প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভারতের আদিবাসী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হলো সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। তাদের জীবনযাত্রা, উৎসব ও বিশ্বাস প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। এরই একটি অনন্য উৎসব হলো শাল মহুয়ায় বাহা পরব, যা শুধু একটি ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রকৃতি ও মানবসমাজের বন্ধনের প্রতীক। বসন্তের আগমনে এই উৎসব সাঁওতাল সমাজে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায়।
শাল মহুয়ায় বাহা পরব-এর পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহ্য ও ইতিহাস, যা সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর জীবনদর্শন, বিশ্বাস ও প্রকৃতির প্রতি তাদের নিষ্ঠার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিচে এর ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
আদিবাসী সমাজ ও প্রকৃতি:
সাঁওতাল জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বনাঞ্চলে বসবাস করে আসছে, বিশেষ করে ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং বিহার অঞ্চলে। তারা প্রকৃতিকে দেবতা রূপে পূজা করে, এবং প্রতিটি ঋতুর পরিবর্তন তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বসন্তকালে যখন গাছে ফুল ফোটে, তখন তারা প্রকৃতির নবজাগরণকে উৎসব হিসেবে উদযাপন করে – এটিই বাহা পরবের মূল ভাবনা।
শাল ও মহুয়া গাছের গুরুত্ব:
শাল গাছকে সাঁওতালরা পবিত্র বলে মনে করে, এবং মহুয়া গাছ তাদের খাদ্য, পানীয় ও অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মহুয়া ফুল থেকে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী পানীয়, যা উৎসবে ব্যবহৃত হয়। এই দুটি গাছ তাই বাহা পরবের প্রতীক।
দেবতা মারাং বুরু ও জাহের আয়ো:
বাহা পরব মূলত সাঁওতালদের প্রধান দেবতা মারাং বুরু এবং জাহের আয়ো (জঙ্গল দেবী)-এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। তারা বিশ্বাস করে, বসন্তে গাছের প্রথম ফুল তাদের দেবতাকে নিবেদন করতেই হবে – এটি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
ঐতিহাসিক সমাজব্যবস্থা ও বাহা পরব:
প্রাচীন সাঁওতাল সমাজে বাহা পরব কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল সামাজিক সংহতির দিনও। এই দিনে গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে দলবদ্ধ নৃত্য, গান, ভোজ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করত।
অর্থ ও উৎস:
বাহা শব্দের অর্থ ফুল। এই পরব ফুল উৎসব হিসেবে পরিচিত। সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে এই সময় দেবতাদের ফুল উৎসর্গ করার মাধ্যমে তারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়।
সময়কাল:
সাধারণত মার্চ মাসে, বসন্তের আগমনের সময় উদযাপন করা হয়।
উৎসবের কার্যক্রম:
শাল ও মহুয়া গাছের ফুল সংগ্রহ করে তা দেবতা মারাং বুরুকে উৎসর্গ করা হয়।
পুজোর পর শুরু হয় নাচ ও গান। ঐতিহ্যবাহী সাঁওতালি ঢোল, তামাক, বাঁশি ইত্যাদি বাজানো হয়।
পুরুষ ও নারী ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বাহা নৃত্যে অংশ নেন।
একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক এই উৎসব।
প্রকৃতির গুরুত্ব:
শাল ও মহুয়া গাছ শুধু ধর্মীয় নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সাঁওতাল সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। মহুয়া ফুল থেকে তৈরি হয় পানীয়, ওষুধ ও খাদ্য।
শাল মহুয়ায় বাহা পরব কেবল ফুলের উৎসব নয়, এটি হলো প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, সমাজে ঐক্য ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক মহান উপলক্ষ। এই উৎসব আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবাসা ও সম্মান জানিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আধুনিকতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই ধরনের উৎসব আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের স্মারক হয়ে ওঠে।