প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপুজো শুধু পূজা-অর্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রতিটি রীতি-নীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের হিসেব। বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানে শুধু মহামায়ার বন্দনা নয়, বরং তাঁর আগমন ও গমনকে ঘিরে রয়েছে এক বিশেষ আবেগ। প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হওয়ার অনেক আগেই শাস্ত্রমতে নির্ধারিত হয় দেবীর আগমন ও গমন অর্থাৎ দেবী কী বাহনে পৃথিবীতে আসছেন এবং কোন বাহনে ফিরে যাচ্ছেন। এই বাহনই বলে দেয়, সেই বছর মানব সমাজে সুখ-সমৃদ্ধি আসবে নাকি অশান্তি, রোগ বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা রয়েছে। এখানে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব দেবীর আগমন-গমন কীভাবে নির্ধারিত হয়, এর পেছনে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা কী, এবং এর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কতটা। দেবীর আগমন-গমন নির্ধারিত হয় মূলত তিথি ও বার অনুসারে। দেবী দুর্গার পূজা মহালয়ার দিন থেকে শুরু হলেও, তাঁর আগমন নির্ধারণ করা হয় মহালয়ার পরের ষষ্ঠী বা সপ্তমীর দিনে। আবার বিসর্জনের পর দেবীর গমন কোন বাহনে হবে, তা নির্ভর করে দশমীর দিন ও তিথির উপর। শাস্ত্রমতে, দেবী দুর্গা চার প্রকার বাহনে আগমন করেন এবং চার প্রকার বাহনে গমন করেন। এগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুভ-অশুভ ফল।
অর্থ: শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালো ফলের প্রতীক।
ফল: যদি দেবী হাতিতে আগমন করেন, তবে সেই বছর কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি হয়, দেশ জুড়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য ঘটে। মানুষে মানুষে মিলন বাড়ে।
অর্থ: অস্থিরতা, গতি ও শক্তির প্রতীক।
ফল: দেবী যদি ঘোড়ায় আগমন করেন, তবে যুদ্ধ, অশান্তি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে। রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে।
অর্থ: জল, জীবন ও ভরসার প্রতীক।
ফল: নৌকায় আগমন বা গমন মানে প্রকৃতির আশীর্বাদ। প্রচুর ফসল ফলে, জলপথে বাণিজ্য উন্নত হয়, আর সাধারণ মানুষের জীবনে স্থিতি আসে।
অর্থ: শোক, রোগব্যাধি ও কষ্টের প্রতীক।
ফল: দেবী যদি ডোলায় আসেন বা যান, তবে সেই বছর রোগব্যাধি ও মৃত্যুর ভয় থাকে। অনেক সময় দুর্ভিক্ষ বা মহামারীর ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হয়।
শাস্ত্র অনুযায়ী, মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত কোন তিথিতে কোন বার পড়ছে তার উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় দেবীর বাহন। যেমন:
যদি ষষ্ঠী বা সপ্তমীতে সোমবার বা রবিবার হয়, তবে দেবী সাধারণত হাতি বাহনে আসেন।
মঙ্গলবার বা শনিবার হলে ঘোড়া বাহনের সম্ভাবনা থাকে।
বুধবার বা শুক্রবার হলে নৌকা বাহন ধরা হয়।
বৃহস্পতিবার হলে পালকি বা ডোলা ধরা হয়।
একইভাবে দশমীর দিন কোন বার তার উপর গমন নির্ধারিত হয়। কালপর্ব নামক গ্রন্থে দেবীর আগমন-গমনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এখানে বলা হয়েছে, দেবীর আগমন ও গমন আসলে প্রতীকী। দেবী তো চিরকালই সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তাঁর বাহনকে ঘিরে মানুষের মনে একটি বিশেষ বিশ্বাস গড়ে ওঠে, যা সমাজকে আগাম সতর্ক করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, দেবী যদি ঘোড়ায় আগমন করেন, তবে মানুষ যুদ্ধ বা অস্থিরতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে দেবীর বাহনের প্রতীক ছিল কৃষকের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
হাতি মানে ভালো বৃষ্টি ও সেচ: তাই কৃষকের মনে আনন্দ।
নৌকা মানে নদীমাতৃক বাংলায় ফসল ও বাণিজ্যে উন্নতি।
ঘোড়া মানে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা।
পালকি মানে রোগব্যাধি, যা সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা ডেকে আনে।
এভাবে দেবীর আগমন-গমন শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিভিন্ন অঞ্চলে দেবীর আগমন-গমন নিয়ে নানা লোককথা প্রচলিত। মুর্শিদাবাদে বলা হয়, দেবী যদি নৌকায় আসেন, তবে পদ্মা ও ভাগীরথীর তীরে প্রচুর মাছ ধরা যায়। নদীয়া ও বর্ধমানে বিশ্বাস করা হয়, ঘোড়া বাহনে এলে চাষাবাদের সময় ঝড়-বৃষ্টি বেশি হয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় গ্রামবাংলার মানুষ ডোলা বাহনকে ভয় পান, কারণ তাঁরা এটিকে রোগ-শোকের প্রতীক বলে মানেন। আজকের দিনে অনেকেই এই বাহন-নির্ভর শুভাশুভ ধারণাকে কেবল লোকবিশ্বাস হিসেবে দেখেন। বিজ্ঞানের দিক থেকে এর প্রমাণ না থাকলেও, সামাজিক দিক থেকে এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে। এছাড়া এটি দুর্গাপুজোর আবেগকে আরও রঙিন ও রহস্যময় করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দেবীর বাহন আসলে মানুষের অন্তরের ভয়, আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। হাতি ও নৌকা আমাদের আশা ও শান্তির প্রতীক। ঘোড়া ও ডোলা আমাদের ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। এভাবে বাহনের মাধ্যমে মানুষ নিজের অনুভূতিকে আচার-অনুষ্ঠানে প্রকাশ করে। দেবীর আগমন-গমন নির্ধারণ শুধুমাত্র শাস্ত্রের গণনা নয়, এটি বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেবী যখন হাতি বা নৌকায় আসেন, তখন মানুষের মনে আনন্দ জাগে; আবার ঘোড়া বা ডোলার আগমনে ভয় ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। কিন্তু যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত মানুষ বিশ্বাস করে দেবী আসেন আশীর্বাদ দিতে, অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে। তাই আগমন-গমনের বাহন যাই হোক, দুর্গাপুজোর আনন্দ, ভক্তি ও মিলনমেলার আবহ বাংলার মানুষকে প্রতি বছর নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলে।