19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পোশাক প্যালেটে পূর্ব-পশ্চিম: ফ্যাশনের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ফ্যাশন এক ধরণের ভাষা যার শব্দ নেই, কিন্তু প্রভাব প্রবল। সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোশাকের ধরণ যেমন বদলায়, তেমনি বদলে যায় রং, কাটিং ও টেক্সচারের রুচিও। আজকের বিশ্বায়িত যুগে, পোশাকে পূর্ব ও পশ্চিমের মেলবন্ধন এক নতুন মাত্রা তৈরি করছে যা শুধু স্টাইল নয়, এক ধরণের আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। আর এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল বাংলা, বিশেষ করে কলকাতা।

পূর্ব বলতে আমরা সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কথাই বুঝি যেমন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা-পাজামা, লেহেঙ্গা বা ধুতি-পাঞ্জাবি। এসব পোশাক কেবল দৈনন্দিন পরিধান নয়, তা একেকটি সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বাংলার শাড়ি, বিশেষত ঢাকাই জামদানি, তান্তি, গরদ, বালুচরী, মসলিন এসব শুধু কাপড় নয়, শিল্প। রঙে থাকে উৎসবের ছোঁয়া, বুননে থাকে মায়ের শাসন আর ঠাকুরমার গল্প। কুর্তির গায়ে কারচুপি, পিঠে বাটিকের কাজ সবই পূর্বের পরিশীলিত নান্দনিকতার পরিচয়। পশ্চিমা পোশাকে জোর দেয়া হয় ফিটিং, কাঠামো এবং সিম্প্লিসিটিতে। প্যান্টসুট, ট্রেঞ্চ কোট, ডেনিম জিনস, টি-শার্ট, টার্টলনেক এইসব পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মবিশ্বাস। পশ্চিমা নারীর পোশাকে সাধারণত জাঁকজমক কম, কিন্তু কেতাদুরস্ততা বেশি। পশ্চিমা পোশাকের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল Layering ও Neutral Palette, ধূসর, সাদা, খাকি, বেইজ, নেভি ব্লু ইত্যাদি রঙের ব্যবহারে তৈরি হয় আধুনিক, স্নিগ্ধ এক ফ্যাশন ভাষা।

এই দুটি ধারা যখন একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় নতুন এক ফ্যাশন জগৎ ইন্দো-ওয়েস্টার্ন। আজকের শহুরে তরুণীরা ধুতি-প্যান্টের সঙ্গে ক্রপটপ পরেন, বা কুর্তির সঙ্গে জিনস মেলান। কাঁধ খোলা ব্লাউজে শাড়ি, বা শেরওয়ানির সঙ্গে স্নিকার্স এসব আর বিচিত্র নয়, বরং বোল্ড। ফ্যাশন ডিজাইনাররা আজকে এই ফিউশন লুকে রীতিমতো পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন। অনুষ্কা শর্মার মতো অভিনেত্রীর বেনারসি শাড়ির সঙ্গে স্লিভলেস ব্লাউজ, কিংবা দীপিকা পাড়ুকোনের কোট-স্টাইল কুর্তা সবই পূর্ব-পশ্চিমের ফ্যাশন সংলাপ।পূর্বের পোশাকে রঙের ব্যবহার গাঢ়, উজ্জ্বল এবং ঋতুভিত্তিক। পুজোর সময় লাল-সাদা, বসন্তে হলুদ, বিয়েতে লাল, সবজিরঙা বা গাঢ় নীলের প্রাধান্য দেখা যায়। অপরদিকে, পশ্চিমা পোশাকে থাকে কমনীয়তা, ধূসর-সাদা-বেইজের মতো নিঃশব্দ রঙ। আজ এই দুই ধারার সংমিশ্রণে যে প্যালেট গড়ে উঠেছে, তা অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। জামদানির সঙ্গে প্যাস্টেল ব্লাউজ, বা ডেনিম জ্যাকেটের সঙ্গে রঙিন লেহেঙ্গা স্কার্ট এই সব লুকে এখন পরিশীলন আর পার্সোনাল স্টাইল একসঙ্গে ধরা পড়ছে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যাশন ও হ্যান্ডলুম এ দুটি ক্ষেত্রেও পূর্ব ও পশ্চিমের সংমিশ্রণ ঘটছে। বিদেশি ব্র্যান্ড যেমন ভারতীয় হ্যান্ডলুমে আগ্রহী, তেমনি দেশি ডিজাইনাররা বিদেশি ফেব্রিক (জর্জেট, লিনেন, ক্রেপ) ব্যবহার করছেন ভারতীয় কাটিংয়ে, উদাহরণস্বরূপ, ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির বেনারসি ব্রাইডাল কালেকশন পশ্চিমের গাউন স্টাইলের কাটে তৈরি হচ্ছে। অনিতা ডোংরে বা রিমঝিম দত্তদের ডিজাইনেও দেখা যাচ্ছে নিট, শিফন বা অর্গাঞ্জা ফেব্রিকের মধ্যে ট্র্যাডিশনাল মোটিফ।পূর্ব-পশ্চিমের এই মেলবন্ধনে সবচেয়ে উপকৃত হয়েছে নারীর নিজস্ব পোশাক-স্বাধীনতা। আজকের নারী চাইলে কর্পোরেট অফিসে জ্যাকেট-কুর্তি পরে যেতে পারেন, আবার সন্ধ্যায় ক্যাফেতে শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্সে হাঁটতে পারেন। ফ্যাশনের এই স্বাধীনতা কোনও একক সমাজ বা সংস্কৃতির নয়, বরং নারীর আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। এখন কেউ যদি কাজের জায়গায় শাড়ি পরে যান, তাতে তাকে দাদির মতো বলা হয় না। আবার জিনস পরে পূজোয় গেলে অশোভন বলাও হয় না। এটাই ফ্যাশনের সার্থকতা।

স্টাইল গাইড: কীভাবে মেলাবেন পূর্ব ও পশ্চিম?

1. শাড়ির সঙ্গে বেল্ট বা জ্যাকেট – ট্র্যাডিশনাল লুকে আধুনিক ছোঁয়া।

2. ক্রপটপ + পালাজ্জো/ধুতি প্যান্ট – বিয়েবাড়ি হোক বা কলেজ ফেস্ট, এই লুক সমান মানানসই।

3. কুর্তি + ডেনিম – প্রতিদিনের জন্য আরামদায়ক ও স্মার্ট।

4. লং কুর্তা + ব্লেজার – কর্পোরেট মিটিং বা অফিসে এক ঝলক আলাদা হওয়ার স্টাইল।

5. পশ্চিমা কাটে ভারতীয় মোটিফ – জর্জেট ড্রেসে ব্লক প্রিন্ট, বা গাউন-স্টাইল লেহেঙ্গা।

পূর্ব ও পশ্চিম দুটি দিকই আজ আমাদের জীবনে অপরিহার্য। ফ্যাশন সেই সেতু, যা এই দুই ধারাকে আলাদা না করে, একসাথে বুনে দেয়। আজকের বাঙালি নারী জানেন কখন শাড়ি পরবেন, আবার কবে জিনস ও ব্লেজারে আত্মপ্রকাশ করবেন। এই নতুন পোশাক প্যালেটে শুধু রঙ ও কাপড়ের নয়, আত্মবিশ্বাস ও চেতনারও সমন্বয় ঘটছে। ফ্যাশনের ভাষায় বাঙালি আজ গ্লোবাল, অথচ শিকড়ে দৃঢ়। পোশাক তাই আর শুধু ঢেকে রাখার উপকরণ নয় এটি এখন একজন নারীর গল্প বলার মাধ্যম।

Archive

Most Popular