19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা কেন হয়?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপূজা বাঙালি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব, আর তার মধ্যে মহাষ্টমীর কুমারী পূজা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে মহাদেবী মহামায়া মহাযোনি মহেশ্বরী, সর্বভূতেষু যেনার্ধ্যা কুমারী রূপধারিণী অর্থাৎ দেবী কুমারীর রূপে সর্বত্র বিরাজমান। দেবী মহাত্ম্যমে বলা হয়েছে, যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ প্রত্যেক জীবের মধ্যেই মাতৃশক্তি বিরাজ করে। তাই মহাষ্টমীতে এক থেকে ষোলো বছর বয়সী অবিবাহিতা কন্যাকে দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, কুমারী পূজা করলে অশুভ শক্তি নাশ হয় এবং শুভফল লাভ হয়। বয়স অনুসারে তাঁদের বিভিন্ন রূপে ভাবা হয় এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, আট বছরের কন্যা শাম্ভবী, নয় বছরের দুর্গা ইত্যাদি।
কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাকে সাজিয়ে, অলঙ্কারে অলঙ্কৃত করে, ধূপ-ধুনো, চন্দন, ফুল, প্রসাদ দিয়ে আরাধনা করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে প্রথম কুমারী পূজার প্রচলন করেন, উদ্দেশ্য ছিল নারীশক্তির মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, নারী কেবল গৃহস্থালির অংশ নয়, তিনি দেবীরই প্রতিরূপ। সামাজিক অর্থে কুমারী পূজা কন্যাশিশুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সমতার প্রতীক, যা কন্যাভ্রূণ হত্যা ও নারীর অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বার্তা। তবে সমালোচনার জায়গা রয়েছে শুধু একদিন কুমারীকে দেবী মানা, আর বছরের বাকি সময় নারীকে অবহেলা করা প্রকৃত শ্রদ্ধা নয়। তাই আজকের দিনে কুমারী পূজার প্রকৃত তাৎপর্য হলো নারীশিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। মহাষ্টমীর কুমারী পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর সম্মান রক্ষা করা মানেই দেবীর পূজা করা, আর এই বার্তাই চিরন্তন।
কুমারী পূজার মূল দর্শন
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী, নারী শক্তিই সৃষ্টির মূল উৎস। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, যিনি অসুর বধ করে ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, কুমারী মেয়েদের মধ্যেই দেবীশক্তির প্রকাশ ঘটে। তাই মহাষ্টমীর দিনে এক বা একাধিক কন্যাকে দেবীর রূপে প্রতিস্থাপন করে পূজা করা হয়।
কুমারী মানে অবিবাহিতা কন্যা। বিশ্বাস করা হয়, তাঁদের মধ্যেই দেবী দুর্গার চেতনা বিরাজ করে। এই পূজার মাধ্যমে সমাজে নারীর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মানের বোধ জাগ্রত হয়। এটি প্রতীকীভাবে জানান দেয় যে, দেবী দূরে কোথাও নন; প্রতিটি নারীর মধ্যেই তিনি বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কুমারী পূজার প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই।
তান্ত্রিক আচার: তন্ত্রশাস্ত্রে কুমারী পূজাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, সঠিক নিয়মে কুমারী পূজা করলে জীবনের সমস্ত দুঃখ, বিপদ ও অশুভ শক্তি দূর হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ: ১৯০১ সালে তিনি প্রথম বেলুড় মঠে কুমারী পূজার সূচনা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সমাজে নারীর প্রতি সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, নারীকে কেবল গৃহস্থালির পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা নয়; তাঁকে দেবীর আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধা জানানো উচিত।
এরপর থেকে রামকৃষ্ণ মিশনসহ বহু প্রতিষ্ঠানে এই আচার প্রতি বছর নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে।
পূজার প্রক্রিয়া
কুমারী পূজার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে:
সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অবিবাহিতা কন্যাকে কুমারী রূপে বেছে নেওয়া হয়।
বয়স অনুসারে তাঁদের বিভিন্ন দেবীর রূপে ভাবা হয়:
১ বছর: সন্ধ্যা
২ বছর: কুমারী
৩ বছর: ত্রিমূর্ত্তি
৪ বছর: কল্যাণী
৫ বছর: রোহিণী
৬ বছর: কালিকা
৭ বছর: চণ্ডিকা
৮ বছর: শাম্ভবী
৯ বছর: দুর্গা
১০ বছর: সুভদ্রা ইত্যাদি।

কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়, অলঙ্কারে সাজানো হয় এবং দেবীর আসনে বসানো হয়। তাঁকে অর্ঘ্য, ধূপ-ধুনো, চন্দন, ফুল দিয়ে পূজা করা হয়। শেষে তাঁকে প্রণাম করে ভোগ ও উপহার দেওয়া হয়।
নারীশক্তির আরাধনা: মহাষ্টমীর কুমারী পূজা নারীর মধ্যেই দেবত্বের অস্তিত্বকে তুলে ধরে।
দেবী দুর্গার প্রতিরূপ: দেবী মর্ত্যে এসেছেন, তাই মানবী কন্যার মধ্য দিয়ে তাঁকে উপলব্ধি করা হয়।
শক্তি ও পবিত্রতা: কুমারী মেয়েরা নির্মল, নিষ্পাপ ও অপার সম্ভাবনার প্রতীক। তাই তাঁদের মধ্যে শক্তির প্রকাশ ধরা হয়।
সামাজিক তাৎপর্য:
কুমারী পূজার উদ্দেশ্য কেবল ধর্মীয় নয়; সামাজিক বার্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর প্রতি শ্রদ্ধা: সমাজে নারীকে অবহেলা বা নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই আচার এক ধরনের প্রতিবাদ।
মেয়েশিশুর মর্যাদা: কন্যা সন্তানকে দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করার মাধ্যমে কন্যাভ্রূণ হত্যা ও কন্যাদ্বেষের বিরুদ্ধে সামাজিক বার্তা দেওয়া হয়।
সমতার প্রতীক: কুমারী যে কোনো সম্প্রদায়ের মেয়ে হতে পারেন। এতে জাতিভেদ দূর করার চেষ্টা করা হয়।
দর্শন ও প্রতীকী বিশ্লেষণ:
কুমারী পূজার মধ্যে গভীর প্রতীক নিহিত:
অদ্বৈতবাদ: দেবী ও জীবজগৎ আলাদা নয়। কুমারী মেয়ের মধ্যেই দেবীশক্তি।
পবিত্রতার প্রতীক: শৈশব ও কৈশোরের নিষ্পাপতা দেবীশক্তির সঙ্গে যুক্ত।
শক্তির জাগরণ: সমাজে নারীকে শক্তির উৎস হিসেবে দেখা ও সম্মান করা!
আধুনিক প্রেক্ষাপটে কুমারী পূজা:

আজকের দিনে কুমারী পূজা নতুন তাৎপর্য বহন করে:
নারী শিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়নকে আরও গুরুত্ব দেওয়া।
মেয়েশিশুর সুরক্ষা, অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতীক।
ধর্মীয় আচার হলেও এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক গভীর।

মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা কেবল পূজার্চনা নয়; এটি নারীশক্তি, পবিত্রতা ও সমতার এক মহৎ প্রতীক। প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্র থেকে আধুনিক সমাজ সব ক্ষেত্রেই এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। দেবী দুর্গা কেবল এক প্রতিমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; তিনি প্রতিটি কন্যার মধ্যেই বিরাজমান। তাই মহাষ্টমীর কুমারী পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর সম্মান রক্ষা করা মানেই দেবীর পূজা করা।

কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো- নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হচ্ছে, সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়। পৌরাণিক কল্পকাহিনিতে বর্ণিত আছে, এ ভাবনায় ভাবিত হওয়ার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেছিলেন!

Archive

Most Popular