প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার গ্রামীণ পরম্পরায় মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত, যাকে অনেকে জয় মঙ্গলবার নামেও চেনেন, এক গভীর আস্থা ও ভক্তির প্রতীক। যদিও শহুরে জীবনে এই ব্রতের উপস্থিতি আজ অনেকটাই ক্ষীণ, বাংলার গ্রামগঞ্জে এখনো নারীসমাজের মধ্যে এই ব্রত উদযাপন হয় উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে। জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবারগুলো জুড়েই পালিত হয় এই ব্রত, যার মূল উদ্দেশ্য পরিবারের কল্যাণ, বিঘ্নের নাশ ও জীবনের মঙ্গল কামনা।
ব্রতের প্রাচীনতা ও সময়কাল:
ঠিক কবে থেকে এই ব্রত বাংলায় প্রচলিত, তার নির্দিষ্ট ইতিহাস জানা না গেলেও লোকমুখে ও পারিবারিক রীতিতে এর শিকড় বহু পুরনো। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী অনেকেই জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতিটি মঙ্গলবার এই ব্রত পালন করেন। কেউ কেউ আবার শুধুমাত্র প্রথম ও শেষ মঙ্গলবার পালন করেন ব্রত।
ব্রতপালনের রীতি ও আচার:
এই ব্রতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সরলতা। বিশেষ কোনও বড় আয়োজন বা খরচ ছাড়াই ঘরোয়া ভাবে মাকে আরাধনা করা যায়।
পূজার প্রস্তুতি:
আগের দিন উপবাস প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিরামিষ আহার করা হয়।
ব্রতের দিন সকালে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে ব্রত শুরু হয়।
মহিলারাই এই ব্রত পালন করেন, তা তিনি কুমারী হোন বা বিবাহিতা।
পূজার উপকরণ ও আয়োজন:
কাঁঠাল পাতায় দূর্বা, ধান, যব, মুগ ও কলাই দিয়ে পানের মতো খিলি তৈরি করা হয়।
পাঁচটি গোটা ফল, বিশেষ করে আম, জাম, কলা, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয়।
মা কালীর কোনও মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়া হয় সঙ্গে কাঁঠাল পাতার খিলি, লাল জবা ফুল, বেলপাতা ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।
দেবীকে চণ্ডী রূপে আরাধনা করা হয়। আমলা বাটা ও হলুদ মিশ্রিত জল দিয়ে মাকে স্নান করানো হয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে।
অনেক ভক্ত অঞ্জলিও দিয়ে থাকেন।
ব্রতকথা পাঠ ও বিশেষ রীতি:
পুজোর পর পুরোহিত বা ঠাকুরমশায় ব্রতকথা পাঠ করেন। ব্রতকারিণীরা সেই কাহিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
এরপর খিলিটি একটি কাঁঠালি কলার মধ্যে পুরে গিলে খাওয়ার প্রথা আছে। এটি দেবীর আশীর্বাদ স্বরূপ বিশ্বাস করা হয়।
উপবাস ও আহার নিয়ম:
দুপুরে সাধারণত চিঁড়ে, দই ও ফল খাওয়া হয়।
রাতে শুধু ফলাহার।
গ্রীষ্মকাল হওয়ায় ফলের অভাব না থাকলেও মূল্য কিছুটা বেশি হতে পারে।
বিশ্বাস ও ফলাফল:
ব্রতকথা অনুযায়ী, এই ব্রত পালনে জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর হয়। পরিবারে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসে। কন্যার বিবাহ, সন্তানের সুস্থতা, সংসারের কল্যাণ সবকিছুর জন্যই মায়ের কাছে প্রার্থনা করা হয়। এই বিশ্বাসই যুগের পর যুগ ধরে নারীসমাজকে মা মঙ্গলচণ্ডীর শরণাগত করে রেখেছে। মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত শুধু এক আচার নয়, এটি বাংলার নারীভক্তির এক নিঃশব্দ বিপ্লব। যেখানে নারীরা নিজের ভক্তি, বিশ্বাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে সংসার ও সমাজের মঙ্গল কামনা করেন। শহরের কোলাহলে হয়তো এই ব্রত আজ অনেকটাই চাপা পড়েছে, কিন্তু গ্রামবাংলার বাতাসে এখনো মঙ্গলবারের সকালে ভেসে আসে জয় মঙ্গলবার, জয় মা মঙ্গলচণ্ডী।