উড়িষ্যার জাজপুরে দেবী বিমলার মন্দির, যা আসলে শক্তিপীঠ, নাম বিরজা ক্ষেত্র। পীঠ নির্ণয় তন্ত্রানুসারে এখানে দেবীর নাভি পড়েছিল। এটি একাদশ তম সতীপীঠ। মন্দিরের মূল ফটকের সামনে দাড়িয়ে, সোজা তাকালে একটা আলোক বিন্দু চোখে পড়ে। এটি মা বিরজার কপালের হিরের টিপ, ঔজ্জ্বল্য এতটাই যে, গর্ভগৃহের ভিতরে থাকা দেবী বিরজাকে বাইরে থেকে দেখা না গেলেও, এই হীরক খণ্ডের দ্যুতি বাইরে থেকেও চোখে পড়ে। এখানে দেবী রত্নবেদিতে আসীন। দ্বিভূজা, সিংহবাহিনী। এক হাতে শূল ও অন্য হাতে মহিষরূপী অসুরের লেজ ধরে আছেন। এই মন্দিরটি ১৩ শতকে নির্মিত হয়েছিল। শহরটি ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। প্রধান মূর্তি হল দেবী দুর্গা যিনি বিরজা নামে পূজিতা। আদ্যা স্তোত্রমের নবম স্তবকে এই দেবীর উল্লেখ রয়েছে।
ইনি কৃপাময়ী জগতজননী জগন্নাথ এর সহধর্মিনী। কোন কোন স্থানে বিমলা এবং বিরজা দেবীকে একই রূপ বলা হয়। কিন্ত এই দুটি আদিশক্তির দুটি ভিন্ন রূপ। বিরজা দেবীর মন্দিরে নবরাত্রির সময় বলি হয়।
শাক্তমতে জগন্নাথ হলেন এঁর ভৈরব। বিরজা দেবী হলেন লক্ষ্মী বা শক্তির রূপ। বিরজা ও বিমলা আসলে একই শক্তিপীঠ এর দুটি রূপভেদ। জগন্নাথ হলেন দারুব্রহ্ম তিনি বৈষ্ণব দের কাছে বিষ্ণু, শৈব দের কাছে শিব, শাক্ত দের কাছে দক্ষিণা কালী, আবার গণেশের উপাসক দের কাছে তিনি গজানন। বেদে এনাকে পরমপুরুষ বলা হয়েছিল। যাঁর স্ত্রী হলেন হ্রী বা শ্রী। ইনি কৃপাময়ী জগতজননী জগন্নাথ এর সহধর্মিনী। কোন কোন স্থানে বিমলা এবং বিরজা দেবীকে একই রূপ বলা হয়। কিন্ত এই দুটি আদিশক্তির দুটি ভিন্ন রূপ। অনেকে বিরজাদেবীর ভৈরব হিসেবে যজ্ঞ বরাহের নাম করেন। বিরজা দেবীর মন্দিরে নবরাত্রের সময় বলি হয়।
দেবী ভাগবতে পাওয়া যায় গয়ায়াং মঙ্গলা প্রোক্তা বিমলা পুরুষোত্তমে ।। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী যখন ভণ্ডাসুর বধের জন্য যজ্ঞাগ্নি থেকে আবির্ভূত হলেন, তখন তাঁর চক্ররাজ রথের সপ্তম আবরণ থেকে আটটি স্বরূপের উদ্ভব হল। এই চক্রে আট বাক দেবতা হলেন বশিনী, কামেশ্বরী,মোদিনী, বিমলা, অরুণা, জৈনী, সর্বেশ্বরী, কৌলিনী। এই আটটি স্বরূপের অন্যতম বিমলা দেবী।
বলা হয় দেবী সুভদ্রা হলেন বিমলার অংশাবতার। দেবী সুভদ্রার রথ দর্পদলন। তাতে পার্শ্বচরী হিসাবে বিমলার বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। বামদিকে আছেন শ্যামাকালী, মঙ্গলা ও বিমলা। দেবী বিমলা নিজের সুভদ্রা স্বরূপের পার্শ্ব দেবতা রূপে অবস্থিত। রথের ডানদিকে আছেন চণ্ডী, চামুণ্ডা ও উগ্রতারা। পশ্চাতে আছেন বারাহী, বনদুর্গা ও শূলীদুর্গা।
বিমলা দেবী মাতঙ্গী কুলের দেবী হওয়ায় তিনিও মাতঙ্গীর ন্যায় উচ্ছিষ্ট খাদ্য ভোজন করেন। দেবতাকে উচ্ছিষ্ট প্রসাদ নিবেদন করা নিষিদ্ধ। তবে তন্ত্রাচারে এঁটো খাদ্য নিবেদন করার ঘটনা দেখা যায়। এ বিষয়ে বৈষ্ণবদের মধ্যে একটি কাহিনী প্রচলিত। ভগবান শিব একবার গোলকধামে ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখেন, বিষ্ণুর খাবার থালা থেকে কয়েক টুকরো এঁটো খাদ্য মাটিতে পড়েছে। মহাদেব বিষ্ণুকে এবং বিষ্ণু মহাদেবকে আরাধ্য জ্ঞান করেন । তাই মহাদেব সেই উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করেন। সেই সময় অসাবধানতাবশত দাড়িতে কিছু এঁটো লেগে যায়। শিবলোকে ফেরার পর দেবর্ষি নারদ তাঁর দাড়িতে নারায়ণের উচ্ছিষ্ট দেখে তা প্রসাদ হিসেবে খেয়ে ফেলেন । তা জানার পর দেবী পার্বতী এতে ক্রুদ্ধ হন। বিষ্ণুর প্রসাদে নিজের ন্যায্য অংশ না পাওয়ায় তিনি বৈকুণ্ঠে গিয়ে নারায়ণের কাছে নালিশ করেন। ভগবান হরি তাঁকে শান্ত করে বলেন, কলিকালে তিনি বিমলা রূপে নিত্য তাঁর এঁটো প্রসাদ পাবেন। তাই সাধারণত বিমলার জন্য আলাদা ভোগ রান্না করা হয় না। তাই এখনও বিমলা জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ খান। জগন্নাথ মন্দিরে নিবেদিত নিরামিষ ভোগই বিমলাদেবীকে নিবেদন করা হয়। জগন্নাথের প্রসাদ বিমলাকে নিবেদন করার পরই তা মহাপ্রসাদের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়।
বিমলাকে যখন আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়, তখন সেই ভোগ রান্নার ব্যবস্থা আলাদা করে করা হয়। দুর্গাপূজার সময় দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। সেই সময় বিমলা এবং বিরজা মন্দিরে পশুবলি হয়। দুর্গাপূজার সময় বিমলা এবং বিরজা উভয়েই রৌদ্র স্বরূপ ধারণ করেন; তাই সেই সময় তাঁকে শান্ত করতে আমিষ ভোগ নিবেদন করা উচিত। দুর্গাপূজার সময় খুব ভোরে গোপনে পাঁঠাবলি দেওয়া হয়। স্থানীয় মার্কণ্ড মন্দিরের পুকুর থেকে মাছ ধরে এনে তা রান্না করে তান্ত্রিক মতে বিমলাকে নিবেদন করা হয়। এই মন্দিরে একই সাথে দুটি শক্তিপীঠ অবস্থিত: এক হল বিরজা দেবী যেখানে সতীর নাভি পতিত হয়েছিল এবং আরেক হল বিমলা দেবী যেখান পাদপদ্ম পড়েছিল।