6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। রাজরাজেশ্বরী মায়ের পুজোয় চারশো বছরের ঐতিহ্য, রীতি আর রাজকীয় স্মৃতির মেলবন্ধন।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


নদিয়ার কৃষ্ণনগর মানেই মাটির পুতুল, সূক্ষ্ম কারুকাজ, রাজবাড়ির ইতিহাস আর এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আর শরৎ এলেই সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে চলে আসেন এক বিশেষ দেবী—রাজরাজেশ্বরী। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধুই একটি বনেদি বাড়ির পুজো নয়। এটি রাজপরিবারের কয়েক শতাব্দী পুরনো দেবী আরাধনা, কৃষ্ণনগরের সামাজিক ইতিহাস এবং বাংলার দুর্গোৎসবের বিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত পরম্পরা।

এই পুজোর ইতিহাস মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরও আগের। সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদিয়ার রাজপরিবারে রাজরাজেশ্বরীর আরাধনা চারশোরও বেশি বছর ধরে চলে আসছে। অর্থাৎ ১৭১০ সালে জন্ম নেওয়া মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের জন্মেরও আগে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। পরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে দুর্গোৎসব আরও বৃহত্তর সামাজিক পরিসর পায় এবং বাংলার দুর্গাপুজোকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ইতিহাসের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে যায়।তবে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দেবীকে শুধুই ‘দুর্গা’ বললে তাঁর স্বাতন্ত্র্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এখানে তিনি রাজরাজেশ্বরী মহামায়া। নামের মধ্যেই রয়েছে তাঁর রাজকীয় পরিচয়। প্রচলিত দশভুজা দুর্গার সঙ্গে তাঁর রূপের বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। দেবীর সামনের দুটি হাত অপেক্ষাকৃত বড়, পিছনের আটটি হাত ছোট। তাঁর শরীরে থাকে বর্ম—যেন তিনি শুধু মঙ্গলময়ী জননী নন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক মহাশক্তি।

রাজরাজেশ্বরীর প্রতিমার পিছনের চালচিত্রও এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্ধগোলাকার সাবেকি বাংলার চালির একদিকে থাকে দশাবতার, অন্যদিকে দশমহাবিদ্যার চিত্র। মাঝখানে অবস্থান করেন পঞ্চানন শিব। ফলে একটি মাত্র প্রতিমার পশ্চাৎপটেই যেন বৈষ্ণব, শাক্ত এবং শৈব ভাবধারার এক বিস্তৃত ধর্মীয় প্রতীকী জগৎ তৈরি হয়। দেবীর সাজও সাধারণ ডাকের সাজের মতো নয়; এই বিশেষ সাজ পরিচিত ‘বেদেনি ডাক’ নামে।

রাজরাজেশ্বরীর বাহন নিয়েও কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজোকে ঘিরে নানা বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। সাম্প্রতিক সংবাদপ্রতিবেদনে রাজরাজেশ্বরীর নিজস্ব প্রতিমার বাহনকে পৌরাণিক সিংহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে তুলনা করলে এখানে মূল পার্থক্যটি বাহনের চেয়ে দেবীর যুদ্ধসজ্জা, হাতের বিন্যাস, চালচিত্র এবং অলংকরণে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে এক দীর্ঘ পারিবারিক শিল্প-ঐতিহ্য। রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরীর মূর্তি দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ করতেন শিল্পী সাধন পাল। ১৯৬৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রতিমার রূপে কিছু পরিবর্তন আসে। তবু মূল কাঠামো ও রাজরাজেশ্বরীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার চেষ্টা আজও অব্যাহত।

রাজরাজেশ্বরীর পুজো শুরু হয় দুর্গাপুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই। মহালয়ার পর প্রতিপদের দিন শুরু হয় বিশেষ হোম। অতীতে এই হোমের আয়োজন ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। চন্দন কাঠ, বেলকাঠ, ঘি, মধু, জলসহ বিপুল পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করা হত। হোমের আগুন একবার জ্বালানোর পর তা নবমী পর্যন্ত জ্বলতে থাকত। এই দীর্ঘস্থায়ী হোম রাজপরিবারের পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার।

বোধনের সময় রাজরাজেশ্বরীকে রাজবাড়ির পঙ্খ অলঙ্কৃত দুর্গাদালানে নিয়ে আসা হয়। পুরনো রীতিতে বেহারাদের কাঁধে করে দেবীকে আনা হত। প্রতিমা নির্মাণের কাজও শুরু হয় নির্দিষ্ট পারিবারিক রীতি মেনে। উল্টোরথের পরের দিন পাটপুজোর মাধ্যমে প্রতিমা তৈরির সূচনা—অর্থাৎ রাজরাজেশ্বরীর পুজোর প্রস্তুতি কেবল দুর্গাপুজোর কয়েক সপ্তাহের অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও একাধিক পূর্বাচার।কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজোর আর একটি আকর্ষণ সন্ধিপুজো। একসময় সন্ধিপুজোর সময় কামান দাগার রীতিও ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সন্ধিপুজোর মূল আচার এখনও বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১০৮টি পদ্মফুল এবং ১০৮টি প্রদীপ দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। সন্ধ্যার সেই মুহূর্তে রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে ভক্ত ও দর্শনার্থীতে।

বলির ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। অতীতে রাজবাড়ির পুজোয় ছাগবলি দেওয়ার প্রথা ছিল। বর্তমানে সেই প্রাণীবলি বন্ধ। তার পরিবর্তে আখ ও চালকুমড়ো প্রতীকী বলির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শতাব্দীপ্রাচীন একটি পুজোর ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটি সময়ের সঙ্গে রীতির অভিযোজনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।আর যদি রাজরাজেশ্বরীর পুজোর কথা বলা হয়, তাহলে তাঁর ভোগের গল্প বাদ যায় কী করে! কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ভোগে প্রতিদিনের পদগুলির পাশাপাশি তিথি অনুযায়ী বিশেষ বৈচিত্র্য থাকে। মহালয়ার পর থেকেই ভোগের আয়োজন শুরু হয়। খিচুড়ি, ভাজা, ছ্যাঁচড়া, নানা তরকারি, চাটনি, সুজি ও পায়েস থাকে ভোগের তালিকায়।

সপ্তমীর ভোগে থাকে সাত রকম ভাজা। অষ্টমীতে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় আট। তার সঙ্গে থাকে পোলাও, ছানার ডালনা, ভাত, মিষ্টি ও ক্ষীরের মতো একাধিক পদ। নবমীর ভোগ আরও বিস্তৃত—নয় রকম ভাজার সঙ্গে থাকে তিন ধরনের মাছ, ভাত ও মিষ্টি। আর দশমীর ভোগে আসে অন্য এক আবহ—গলা ভাত, সিঙি মাছ, খই, ফল, দই ও চিড়ে। ভোগের এই তিথিভিত্তিক পরিবর্তন শুধু খাবারের বৈচিত্র্য নয়, রাজপরিবারের পুজোর নিজস্ব রন্ধন-পরম্পরারও পরিচয় বহন করে।

দশমীর ভোগের মধ্যেই যেন উৎসবের সুর বদলে যায়। এতদিনের ব্যস্ততা, ধূপ-ধুনো, ঢাকের শব্দ, প্রদীপ আর মানুষের ভিড়ের শেষে আসে বিদায়ের মুহূর্ত। রাজরাজেশ্বরীকে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে দেবীকে রাজবাড়ির পরিসরে বিশেষ আচার মেনে ঘোরানো হয়। তারপর ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজবাড়ির পুকুরের দিকে। পুকুরপাড়ে তখন ভিড় জমে কৃষ্ণনগরের মানুষের। শেষবারের মতো দেবীকে প্রণাম করে তাঁরা ফিরে যান।একসময় এই বিসর্জনের সঙ্গে আরও একটি বিশেষ রীতি জড়িত ছিল—নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো। বিজয়ার দিন নীলকণ্ঠ দর্শনকে শুভ বলে মনে করার একটি পুরনো বিশ্বাস বাংলার বিভিন্ন বনেদি পুজোয় দেখা যেত। কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতেও সেই রীতি ছিল। কিন্তু এখন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো বন্ধ হয়েছে। রাজপরিবারের বর্তমান গৃহকর্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুরনো রীতির অনেকটাই বজায় রাখার চেষ্টা করা হলেও এই প্রথা আর করা সম্ভব নয়।

এই পরিবর্তনগুলিই আসলে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজোর গল্পকে আরও মানবিক করে তোলে। চারশো বছরের বেশি সময় ধরে কোনও একটি রীতি একইভাবে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, পরিবেশ ও আইন বদলেছে। কিছু প্রথা বন্ধ হয়েছে, কিছু বদলেছে, আবার কিছু নতুনভাবে ফিরে এসেছে। কিন্তু দেবীর প্রতি পরিবারের টান এবং মানুষের অংশগ্রহণের জায়গাটি রয়ে গেছে।এরই একটি উদাহরণ সিঁদুরখেলা। রাজপরিবারের বর্তমান গৃহকর্ত্রী অমৃতা রায় ২০০২ সালে রাজবাড়িতে সিঁদুরখেলার সূচনা করেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দশমীর সকালে দেবীবরণের পর রাজবাড়িতে মহিলারা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন। রাজপরিবারের নিজস্ব আচার থেকে এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর মিলনক্ষেত্রের রূপ পেয়েছে।কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের নাম অবিচ্ছেদ্য হলেও, রাজরাজেশ্বরীর ইতিহাস তাঁর জীবনের চেয়েও পুরনো। এই বিষয়টিই পুজোটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও গভীর করে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে যে রাজবাড়ি বাংলার সাহিত্য, শিল্প, সংগীত ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, সেই পরিসরেই রাজরাজেশ্বরীর আরাধনা ক্রমে কৃষ্ণনগরের মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

কৃষ্ণনগর আজ রাজাদের শহর নয়। রাজতন্ত্র নেই, নেই সেই আগেকার ক্ষমতা ও জাঁকজমক। কিন্তু রাজবাড়ির দুর্গাদালানে শরৎ এলেই আবার ফিরে আসে অন্য এক সময়। পঙ্খের নীচে রাজরাজেশ্বরী আসীন হন, ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে পুরনো অন্দর, সন্ধিপুজোর ১০৮ প্রদীপ জ্বলে ওঠে, ঢাকের শব্দে মুখর হয় প্রাসাদপ্রাঙ্গণ। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন দেবীকে দেখতে।রাজরাজেশ্বরীর এই পুজো তাই শুধু একটি পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি কৃষ্ণনগরের সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। প্রতিমার প্রতিটি রেখা, বর্মের প্রতিটি অলংকার, ‘বেদেনি ডাক’-এর সাজ, চালচিত্রের দশাবতার ও দশমহাবিদ্যা, ১০৮ প্রদীপের সন্ধিপুজো কিংবা সাত-আট-নয় রকম ভাজার ভোগ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নিজস্ব পুজো-ভাষা।আর সেই ভাষার সবচেয়ে বড় কথা—ঐতিহ্য মানে স্থির হয়ে থাকা নয়। কিছু রীতি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়, কিছু রীতি নতুন অর্থ পায়, কিছু আচার নতুন করে পরিবারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগ তৈরি করে। তবু দেবী থেকে যান।

কৃষ্ণনগরের রাজরাজেশ্বরীও তাই থেকে গিয়েছেন। রাজাদের যুগ পেরিয়ে, প্রাসাদের সময় পেরিয়ে, কয়েক শতাব্দীর পরিবর্তন পেরিয়ে। শরতের আকাশে কাশফুল ফুটলেই আবার তাঁর আগমনের অপেক্ষা শুরু হয়। পুরনো রাজবাড়ির দরজা পেরিয়ে যখন ঢাকের শব্দ ভেসে আসে, তখন মনে হয়—ইতিহাস হয়তো অতীত নয়। কিছু ইতিহাস প্রতি বছর দেবীর সঙ্গে ফিরে আসে। কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে সেই ইতিহাসেরই নাম—রাজরাজেশ্বরী।

Archive

Most Popular