কার:

সকাল ও রাতে মৃদু ক্লেনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা যেতে পারে। যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ, তাঁদের জন্য নন-কমেডোজেনিক বা পোর বন্ধ না করে এমন প্রসাধনী বেছে নেওয়া ভালো। শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকে অতিরিক্ত ফেনাযুক্ত, অ্যালকোহলসমৃদ্ধ বা সুগন্ধিযুক্ত ক্লেনজার ব্যবহার না করাই নিরাপদ। মুখ পরিষ্কার করার সময় খুব গরম জল নয়, হালকা কুসুম গরম জল ব্যবহার করা ভালো। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে পরিষ্কার করে নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে জল মুছে নিতে হবে। ত্বক ঘষে পরিষ্কার করার অভ্যাস বরং জ্বালা বাড়াতে পারে। পুজোর ঠিক আগের সপ্তাহে নতুন কোনও ফেসওয়াশ, সিরাম বা ক্লেনজার প্রথমবার ব্যবহার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ কোনও উপাদানে ত্বকের প্রতিক্রিয়া হবে কি না, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না। যে প্রসাধনী এতদিন ব্যবহার করে ত্বক ভালো থেকেছে, শেষ মুহূর্তে সেটিই চালিয়ে যাওয়া নিরাপদ।

দ্বিতীয় ধাপ—ময়েশ্চারাইজার:

ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে মুখে ক্লান্তি ও নিস্তেজ ভাব বেশি চোখে পড়ে। তাই ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক তৈলাক্ত হলেও ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া উচিত নয়। হালকা জেল বা লোশন ধরনের ময়েশ্চারাইজার অনেকের ক্ষেত্রে আরামদায়ক হতে পারে, আর শুষ্ক ত্বকে তুলনামূলক ঘন ক্রিম বেশি উপযোগী হতে পারে। ময়েশ্চারাইজার ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বককে তুলনামূলক মসৃণ ও সতেজ দেখাতে পারে। একটি সহজ কৌশল হল মুখ ধোয়ার পর ত্বক পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ময়েশ্চারাইজার লাগানো। এতে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য হয়। বিশেষত যাঁদের ত্বক শুষ্ক, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস বেশ কার্যকর হতে পারে।

তৃতীয় ধাপ—সানস্ক্রিন:

‘পুজোর আগে তো কয়েক দিনই!’ এইযুক্তিতে সানস্ক্রিন বন্ধ করে দেওয়ার কোনও কারণ নেই। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বলিরেখা, অসম ত্বকবর্ণ ও বয়সের ছাপ বাড়াতে পারে। তাই বাইরে বেরোনোর দিনগুলিতে ব্রড-স্পেকট্রাম, এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে নিয়মিত পুনরায় প্রয়োগ করাও জরুরি। পুজোর সময় তো বাইরে বেরোনো আরও বাড়বে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, অষ্টমীর অঞ্জলি, দুপুরের খাওয়াদাওয়া, রাতের ঠাকুর দেখা সব ক্ষেত্রেই সূর্যের সংস্পর্শ হতে পারে। তাই মেকআপের নিচেও সানস্ক্রিনের জায়গা রয়েছে। টিন্টেড সানস্ক্রিন অনেকের কাছে মেকআপের আগে ব্যবহার করার সুবিধাজনক বিকল্প হতে পারে।

ঘরোয়া প্যাক কি সত্যিই কাজে দেয়?

পুজোর আগে ঘরোয়া ফেসপ্যাকের কথা উঠবেই। দই, মধু, বেসন, ওটস, অ্যালোভেরা রান্নাঘরের উপকরণ দিয়েই অনেক ধরনের ফেসপ্যাকের চল রয়েছে। কিন্তু ‘প্রাকৃতিক’ মানেই যে সবার ত্বকের জন্য নিরাপদ, এমনটা নয়। অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে এমন উপাদান মুখে লাগানোর আগে সাবধান থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে লেবুর রস, বেকিং সোডা, টুথপেস্টের মতো তীব্র বা ত্বকের জন্য অনুপযুক্ত উপাদান ব্যবহার করে রাতারাতি দাগ বা ট্যান তোলার চেষ্টা একেবারেই উচিত নয়। যাঁদের ত্বক কোনও নির্দিষ্ট ঘরোয়া উপাদান আগে থেকেই সহ্য করে, তাঁরা পুজোর বেশ কিছুদিন আগে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। কিন্তু মুখে নতুন কিছু প্রথমবার লাগানোর সেরা সময় পুজোর আগের রাত নয়। ত্বকের সমস্যা থাকলে ঘরোয়া পরীক্ষার বদলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

স্ক্রাব করবেন? অবশ্যই ভেবে।

মুখের মৃত কোষ দূর করতে স্ক্রাব ব্যবহার করার অভ্যাস রয়েছে অনেকের। কিন্তু পুজোর আগে প্রতিদিন স্ক্রাব করে ত্বককে ‘আরও পরিষ্কার’ করার চেষ্টা করবেন না। বিশেষ করে ব্রণ, সংবেদনশীলতা, লালচে ভাব বা শুষ্কতার সমস্যা থাকলে বেশি ঘষাঘষি ত্বকে জ্বালা বাড়াতে পারে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ডার্মাটোলজি-ও সতর্ক করেছে যে অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন ত্বকের প্রতিরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 অতএব, পুজোর একেবারে আগে নতুন স্ক্রাব বা শক্তিশালী এক্সফোলিয়েন্ট নিয়ে পরীক্ষা না করাই ভালো। ইতিমধ্যেই যে রুটিনে ত্বক অভ্যস্ত, সেটিই বজায় রাখুন।

ঘরেই সাত দিনের সহজ রুটিন:

পুজোর আগে যদি হাতে এক সপ্তাহ থাকে, তাহলে প্রথম দিন থেকেই ত্বকের উপর চাপ না দিয়ে একটি সহজ রুটিন শুরু করা যায়। সকালে মুখ পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত জল পান, বাইরে গেলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার এবং অযথা রোদে না থাকা। রাতে মেকআপ সম্পূর্ণ তুলে মুখ পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার। এই রুটিনটিই নিয়মিত পালন করলে ত্বক অনেক বেশি স্বস্তিতে থাকবে। সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী খুব মৃদু এক্সফোলিয়েশন করা যেতে পারে, যদি সেই ধরনের পণ্য আপনার ত্বক আগে থেকেই সহ্য করে। নতুন কোনও শক্তিশালী অ্যাসিড, রেটিনয়েড বা একাধিক অ্যাকটিভ একসঙ্গে শুরু করার সময় অবশ্যই পুজোর ঠিক আগের সপ্তাহ নয়। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এমন উপাদান ব্যবহার না করাই ভালো।

ঘুমের ঘাটতি মুখেও ধরা পড়ে: 

পুজোর আগে কেনাকাটা, কাজ, বাড়ি গোছানো, সামাজিক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে ঘুমের সময় কমে যায়। অথচ ত্বকের স্বাভাবিক সতেজতার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ। সারারাত জেগে থেকে পরদিন দশ মিনিটের ফেসপ্যাক দিয়ে সেই ক্লান্তি পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই পুজোর আগের কয়েক দিন অন্তত ঘুমের সময়টুকু যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখুন। খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। শুধু ত্বকের ‘গ্লো’-এর জন্য কোনও ম্যাজিক খাবারের প্রয়োজন নেই। নিয়মিত সুষম খাবার, শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং প্রয়োজনমতো জল শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার পাশাপাশি ত্বকের জন্যও সহায়ক। অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাভুজি বা অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবারকে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস বানিয়ে ফেলা উচিত নয়।

মেকআপের আগে কয়েকটি জরুরি কথা:

পুজোর দিন মেকআপ করবেন? তাহলে ত্বকের উপর ভারী স্তর চাপানোর আগে ভালোভাবে ময়েশ্চারাইজ করুন। সানস্ক্রিনের পর মেকআপের প্রয়োজনীয় ধাপগুলি অনুসরণ করা যায়। তবে নতুন ফাউন্ডেশন, প্রাইমার বা কনসিলার প্রথমবার পুজোর দিন ব্যবহার না করাই ভালো। আগে থেকেই পরীক্ষা করে দেখুন সেটি ত্বকে মানাচ্ছে কি না। মেকআপ যতই সুন্দর হোক, রাতে সেটি তুলে ঘুমোনো জরুরি। দীর্ঘ সময় মেকআপ রেখে দিলে ত্বকে অস্বস্তি, পোর বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ব্রণপ্রবণতা বাড়তে পারে। মেকআপ তুলতে গিয়ে জোরে ঘষাঘষি না করে মৃদুভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

পার্লারে যাবেন না?

তা নয়। পার্লারের সৌন্দর্যচর্চা একেবারে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু পুজোর ঠিক আগের মুহূর্তে এমন কোনও ট্রিটমেন্ট নেওয়া উচিত নয় যার ফলে ত্বকে উল্লেখযোগ্য জ্বালা, খোসা ওঠা বা লালচে ভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কেমিক্যাল পিল, ওয়াক্সিং, ডিপ এক্সফোলিয়েশন বা কোনও নতুন প্রসিডিওর নেওয়ার আগে ত্বকের ধরন ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। কারও যদি দীর্ঘদিনের ব্রণ, পিগমেন্টেশন, রোসেশিয়া, একজিমা বা অন্য কোনও ত্বকের সমস্যা থাকে, তাহলে পুজোর আগে হঠাৎ পার্লার ট্রিটমেন্ট না নিয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত। ত্বকের চিকিৎসা আর সাময়িক সৌন্দর্যচর্চা এক জিনিস নয়।

আর যদি হাতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা?

তাহলে আরও সাবধান। কোনও নতুন প্রসাধনী নয়, কোনও পরীক্ষামূলক ফেসপ্যাক নয়, কোনও শক্তিশালী স্ক্রাব নয়। সকালে মৃদু ক্লেনজার, ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন; রাতে মুখ পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার এইটুকুই যথেষ্ট। ত্বককে বিশ্রাম দিন। পর্যাপ্ত ঘুমান, সুষম খাবার খান এবং জল পান করুন। যদি হঠাৎ ব্রণ বা লালচে ভাব দেখা দেয়, সেটিকে চেপে ফাটিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন না। তাতে প্রদাহ ও দাগ আরও বাড়তে পারে। কোনও তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, ফোলা, জ্বালা বা অস্বাভাবিক র‍্যাশ হলে সৌন্দর্যচর্চা বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত!

পুজোর আগে ত্বককে সুন্দর দেখানোর সবচেয়ে সহজ পথ কোনও ম্যাজিক ফেসপ্যাক নয়। বরং কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার এবং প্রতিদিনের সূর্যসুরক্ষা। ত্বকের যত্নে দামি পণ্যের সংখ্যার চেয়ে সঠিক পণ্য এবং নিয়মিত ব্যবহার বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই dermatologists-দের ত্বক পরিচর্যার মৌলিক পরামর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই পুজোর আগের রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দশটি নতুন প্রসাধনী বের করার বদলে কয়েক দিন আগে থেকেই ত্বককে সময় দিন। কারণ পুজোর সাজের সবচেয়ে সুন্দর অলংকার কোনও হাইলাইটার নয়—সুস্থ, স্বস্তিতে থাকা ত্বকের স্বাভাবিক সতেজতা।

Archive

Most Popular