প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
যখন মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছিল প্রায় অসম্ভব কল্পনা, তখন এক বাঙালি নারী সমস্ত বাধা পেরিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাস। তিনি হলেন ইলা মজুমদার (পরে ইলা ঘোষ) ভারতের প্রথম মহিলা বাঙালি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নারীর পক্ষে প্রযুক্তির জগতে প্রবেশের সাহসিক উদাহরণ হয়ে ওঠা এই মহীয়সী ব্যক্তিত্ব নিজের অধ্যবসায়, মেধা এবং নির্ভীকতায় ভেঙে দিয়েছিলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাঁধাধরা গণ্ডি। ভারতবর্ষে নারীর ভূমিকা যতই প্রাচীন হোক না কেন, বিজ্ঞানের জগতে তাঁদের পথ সবসময় সহজ ছিল না। কিন্তু ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যারা প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেন। ঠিক তেমনই একজন ছিলেন ইলা মজুমদার ভারতের তথা বাংলার প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।
১৯৩০ সালে বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেন ইলা মজুমদার। দেশভাগের পূর্বে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসে তিনি ভর্তি হন শিবপুরের বিখ্যাত বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে IIEST Shibpur)। ১৯৫১ সালে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক হন যা ছিল ওই কলেজের ইতিহাসে একজন নারীর প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক হওয়ার ঘটনা।
ইলার প্রতিভা ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যায় বিদেশে। উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি যান যুক্তরাজ্যে এবং গ্লাসগোর বিখ্যাত Barr and Stroud কোম্পানিতে কাজ করেন। ভারত ফিরে এসে তিনি যোগ দেন দেরাদুনের অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে যেখানে কাজ করতেন শুধুমাত্র পুরুষরা। এরপর দিল্লি পলিটেকনিকে তিনি প্রভাষক হিসেবে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন এবং একসময়ে ইউনেস্কোর সহায়তায় ঢাকায় মহিলা পলিটেকনিক স্থাপনেও অগ্রণী ভূমিকা নেন।
ইলা ঘোষ শুধুমাত্র একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন দিশারি, যিনি নিজের মেধা, পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে দেখিয়েছিলেন মেয়েরা চাইলেই যেকোনো কঠিন বিষয়ে পারদর্শী হতে পারে। ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর, ৮৯ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। আজ STEM-এ (Science, Technology, Engineering, Mathematics) নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে যখন এত আন্দোলন, তখন এই নারীর জীবনের গল্প যেন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
ইলা মজুমদার শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভবিষ্যতের এক দিশারী। তাঁর নিরবিচার লড়াই আর কৃতিত্ব আজকের প্রজন্মের মেয়েদের STEM জগতে প্রবেশের পথকে মসৃণ করেছে। তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন নারীর সাহস, মেধা ও সংকল্প থাকলে কোনো ক্ষেত্রই অধরা নয়। ইলা ঘোষ আজ আমাদের কাছে শুধুই ইতিহাস নন, তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।