1st Nov 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ট্রিক অর ট্রিট! হ্যালোউইনের হরর-ফ্যাশন ও পার্টি স্পেশ্যাল!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



ভূতুড়ে সাজ, রহস্যময় মেকআপ, অদ্ভুত সব অ্যাকসেসরিজ আর থিম পার্টির জমজমাট! আয়োজন থেকে উৎসব হ্যালোউইনের ফ্যাশনে থাকুক চমক! অক্টোবরের শেষ প্রান্তে পৃথিবীর নানা প্রান্তে শুরু হয় এক অদ্ভুত উৎসবের প্রস্তুতি। কোথাও বাড়ির দরজায় ঝুলছে কঙ্কালের অবয়ব, কোথাও জানলার পাশে বসে রয়েছে মাকড়সার জাল জড়ানো কৃত্রিম ভূত, আবার কোথাও কমলা রঙের কুমড়োর ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে রহস্যময় আলো। রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়তে থাকে উৎসবের উত্তেজনা। শিশুদের মুখে শোনা যায় পরিচিত সেই ডাক—‘ট্রিক অর ট্রিট!’ আর বড়দের পোশাকে, সাজে, মেকআপে ফুটে ওঠে নানা ভৌতিক চরিত্র। ৩১ অক্টোবর পালিত এই উৎসবের নাম হ্যালোউইন। একসময় পাশ্চাত্যের নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সিনেমা, ফ্যাশন এবং পপ কালচারের হাত ধরে হ্যালোউইন পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কলকাতার মতো শহরেও ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে হ্যালোউইন থিম পার্টি, কস্টিউম ফ্যাশন এবং বিশেষ মেকআপের আয়োজন।

হ্যালোউইনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। এই উৎসবের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন কেল্টিকদের ‘সাওইন’ বা Samhain উৎসবে। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং আশপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী কেল্টিক জনগোষ্ঠী অক্টোবরের শেষ দিন থেকে নভেম্বরের শুরুতে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে এই উৎসব পালন করত। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই সময় জীবিত ও মৃতের জগতের মধ্যবর্তী সীমারেখা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে আসে। মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই আগুন জ্বালানো, বিশেষ পোশাক পরা এবং নানা প্রতীকী আচার পালনের প্রচলন তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যায় এই উৎসব। ‘অল হ্যালোজ ইভ’ থেকেই ধীরে ধীরে ‘হ্যালোউইন’ নামটির প্রচলন ঘটে। বর্তমানে ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এটি মূলত আনন্দ, সৃজনশীলতা, সাজসজ্জা এবং বিনোদনের একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব হয়ে উঠেছে।

হ্যালোউইনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক নিঃসন্দেহে এর পোশাক ও সাজ। সাধারণ উৎসবের ফ্যাশনের সঙ্গে হ্যালোউইনের পার্থক্য এখানেই যে, এই দিনে নিজেকে অন্য কোনও চরিত্রে রূপান্তরিত করার স্বাধীনতা রয়েছে। কখনও ভয়ংকর ভ্যাম্পায়ার, কখনও রহস্যময় ডাইনি, কখনও জম্বি, আবার কখনও জনপ্রিয় হরর সিনেমার কোনও চরিত্র। তবে বর্তমান ফ্যাশন দুনিয়ায় হ্যালোউইনের সাজ মানেই শুধু ভয়ংকর পোশাক নয়। গথিক গ্ল্যাম, ডার্ক রোম্যান্স, ভিনটেজ হরর, ফ্যান্টাসি এবং পপ কালচারের মেলবন্ধনে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্টাইল স্টেটমেন্ট।

এবারের হ্যালোউইন ফ্যাশনে নজর কাড়তে পারে গথিক গ্ল্যাম লুক। কালো রঙের লম্বা গাউন, লেসের হাতা, করসেট স্টাইলের ব্লাউজ, ভেলভেটের পোশাক এবং গাঢ় লাল লিপস্টিক—এই সাজে একদিকে যেমন রয়েছে রহস্য, অন্যদিকে রয়েছে রাজকীয় আভিজাত্য। পোশাকের সঙ্গে মানানসই কালো বুট, চোকার, বড় রিং এবং লম্বা কানের দুল সাজকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। যাঁরা খুব বেশি ভৌতিক সাজ পছন্দ করেন না, অথচ হ্যালোউইনের থিম বজায় রাখতে চান, তাঁদের জন্য এই স্টাইল হতে পারে আদর্শ। চোখে স্মোকি মেকআপ, গালে হালকা কনট্যুরিং এবং ঠোঁটে বারগান্ডি বা ডিপ ওয়াইন শেডের লিপস্টিক ব্যবহার করলেই তৈরি হয়ে যাবে একটি পরিশীলিত ডার্ক লুক।

অন্যদিকে চিরকালীন জনপ্রিয়তা রয়েছে ডাইনি বা উইচ লুকের। কালো পয়েন্টেড হ্যাট, লম্বা কালো পোশাক, নেটের ওড়না, গাঢ় চোখের সাজ এবং লম্বা নখ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক রহস্যময় উপস্থিতি। তবে আধুনিক ফ্যাশনে উইচ লুকেরও নানা রূপ দেখা যাচ্ছে। কেউ বেছে নিচ্ছেন কালো করসেট ও লম্বা স্কার্ট, কেউ আবার সবুজ ও কালোর মিশেলে তৈরি করছেন ফ্যান্টাসি উইচ লুক। চোখের পাতায় পার্পল, গ্রিন কিংবা ব্ল্যাক আইশ্যাডোর ব্যবহার এই সাজকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। সঙ্গে ছোট একটি ঝাড়ু কিংবা ক্রিস্টাল বলের মতো প্রপস থাকলে ছবির জন্যও তৈরি হবে সুন্দর থিম।

ভ্যাম্পায়ার লুকও হ্যালোউইনের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন ট্রেন্ড। ফ্যাকাশে মুখ, গাঢ় চোখ, রক্তিম ঠোঁট এবং কৃত্রিম ধারালো দাঁত—এই সাজের প্রধান উপাদান। মহিলাদের ক্ষেত্রে কালো বা গাঢ় লাল গাউন, লেসের কলার এবং ভেলভেটের পোশাক ব্যবহার করা যেতে পারে। পুরুষদের জন্য কালো স্যুট, লম্বা কোট, সাদা শার্ট এবং লাল অ্যাকসেন্ট তৈরি করতে পারে ক্লাসিক ভ্যাম্পায়ার লুক। মেকআপে চোখের চারপাশে গাঢ় ছায়া, ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম রক্তের ছাপ এবং মুখে হালকা ফ্যাকাশে বেস ব্যবহার করলে সাজটি আরও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে। তবে কৃত্রিম রক্ত কিংবা বিশেষ ইফেক্টের প্রসাধনী ব্যবহারের আগে ত্বকে অ্যালার্জি হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।

যাঁরা একটু বেশি নাটকীয় সাজ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য রয়েছে জম্বি লুক। ছেঁড়া পোশাক, কৃত্রিম ক্ষত, ফ্যাকাশে মুখ এবং এলোমেলো চুল এই সাজের মূল আকর্ষণ। পুরনো সাদা শার্ট কিংবা ডেনিমকে বিশেষভাবে কেটে ও রং করে তৈরি করা যায় জম্বি কস্টিউম। মেকআপের ক্ষেত্রে ধূসর, বাদামি ও লাল রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ক্ষতচিহ্নের মতো ইফেক্ট। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ এফেক্ট মেকআপের মাধ্যমে অনেকেই অসাধারণ জম্বি লুক তৈরি করছেন। তবে ত্বকে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্টভাবে তৈরি কসমেটিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করা উচিত। শিল্পকর্মের রং, আঠা বা রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি মুখে ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে।

হ্যালোউইন ফ্যাশনের আরেকটি আকর্ষণ হল ক্লাসিক সিনেমা ও সাহিত্যের চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত পোশাক। কাউন্ট ড্রাকুলা, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানব, মমি কিংবা রহস্যময় গোয়েন্দা চরিত্রের পাশাপাশি জনপ্রিয় হরর সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রও কস্টিউমের বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের চরিত্র অনুকরণ করে সাজের প্রবণতা যথেষ্ট জনপ্রিয়। তবে নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই কোনও চরিত্র বেছে নিলে সাজে স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। পোশাকের পাশাপাশি চরিত্রের হাঁটাচলা, অভিব্যক্তি এবং ছোটখাটো অ্যাকসেসরিজও পুরো লুককে জীবন্ত করে তুলতে পারে।

শিশুদের হ্যালোউইন সাজেও রয়েছে আলাদা আনন্দ। ছোটদের জন্য ভূত, কুমড়ো, বিড়াল, ব্যাটম্যান, সুপারহিরো কিংবা কার্টুন চরিত্রের পোশাক বেশ জনপ্রিয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে ভয়ংকর মেকআপের পরিবর্তে মজাদার ও রঙিন সাজ বেছে নেওয়াই ভালো। নরম কাপড়ের পোশাক, আরামদায়ক জুতো এবং সহজে খোলা যায় এমন কস্টিউম ব্যবহার করা উচিত। মুখে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার না করে হালকা ফেস পেইন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখের খুব কাছে কিংবা ঠোঁটের ভিতরে কোনও রং বা প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত নয়। পোশাকের দৈর্ঘ্য এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে হাঁটাচলায় অসুবিধা না হয়।

হ্যালোউইনের সাজে মেকআপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মেকআপের তুলনায় এখানে কল্পনা ও সৃজনশীলতার পরিসর অনেক বেশি। স্কাল মেকআপ, ক্র্যাকড ডল মেকআপ, ব্লাডি আই মেকআপ, ফ্যান্টাসি ফেস পেইন্ট কিংবা থ্রিডি স্পেশাল এফেক্ট—বিভিন্ন ধরনের মেকআপ এখন বিশেষ জনপ্রিয়। স্কাল মেকআপে মুখের নির্দিষ্ট অংশে কালো ও সাদা রঙের সাহায্যে কঙ্কালের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়। ক্র্যাকড ডল মেকআপে মুখের উপর ফাটলের মতো নকশা তৈরি করে পুতুলের রহস্যময় চেহারা ফুটিয়ে তোলা হয়। আবার ফ্যান্টাসি মেকআপে কাল্পনিক প্রাণী, ডানা, ফুল, মাকড়সার জাল কিংবা রহস্যময় নকশা ব্যবহার করা হয়।

চোখের সাজেও এবার থাকতে পারে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। স্মোকি আইজের পাশাপাশি কালো, বেগুনি, রক্তিম এবং ধূসর রঙের আইশ্যাডো ব্যবহার করা যেতে পারে। আইলাইনারের সাহায্যে তৈরি করা যায় মাকড়সার জালের নকশা কিংবা নাটকীয় উইংড আই। রঙিন কন্ট্যাক্ট লেন্সও অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে। তবে চোখের জন্য ব্যবহৃত কন্ট্যাক্ট লেন্স অবশ্যই চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সঠিক মাপ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। শুধুমাত্র সাজের জন্য অপরিচিত উৎস থেকে লেন্স কেনা বা অন্যের ব্যবহৃত লেন্স ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয়।

পোশাকের সঙ্গে অ্যাকসেসরিজের সঠিক নির্বাচন হ্যালোউইন লুককে সম্পূর্ণ করে। কালো লেসের গ্লাভস, বড় চোকার, ভিনটেজ ব্রোচ, ডার্ক স্টোনের আংটি, চেইন, নেকলেস এবং অদ্ভুত আকৃতির কানের দুল ব্যবহার করা যেতে পারে। উইচ লুকের সঙ্গে পয়েন্টেড হ্যাট, ভ্যাম্পায়ার লুকের সঙ্গে লম্বা কেপ এবং জম্বি লুকের সঙ্গে ছেঁড়া ব্যান্ডেজ বেশ মানানসই। আবার যাঁরা ফ্যাশনেবল কিন্তু সহজ সাজ পছন্দ করেন, তাঁরা কালো পোশাকের সঙ্গে একটি লাল রঙের স্টেটমেন্ট অ্যাকসেসরি ব্যবহার করতে পারেন। অল্প উপকরণেও তৈরি হতে পারে আকর্ষণীয় হ্যালোউইন লুহ্যালোউইন মানেই শুধু সাজ নয়, জমজমাট পার্টির আয়োজনও এর অন্যতম আকর্ষণ। বাড়িতে ছোট পরিসরে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বড় কোনও ভেন্যুতে থিম পার্টির আয়োজন করা যেতে পারে। পার্টির সাজসজ্জায় কালো, কমলা, বেগুনি এবং রক্তিম রঙের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। প্রবেশপথে কৃত্রিম মাকড়সার জাল, কুমড়োর লণ্ঠন, কাগজের বাদুড় এবং ঝুলন্ত ভূতের অবয়ব সাজিয়ে দেওয়া যায়। ঘরের আলো কিছুটা কমিয়ে বিভিন্ন কোণে ব্যাটারি চালিত মোমবাতি কিংবা ছোট LED লাইট রাখলে তৈরি হবে রহস্যময় পরিবেশ। আসল আগুনের পরিবর্তে ব্যাটারি চালিত আলো ব্যবহার করাই নিরাপদ।

পার্টির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে একটি নির্দিষ্ট ফটো কর্নার। সেখানে রাখা যেতে পারে কৃত্রিম কবরের ফলক, বিশাল কুমড়ো, কালো পর্দা, মাকড়সার জাল এবং বিভিন্ন মজার প্রপস। অতিথিরা নিজেদের সাজে ছবি তুলতে পারবেন। চাইলে আয়োজন করা যেতে পারে ‘বেস্ট কস্টিউম’, ‘মোস্ট ক্রিয়েটিভ মেকআপ’ কিংবা ‘ফানিয়েস্ট হ্যালোউইন লুক’-এর মতো প্রতিযোগিতা। এতে পার্টিতে অংশগ্রহণের আনন্দ আরও বেড়ে যাবে। তবে প্রতিযোগিতার বিষয়টি যেন ভয়ংকর সাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব এবং পোশাকের উপস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

হ্যালোউইন পার্টির খাবারেও থাকতে পারে বিশেষত্ব। সাধারণ খাবারকে সামান্য পরিবর্তন করেই তৈরি করা সম্ভব উৎসবের উপযোগী মেনু। কুমড়োর স্যুপ, মমি পিৎজা, বাদুড়ের আকৃতির কুকিজ, চকোলেট ব্রাউনি, ডেভিলড এগ কিংবা কমলা রঙের কাপকেক পরিবেশন করা যেতে পারে। সাদা চকোলেট দিয়ে ছোট ভূতের আকৃতি তৈরি করে কেক বা পুডিংয়ের উপর সাজানো যায়। ফলের মধ্যে কমলা, আপেল, আঙুর এবং কলা ব্যবহার করে তৈরি করা যেতে পারে মজার ফ্রুট প্ল্যাটার। শিশুদের জন্য কুমড়োর মুখ আঁকা ছোট স্যান্ডউইচ কিংবা চোখের মতো সাজানো মিষ্টি খাবারও বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে।

পানীয়ের ক্ষেত্রেও রাখা যেতে পারে থিমের ছোঁয়া। লাল রঙের ফলের রস, ক্র্যানবেরি জুস, ডালিমের শরবত কিংবা কমলার পানীয় কাচের গ্লাসে পরিবেশন করলে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। গ্লাসের গায়ে চকোলেট সিরাপ দিয়ে বিশেষ নকশা তৈরি করা যেতে পারে। পানীয়ের নামও রাখা যায় মজার—‘ভ্যাম্পায়ার ব্লাড’, ‘উইচস ব্রু’ কিংবা ‘পাম্পকিন পাঞ্চ’। শিশুদের পার্টিতে অবশ্যই অ্যালকোহলমুক্ত পানীয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

হ্যালোউইন উদ্‌যাপনে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ একটি বিশেষ ঐতিহ্য। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে শিশুরা বিভিন্ন ভৌতিক বা মজার পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায় এবং ‘ট্রিক অর ট্রিট’ বলে মিষ্টি বা চকোলেট চায়। বাড়ির মানুষজন তাদের মিষ্টি উপহার দেন। এই প্রথার মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ, আনন্দ এবং শিশুদের অংশগ্রহণের এক সুন্দর দিক। আমাদের শহরেও আবাসনের ভিতরে কিংবা পরিচিত বন্ধুদের মধ্যে নিরাপদভাবে এই ধরনের আয়োজন করা যেতে পারে। তবে শিশুদের সব সময় অভিভাবকের নজরদারিতে রাখা জরুরি। অপরিচিত বাড়িতে একা যাওয়া কিংবা অজানা খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়।

কলকাতার মতো শহরে হ্যালোউইন উদ্‌যাপনের ধরন কিছুটা আলাদা। এখানে দুর্গাপুজোর পরপরই আসে কালীপুজো ও দীপাবলি। ফলে আলোর উৎসবের আবহের মধ্যেই হ্যালোউইনের ভৌতিক সাজ অনেকের কাছে নতুন আনন্দ নিয়ে আসে। বিভিন্ন ক্যাফে, রেস্তরাঁ, ক্লাব এবং বিনোদনমূলক জায়গায় থিম পার্টির আয়োজন করা হয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই দিনটি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন সাজে ছবি তোলা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরি করার একটি বিশেষ উপলক্ষ। কেউ কেউ বাড়িতেই ছোট পার্টির আয়োজন করেন। আবার অনেকেই পরিবারের শিশুদের নিয়ে হ্যালোউইন থিমে কেক তৈরি কিংবা সাজসজ্জার কর্মশালায় অংশ নেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যালোউইন ফ্যাশনকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম, পিন্টারেস্ট এবং ইউটিউবে হ্যালোউইন মেকআপের অসংখ্য টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। কয়েক মিনিটের ভিডিওতেই দেখা যায় কীভাবে সাধারণ মেকআপ থেকে তৈরি করা যায় ভয়ংকর চরিত্রের অবয়ব। বিভিন্ন বিউটি ইনফ্লুয়েন্সার এবং মেকআপ আর্টিস্ট তাঁদের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নতুন নতুন ট্রেন্ড তৈরি করছেন। তবে অনলাইনে দেখা প্রতিটি মেকআপ কৌশল নিজের ত্বকে প্রয়োগ করা নিরাপদ নয়। ব্যবহৃত প্রসাধনীর উপাদান, মেয়াদ এবং ত্বকের উপযোগিতা যাচাই করা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে হ্যালোউইন ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব ভাবনাও। প্রতি বছর একবার ব্যবহারের জন্য নতুন কস্টিউম কেনার পরিবর্তে পুরনো পোশাককে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। কালো শাড়ির সঙ্গে গথিক মেকআপ, পুরনো লম্বা গাউনের সঙ্গে কৃত্রিম কেপ কিংবা সাধারণ সাদা পোশাকের সঙ্গে বিশেষ মেকআপ—এই সামান্য পরিবর্তনেই তৈরি হতে পারে অভিনব সাজ। পোশাক ভাড়া নেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে কস্টিউম বিনিময় কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ দিয়ে অ্যাকসেসরিজ তৈরি করাও ভালো বিকল্প। এতে খরচ কমবে, অপচয়ও কমবে।

হ্যালোউইনের আরেকটি বিশেষ দিক হল ভয়কে আনন্দে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা। সাধারণত ভূত, প্রেত, অন্ধকার কিংবা অজানা বিষয় নিয়ে মানুষের মনে যে ভয় কাজ করে, এই উৎসবে সেই ভয়কেই সাজ, গল্প, অভিনয় এবং বিনোদনের অংশ করে তোলা হয়। ছোটরা ভূতের গল্প শুনে যেমন ভয় পায়, তেমনই আবার সেই গল্পের চরিত্র সেজে আনন্দও পায়। বড়দের কাছেও এই দিনটি দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ। নিজের চেনা চেহারা ও পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অন্য একটি চরিত্রে নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা এই উৎসবকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তবে উৎসবের আনন্দ বজায় রাখতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মেকআপ ব্যবহারের আগে ত্বকে প্যাচ টেস্ট করা উচিত। চোখের আশপাশে ব্যবহৃত প্রসাধনী যেন চোখের জন্য নিরাপদ হয়। কৃত্রিম ক্ষত তৈরি করতে অপরিচিত আঠা কিংবা রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না। পোশাকে এমন কিছু ব্যবহার করা উচিত নয় যা আগুনের সংস্পর্শে সহজেই জ্বলে উঠতে পারে। পার্টিতে সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক আলোর সংযোগও নিরাপদ রাখতে হবে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ছোট আকারের এমন কোনও অ্যাকসেসরি ব্যবহার করা উচিত নয় যা গলায় আটকে যেতে পারে কিংবা গিলে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে।

সব মিলিয়ে হ্যালোউইন এখন আর শুধুমাত্র ভৌতিক সাজের উৎসব নয়। এটি ফ্যাশন, মেকআপ, সৃজনশীলতা, খাবার, পার্টি এবং সামাজিক আনন্দের এক অভিনব মেলবন্ধন। এখানে ভয় যেমন আছে, তেমনই আছে হাসি। অন্ধকার যেমন আছে, তেমনই রয়েছে রঙিন আলোর খেলা। কেউ সাজছেন রহস্যময় ডাইনি, কেউ ভ্যাম্পায়ার, কেউ আবার নিজের কল্পনায় তৈরি করছেন সম্পূর্ণ নতুন কোনও চরিত্র।

৩১ অক্টোবর তাই আলমারি থেকে বের করে আনুন আপনার সবচেয়ে অভিনব পোশাকটি। মেকআপে যোগ করুন একটু রহস্য, অ্যাকসেসরিজে থাকুক অদ্ভুত চমক, আর পার্টিতে জমে উঠুক হাসি-আড্ডা। মনে রাখবেন, হ্যালোউইনের আসল মজা ভয় দেখানোয় নয়, বরং নিজের কল্পনাকে মুক্ত করে আনন্দে মেতে ওঠায়। আর সেই আনন্দের মন্ত্র একটাই—ট্রিক অর ট্রিট!

Archive

Most Popular