প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভারতের পশ্চিম প্রান্তে বিস্তৃত কচ্ছ মরুভূমি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয় এটি এক বিস্ময়কর বুনন সংস্কৃতিরও আঁতুড়ঘর। গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চল যেন একটি জীবন্ত টেক্সটাইল জাদুঘর, যেখানে প্রতিটি কাপড়, প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি সূচিকর্ম বলে চলে কালের গল্প। এখানকার বুনন শুধু শিল্প নয়, এটি এক ঐতিহ্য, পরিচয়, আর নারীশ্রমের আত্মমর্যাদার প্রতীক। কচ্ছ অঞ্চলের টেক্সটাইল শিল্পের গোড়ার কথা খুঁজতে হলে যেতে হয় সিন্ধু সভ্যতার যুগে। গবেষকরা মনে করেন, এখানকার কাঁথা সেলাই, আয়নার কাজ বা শিশু বুনন-এর রীতিগুলো প্রাচীন কালে সিন্ধু উপত্যকা থেকে গড়ে উঠেছিল এবং কালের পরিক্রমায় উপজাতিদের জীবনধারার সঙ্গে মিশে এক নিজস্ব রূপ পেয়েছে। কচ্ছের বেশ কিছু সম্প্রদায় যেমন রাবারি, জাট, মুতওয়া, আহির, হারিজান প্রভৃতি গোষ্ঠী তাঁদের নিজস্ব পোশাক ও বুননের ধারায় বিশেষত্ব এনেছেন। এইসব শিল্প আজও মহিলাদের হাত ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বেঁচে আছে..
কচ্ছের সবচেয়ে বিখ্যাত বুননের একটি হলো আয়নার কাজ বা আভলা ভারত। এই সূচিকর্মে ছোট ছোট আয়না কাপড়ের মধ্যে এমবেড করে নানা মোটিফ তৈরি করা হয়। আয়নার চারপাশে নানান রঙের সূতো দিয়ে কারুকাজ, যেন রোদের আলো পড়লেই সেই কাপড় ঝলমল করে ওঠে। এই কাজ শুধু সুন্দরই নয়, ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়েছিল যে আয়না খারাপ শক্তিকে প্রতিফলিত করে দূর করে। ফলে, এটি ছিল একরকম রক্ষাকবচও বটে।
কচ্ছের সূচিকর্ম মানেই জটিল মোটিফ, বহু রঙের সুতো, এবং নিখুঁত বিন্যাস। সোফি কাজ, নেরান কাজ, খরক কাজ, বাওচি কাজ—এসব সূচিকর্মের ধারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাত ধরে তৈরি হয়েছে। যেমন: রাবারিদের সূচিকর্মে দেখা যায় গোমেদ পাথর, পশু-পাখির মোটিফ। জাট মহিলাদের কাজে থাকে গঠনগত জ্যামিতিক নিখুঁততা। মুতওয়া সম্প্রদায়ের সূচিকর্মে থাকে সূক্ষ্মতা ও সূক্ষ্ণ রঙের ব্যবহার। এইসব সূচিকর্ম মূলত শাড়ি, ওড়না, কুর্তা, বালিশের কভার -এ ব্যবহৃত হয়। কচ্ছের আরেক বিস্ময় বাঁধনী বা টাই-ডাই শিল্প, যেখানে সুতি বা রেশম কাপড় বিভিন্ন কায়দায় বেঁধে রং করা হয়। প্রতিটি বাঁধনের ধরনে ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন তৈরি হয়—যেমন লেহরিয়া, এক দো রঙ, শিকারি ইত্যাদি। বাটিক প্রিন্টিং-এ গরম মোমের সাহায্যে কাপড়ে ডিজাইন করে তা রঙে চুবিয়ে তৈরি করা হয় জটিল নকশা। কচ্ছের হস্তচালিত বাটিক প্রিন্ট এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও জনপ্রিয়।
কচ্ছের শিল্পচর্চার মূল কাণ্ডারী হলেন এখানকার মহিলারা। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই সূচিকর্ম, বুনন, কাপড়ে রঙ লাগানো, এমনকি বাজারজাত করার কাজে জড়িত হন। গ্রামীণ নারীদের জন্য এই শিল্প অর্থনৈতিক স্বাধীনতার একটি দরজা খুলে দিয়েছে। একইসঙ্গে কয়েকজন পুরুষ কারিগরও আছেন, যাঁরা তাঁত চালিয়ে, কাঁথা বুনে বা কাপড় ছাপার কাজ করেন। এর মধ্যে যেমন আজরক ব্লক প্রিন্টিং, ভুজোডি শাল বুনন, অথবা পাটোলা সিল্ক উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে বহু ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার কচ্ছের হস্তশিল্পের প্রতি ঝুঁকেছেন। সব্যসাচী মুখার্জী, রাজেশ প্রতাপ সিং, আনন্দ কবরা প্রমুখ ডিজাইনার তাঁদের সংগ্রহে কচ্ছের আয়নার কাজ, বাঁধনী প্রিন্ট ও সূচিকর্ম নিয়েছেন। শুধু ভারতেই নয়, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিসের ক্যাটওয়াকেও আজ কচ্ছের রঙিন নিদর্শন দেখা যাচ্ছে। কচ্ছের হস্তশিল্প প্রাকৃতিক রং, হস্তচালিত তাঁত ও পুনর্ব্যবহৃত কাপড়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের এক অন্যতম দৃষ্টান্ত। এই শিল্প ছোট ছোট গ্রাম্য শিল্পীদের হাতে তৈরি হয়, যাঁরা যান্ত্রিক নয় মনের ছোঁয়া দেন প্রতিটি সেলাইয়ে। এইভাবেই কচ্ছের বুনন শিল্প হয়ে উঠেছে একধরনের টেকসই জীবনচর্চার প্রতীক।
কচ্ছের বুনন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং আরও প্রসারিত করতে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে এসেছে। Shrujan, Kala Raksha, Khamir, SEWA এসব এনজিও মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে GI (Geographical Indication) তকমা পেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কচ্ছের বিভিন্ন বুননের কদর বেড়েছে। কল্পনার কাপড়ে বোনা সংস্কৃতি, কচ্ছের বুনন শুধু কাপড় নয় এটি ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম, নারী-শ্রম, আচার-অনুষ্ঠান এবং নান্দনিকতার এক সম্মিলিত উৎসব। এক একটি কাপড় যেন এক একটি উপন্যাস, যা বলে দেয় কে এটি বানাল, কোন অনুভব দিয়ে বানাল, এবং কোন জগতের স্বপ্ন সেখানে বোনা হলো। এখন যখন আমরা দ্রুতগতির ফ্যাশনের দুনিয়ায় ছুটছি, তখন কচ্ছের এই ধীর, মননশীল, হাতের তৈরি শিল্প আমাদের থমকে দিয়ে বলে ফ্যাশন মানেই শুধু স্টাইল নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।