প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা এমন এক এলাকা, যেখানে রাস্তার দু’পাশের পুরনো বাড়িগুলির দিকে তাকালেই মনে হয়, সময় এখানে একটু ধীর পায়ে হাঁটে। আধুনিক কলকাতার ব্যস্ততা, যানজট, দোকানপাট আর মানুষের ভিড়ের মাঝেও কোথাও কোথাও এখনও দেখা যায় বিশাল প্রবেশদ্বার, উঁচু স্তম্ভ, খিলান, পুরনো ঠাকুরদালান আর ক্ষয়ে যাওয়া দেওয়ালের গায়ে আটকে থাকা কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। এই পাথুরিয়াঘাটারই ৪৭ নম্বর বাড়ি, খেলাৎচন্দ্র ঘোষের প্রাসাদ। আর শরৎ এলেই এই বাড়ির অন্দরমহল ও ঠাকুরদালান জেগে ওঠে বহু পুরনো দুর্গাপুজোর আবহে। এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার বয়সে নয়, তার নিজস্ব আচার, প্রতিমার রীতি এবং সবচেয়ে বেশি, এক বিরল মিষ্টি প্রসাদে। সেই মিষ্টির নাম ‘মাতা চিনি’।
মাতা চিনি নামটি শুনলে প্রথমে হয়তো মনে হতে পারে এটি সাধারণ চিনির তৈরি কোনও মিষ্টি। কিন্তু পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি ঐতিহ্যবাহী। চিনি ও সুগন্ধি মশলার মিশ্রণে তৈরি সূক্ষ্ম চিনির স্ফটিকের মতো এই মিষ্টি দেবীর ভোগ ও প্রসাদের অংশ। বহু পুরনো মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে এর প্রস্তুতিপদ্ধতি বংশপরম্পরায় চলে এসেছে বলে জানা যায়। আজকের দিনে এমন মিষ্টি খুব সহজে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই মাতা চিনি শুধু একটি খাবার নয়, ঘোষবাড়ির পুজোর নিজস্ব খাদ্যঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অংশ।
মাতা চিনির সঙ্গে এই বাড়ির পুজোর আরও একটি বিশেষ মিষ্টি প্রসাদের সম্পর্ক রয়েছে—চন্দনা ক্ষীর। নাম থেকেই যার পরিচয়। দুধে তৈরি ক্ষীরের মধ্যে চন্দনের বাটা মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই সুগন্ধি নিবেদন। সাধারণ ক্ষীরের সঙ্গে এর পার্থক্য শুধু উপকরণে নয়, এর গন্ধ ও প্রস্তুতিপদ্ধতিতেও। পুজোর ভোগে এমন একটি সুগন্ধি পদ থাকা বনেদি বাড়ির রান্নার সেই পুরনো রুচির কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, দেবতার নিবেদন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যেরও অংশ।
পাথুরিয়াঘাটা ঘোষ পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাস অবশ্য মাতা চিনির থেকেও অনেক পুরনো। পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে রামলোচন ঘোষের নাম জড়িয়ে আছে। আঠারো শতকের শেষভাগে পাথুরিয়াঘাটায় ঘোষ পরিবারের বসতি ও দুর্গাপুজোর সূত্রপাতের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। পুরনো ৪৬ নম্বর বাড়িতে পরিবারের পুজো শুরু হয়েছিল বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে রামলোচন ঘোষের বংশধর খেলাৎচন্দ্র ঘোষ নতুন প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করেন এবং সেই বাড়িতেই পুজোকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ পরিসরে প্রতিষ্ঠা করেন।
খেলাৎচন্দ্র ঘোষ ছিলেন উনিশ শতকের কলকাতার অন্যতম পরিচিত অভিজাত নাগরিক। তাঁর তৈরি ৪৭ নম্বর পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের প্রাসাদটি শুধু বসতবাড়ি ছিল না, বরং তৎকালীন কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বাড়িটির নির্মাণকাল ১৮৪৪ থেকে ১৮৪৬ সালের মধ্যে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এই নতুন বাড়ির সঙ্গে দুর্গাপুজোর যে পরম্পরা যুক্ত হয়, সেটিই পরবর্তী সময়ে খেলাৎ ঘোষবাড়ির পুজো নামে পরিচিতি পায়।
তবে এই পুজোর বয়স নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। কোথাও পুজোটিকে ১৮৪৬ সালের সূচনা হিসেবে ধরা হয়েছে, কোথাও ১৮৫০-এর দশক বা ১৮৫৮ সাল থেকে খেলাৎ ভবনে এর ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে। আবার ঘোষ পরিবারের পুরনো পুজোর সূত্র আরও পিছিয়ে আঠারো শতকের শেষভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই এই পুজোর ইতিহাসকে একটি মাত্র সাল দিয়ে সীমাবদ্ধ করার চেয়ে বলা যায়, পাথুরিয়াঘাটা ঘোষ পরিবারের দুর্গাপুজোর শিকড় আঠারো শতকে এবং খেলাৎচন্দ্র ঘোষের প্রাসাদে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এই বাড়ির স্থাপত্যই যেন পুজোর আবহকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশাল প্রাসাদসদৃশ বাড়ির মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ মার্বেলের ঠাকুরদালান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে প্রায় ৮৫ ফুট দীর্ঘ এই দালানের উল্লেখ পাওয়া যায়। উঁচু স্তম্ভ, খিলান, পুরনো দেওয়াল, বিস্তৃত প্রাঙ্গণ এবং মার্বেলের ব্যবহার মিলিয়ে এই ঠাকুরদালান নিজেই কলকাতার স্থাপত্যঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পুজোর সময় এই পুরনো স্থাপত্যের মধ্যেই দেবী দুর্গার প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হলে মনে হয়, কয়েকশো বছরের পুরনো কলকাতা যেন হঠাৎ বর্তমানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়ির পুজোর প্রতিমাতেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেবী রুপোর অলঙ্কারে সজ্জিত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। প্রতিমার পিছনের চালচিত্রকে ‘মঠচৌড়ি’ বা তিনচালির রীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আরও একটি বিশেষত্ব হল দেবীর বাহন। এখানে সিংহের আকৃতিতে ঘোটকের ছাপ রয়েছে, যাকে প্রচলিতভাবে ‘ঘোটক সিংহ’ বলা হয়। এই ধরনের প্রতিমারীতি কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোগুলির মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।
পুজোর দিনগুলিতে দেবীর সামনে রুপোর বাসনপত্র ব্যবহারের রীতিও এই বাড়ির ঐতিহ্যের অংশ। বনেদি বাড়ির পুজোয় রুপোর বাসন কেবল ঐশ্বর্যের প্রকাশ নয়, বহু ক্ষেত্রে তা পারিবারিক উত্তরাধিকারের স্মারক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই ধরনের বাসন ব্যবহার করা হলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় অসংখ্য পুজোর স্মৃতি। একটি থালা, একটি বাটি কিংবা একটি পাত্রও তখন পরিবারের কাছে কেবল ধাতব সামগ্রী থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পূর্বপুরুষদের হাতের স্পর্শ ও পুরনো দিনের পুজোর স্মৃতি। পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির পুজোতেও এই ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায়।
দুর্গাপুজোর মূল আকর্ষণ অবশ্যই দেবীর আরাধনা, কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোকে বুঝতে গেলে রান্নাঘরের দিকটিও দেখতে হয়। কারণ এই বাড়িগুলিতে ভোগের পদগুলি অনেক সময় আলাদা করে পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির ক্ষেত্রে মাতা চিনি ও চন্দনা ক্ষীর সেই খাদ্যঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। মাতা চিনি যেখানে চিনির স্ফটিক ও সুগন্ধি মশলার মেলবন্ধনে তৈরি এক বিরল নিবেদন, সেখানে চন্দনা ক্ষীর দুধ ও চন্দনের সুগন্ধে তৈরি একটি অনন্য পদ। দু’টির স্বাদ ও প্রস্তুতি আলাদা হলেও তাদের মধ্যে মিল এক জায়গায়—দুটিই দেবীর ভোগের সঙ্গে যুক্ত এবং দুটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের পুরনো স্মৃতি।
মাতা চিনির বিশেষত্ব তার সরলতার মধ্যেই। আজকের দিনে মিষ্টি মানেই নানা রকম ছাঁচ, রং, সাজসজ্জা ও উপকরণের সমাহার। কিন্তু এই পুরনো মিষ্টিতে সেই বাহুল্য নেই। চিনি ও সুগন্ধি মশলার সমন্বয়ে তৈরি সূক্ষ্ম স্ফটিকের মতো দানা, তার সঙ্গে বহু পুরনো প্রস্তুতিপদ্ধতির স্মৃতি—এইটুকুই যেন তার পরিচয়। এর রেসিপি লিখিতভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি; পারিবারিক মৌখিক পরম্পরাই এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে বলে জানা যায়। আর এই কারণেই মাতা চিনির মধ্যে একটি হারিয়ে যেতে বসা কলকাতার স্বাদও খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলার বনেদি বাড়ির রান্নার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই মৌখিক উত্তরাধিকার। মায়ের কাছ থেকে মেয়ে, ঠাকুমার কাছ থেকে নাতনি, রাঁধুনির কাছ থেকে পরের প্রজন্ম—এইভাবেই কোনও কোনও পদ টিকে থাকত। কোথায় কতটা চিনি, কখন মশলা দিতে হবে, কীভাবে রান্নার আঁচ সামলাতে হবে, কোন পাত্রে তৈরি করতে হবে—সবটাই মুখে মুখে শেখানো হত। ফলে সেই রান্নার নির্দিষ্ট পরিমাপের পাশাপাশি তৈরি হত একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতিও। মাতা চিনির ক্ষেত্রেও এই মৌখিক ঐতিহ্য তাকে আরও মূল্যবান করে তুলেছে।
চন্দনা ক্ষীরের গল্পও একইভাবে পুজোর খাদ্যসংস্কৃতিকে অন্য মাত্রা দেয়। চন্দনের মতো সুগন্ধি উপাদান দিয়ে ক্ষীর তৈরি করার রীতি আজকের ব্যস্ত জীবনে খুব পরিচিত নয়। অথচ একসময় বনেদি পরিবারগুলির পুজোয় ভোগের পদ নির্বাচনেও বিশেষ যত্ন নেওয়া হত। দেবীর জন্য কী রান্না হবে, কোন পদ কোন দিনে নিবেদন করা হবে, কোন উপকরণের ব্যবহার হবে—এসবের মধ্যেও পরিবারের নিজস্ব রীতি তৈরি হত। পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির চন্দনা ক্ষীর সেই পুরনো ভোগসংস্কৃতির একটি বিরল স্মারক।
এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বিবরণে জানা যায়, ঘোষ পরিবারের এই প্রাসাদে একসময় বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এসেছেন। বাড়ির নাচঘর ছিল সাংস্কৃতিক আসরের অন্যতম কেন্দ্র। সংগীত ও শিল্পচর্চার পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও এই পরিবারের পরিচিতি ছিল। ফলে দুর্গাপুজো এখানে কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; তার সঙ্গে যুক্ত ছিল তৎকালীন কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন।
এই বাড়ির সঙ্গে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। তিনি খেলাৎ ঘোষ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ঘোষ পরিবারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। ভাগলপুরের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বও তাঁর উপর এসেছিল বলে পারিবারিক ইতিহাসের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফলে পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির ইতিহাসের মধ্যে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও একটি অপ্রত্যাশিত অধ্যায় এসে মিশেছে।
সময়ের সঙ্গে কলকাতা বদলেছে। একসময় যে পাথুরিয়াঘাটা ছিল অভিজাত পরিবারের প্রাসাদ ও বাগানবাড়ির অঞ্চল, আজ সেখানে শহরের ঘনবসতি। জমিদারি ব্যবস্থা নেই, নেই সেই পুরনো সামাজিক কাঠামোও। কিন্তু পুজো এখনও প্রতি শরতে বাড়িটিকে নতুন করে প্রাণ দেয়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ফিরে আসেন। পুরনো সম্পর্কগুলি আবার জেগে ওঠে। ঠাকুরদালানে দেবী প্রতিষ্ঠিত হন। আর বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি নিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করে।
এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, পুজোটি সময়কে অস্বীকার করে না; বরং সময়ের সঙ্গে চলেও নিজের মূল পরিচয় ধরে রেখেছে। বাইরে কলকাতার পুজো যত আধুনিক হয়েছে, এই বাড়ির পুজো তত বেশি নিজের পুরনো রীতিগুলিকে আঁকড়ে থেকেছে। এখানে নতুনত্বের প্রতিযোগিতা নেই। আছে একই প্রতিমারীতি, একই ঠাকুরদালান, পুরনো ভোগ, পারিবারিক আচার এবং মাতা চিনির মতো বিরল খাদ্যঐতিহ্য।
অষ্টমী বা নবমীর দিনে যখন বাড়ির ভোগের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন হয়তো বাইরে শহরের অন্য প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ মণ্ডপে ঘুরছেন। কিন্তু এই বাড়ির রান্নাঘরে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা। দেবীর জন্য রান্না হচ্ছে, পুরনো পাত্র বের করা হচ্ছে, পরিবারের প্রবীণরা নতুন প্রজন্মকে কিছু নিয়ম মনে করিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও হয়তো মাতা চিনির প্রস্তুতি নিয়ে কথা হচ্ছে, কোথাও চন্দনা ক্ষীরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, ঐতিহ্য কেবল ঠাকুরদালানে নয়, রান্নাঘরেও বেঁচে থাকে।
মাতা চিনি তাই এই পুজোর একটি ছোট্ট অংশ হয়েও আসলে অনেক বড় একটি গল্প বলে। একটি মিষ্টির মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় কীভাবে খাদ্য কোনও পরিবারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। একটি রেসিপি কীভাবে মুখে মুখে প্রজন্ম পেরোয়। আর কীভাবে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা কোনও স্বাদ একটি নির্দিষ্ট বাড়ির পুজোর কারণে এখনও টিকে থাকতে পারে।
পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির পুজো দেখতে গেলে তাই শুধু প্রতিমা দেখে চলে গেলে হবে না। বাড়ির স্থাপত্যের দিকে তাকাতে হবে, ঠাকুরদালানের দীর্ঘতা অনুভব করতে হবে, প্রতিমার ঘোটক সিংহের দিকে চোখ রাখতে হবে, রুপোর সাজ ও বাসনের ঐতিহ্য লক্ষ্য করতে হবে। আর সুযোগ থাকলে মাতা চিনি ও চন্দনা ক্ষীরের গল্পটিও জানতে হবে। কারণ এই পুজোর আসল সৌন্দর্য তার বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়, বরং এমন অসংখ্য ছোট ছোট ঐতিহ্যের মধ্যে।
পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়িতে পৌঁছনোর জন্য উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক বা মহাত্মা গান্ধী রোড মেট্রো স্টেশন ব্যবহার করা যায়। ৪৭, পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে অবস্থিত খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়ি এই দুই মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি এলাকায়। গিরিশ পার্ক থেকে স্থানীয় যানবাহনে পাথুরিয়াঘাটার দিকে যাওয়া যায়, আবার সময় ও রাস্তার পরিস্থিতি অনুযায়ী হাঁটতেও যাওয়া সম্ভব। বর্তমান পুজো-সংক্রান্ত তথ্যেও এই দুই মেট্রো স্টেশনকে যাতায়াতের সুবিধাজনক পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রেনে এলে হাওড়া বা শিয়ালদহ হয়ে কলকাতার উত্তর-মধ্য অংশে এসে মেট্রো বা সড়কপথে পাথুরিয়াঘাটায় পৌঁছনো যায়। কলকাতার পুরনো অঞ্চলের সরু রাস্তায় পুজোর সময়ে যানজট ও যান নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। তাই ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে একেবারে বাড়ির সামনে পৌঁছনোর বদলে কাছাকাছি জায়গায় নেমে কিছুটা হেঁটে যাওয়াই সুবিধাজনক হতে পারে। পুজোর দিন যাওয়ার আগে অবশ্যই ওই বছরের রাস্তা ও গণপরিবহণের পরিস্থিতি দেখে নেওয়া উচিত।
পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির পুজো আসলে কলকাতার বনেদি পুজোর সেই ধারার প্রতিনিধি, যেখানে উৎসব মানে শুধু দেবীর আরাধনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি বাড়ির স্থাপত্য, কলকাতার সামাজিক পরিবর্তন, শিল্প ও সংস্কৃতির স্মৃতি এবং অবশ্যই খাবারের এক নিজস্ব জগৎ। আর সেই জগতের সবচেয়ে মিষ্টি রহস্যগুলির একটি হল মাতা চিনি।
শরৎ আসে, ঢাক বাজে, দেবী আসেন। পুরনো ঠাকুরদালান আবার আলোয় ভরে ওঠে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা পুজোর আচার আবার ফিরে আসে। আর সেই সঙ্গে ফিরে আসে একটি বিরল মিষ্টির স্মৃতিও—চিনি ও সুগন্ধি মশলায় তৈরি মাতা চিনি, যার স্বাদে মিশে আছে পুরনো কলকাতার এক টুকরো ইতিহাস। সময়ের কাছে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। বাড়ি বদলায়, মানুষ বদলায়, শহর বদলায়। কিন্তু কিছু কিছু স্বাদ হারায় না। পাথুরিয়াঘাটা ঘোষবাড়ির মাতা চিনি তেমনই এক স্বাদ—যার মধ্যে মিশে আছে দেবীর ভোগ, পরিবারের পরম্পরা আর কয়েক প্রজন্মের কলকাতার স্মৃতি।
তথ্যসূত্র:
পাথুরিয়াঘাটা ঘোষ পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।