স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভাঙা হৃদয় এই কথাটি আমরা সাধারণত কাব্যিক অর্থেই ব্যবহার করি, বিশেষ করে প্রেমে আঘাত পেলে বা কোনো প্রিয়জন হারালে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম একেবারেই বাস্তব ও পরিচিত একটি রোগের নাম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Takotsubo Cardiomyopathy বা Stress-Induced Cardiomyopathy। এই অবস্থায় হৃদ্পিণ্ডের একটি অংশ হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ দেখা যায় যদিও এটি ঠিক হার্ট অ্যাটাক নয়। মূলত হঠাৎ মানসিক বা শারীরিক চাপ, যেমন প্রিয়জনের মৃত্যু বা সম্পর্কবিচ্ছেদের মতো ঘটনাই এই অবস্থার কারণ হতে পারে। এই প্রবন্ধে আমরা ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা এবং এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সংযোগ নিয়ে আলোচনা করব।
এটি এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। যেমন:
প্রিয়জনের মৃত্যু
প্রেমের বিচ্ছেদ বা বিবাহবিচ্ছেদ
সন্তান বা পরিবারের কারও বড় বিপদ
চাকরি হারানো বা আর্থিক ধ্বস
দুর্ঘটনা, সহিংসতা বা আতঙ্কজনক পরিস্থিতি
এই ঘটনাগুলো হঠাৎ দুঃখ, আতঙ্ক বা তীব্র মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে।
২. স্ট্রেস হরমোনের হঠাৎ বৃদ্ধি
মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় শরীরে অ্যাড্রেনালিন এবং অন্যান্য ক্যাটেকোলামিন (stress hormones) অতিরিক্ত পরিমাণে নিঃসৃত হয়।
এই হরমোনগুলো হৃদ্পিণ্ডে:
রক্তসঞ্চালন হঠাৎ কমিয়ে দেয়
হার্ট মাংসপেশিকে দুর্বল করে
হৃদ্পিণ্ডের বাঁ পাশের (left ventricle) এক অংশকে অকার্যকর বা অস্বাভাবিক করে তোলে
ফলে হার্ট ঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না।
হৃদ্পিণ্ড ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ আছে। দুঃখ, ভয়, বা অতিরিক্ত উত্তেজনা মস্তিষ্ক থেকে হার্টে এমন কিছু সিগনাল পাঠায়, যা হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রে পরিবর্তন ঘটায়। এটিকে neuro-cardiac interaction বলা হয়।
শুধু মানসিক নয়, কিছু শারীরিক পরিস্থিতিও এই সিন্ড্রোমের কারণ হতে পারে:
বড় ধরনের অস্ত্রোপচার
স্ট্রোক বা সিজার
শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা
হঠাৎ ব্যথা বা জ্বর
প্রচণ্ড পরিশ্রম বা দুর্ঘটনা
এই শারীরিক চাপও হৃদ্পিণ্ডে স্ট্রেস সৃষ্টি করে।
৯০%-এর বেশি রোগীই মহিলা, বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সী
মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের মধ্যে স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব বেশি দেখা যায়
যাদের আগে থেকেই দুশ্চিন্তা, হতাশা বা মানসিক আঘাতের ইতিহাস আছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
বুকে ব্যথা
শ্বাসকষ্ট
হার্টবিট দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া
হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (কখনও)
এই লক্ষণগুলো হার্ট অ্যাটাকের মতো হলেও, ECG (Electrocardiogram), রক্ত পরীক্ষা ও হৃদ্যন্ত্রের আল্ট্রাসাউন্ড (Echo) করলে দেখা যায় হৃদ্পিণ্ডে রক্তনালীগুলো বন্ধ নেই বরং হার্টের বাম দিকের পাম্পিং অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানসিক বা শারীরিক চাপের ফলে শরীরে অ্যাড্রেনালিন জাতীয় স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা হৃদ্পিণ্ডের পেশির অস্থায়ী ক্ষতি করে। ফলে হৃদ্পিণ্ড কিছু সময়ের জন্য ঠিকভাবে সংকোচন করতে পারে না।
সাধারণত এই অবস্থা অস্থায়ী এবং সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
রোগীকে অক্সিজেন, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ (যেমন বিটা-ব্লকার), ফ্লুইড ইত্যাদি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
বেশিরভাগ রোগী ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
এটি মূলত মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বিশেষত মেনোপজ পরবর্তী বয়সে।
কেউ যদি পূর্বে এই রোগে আক্রান্ত হন, তার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে স্ট্রেস এড়ানো এবং নিয়মিত হৃদ্যন্ত্র পরীক্ষা করানো জরুরি।
ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম প্রমাণ করে, মনের দুঃখ কেবল আবেগের বিষয় নয় তা শরীরেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ মানসিক আঘাত হৃদ্যন্ত্রের ওপর তাৎক্ষণিক এবং বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও চিকিৎসার মাধ্যমে এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। এই রোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও শারীরিক সুস্থতার অংশ। ভালোবাসা, সহানুভূতি, এবং মানসিক স্থিতি এই তিনটি জিনিস যেমন হৃদয়কে সুস্থ রাখে, তেমনই হৃদ্যন্ত্রকেও। তাই জীবন যখন ভেঙে পড়ে, তখন শুধু চোখ নয়, হৃদ্পিণ্ডও কান্না করে আর আমরা যেন সেই কান্নার চিকিৎসা দিতে ভুলে না যাই।