19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

আপনার শিশুকে গরমে আরামে রাখুন ..

স্বাস্থ্য

সুমা বন্দ্যোপাধ্যায়


দারুণ অগ্নি বাণে রে- অসহ্য গরমে এল নিনো, বিশ্ব উষ্ণায়ন, দূষণ অনেক শব্দই উঠে আসছে। কিন্তু তাতে তো আর সূর্যের প্রখর তাপকে বশে আনা যাবে না। অস্বস্তিকর গরম আর তাপপ্রবাহর কবলে নাকাল শিশু থেকে সিনিয়র সিটিজেন সকলেই। গরমে অতিষ্ঠ  হলেও স্কুল, টিউশন, ড্রইং ক্লাস বা ক্যারাটে কিছুই তো বাদ দেওয়া যায় না। ভয়ানক গরমে শিশুদের সুস্থ রাখতে কী করবেন কী করবেন না বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখলেন সুমা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভোটের গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সূর্যের চোখ রাঙানি বাড়ছে। গাছপালা থেকে প্রাণীজগৎ সকলেই নাজেহাল। সাধারণ মানুষ তো বটেই, আবহাওয়া দফতরও বৃষ্টির পূর্বাভাষের জন্য উন্মুখ। কিন্তু রুষ্ট প্রকৃতি নারাজ। গুমোট গরমে প্যাচপ্যাচে ঘাম অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। কারওর খাবার হজম হতে অসুবিধে হচ্ছে, কেউ ঘামাচিতে নাজেহাল, অনেকে আবার মাথা ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। গরমে আবার সর্দি-কাশি, জ্বর-পেটব্যথার সমস্যাও বাড়ছে। 

প্রবল গরমে বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যাবেন না 

গরমে কমবেশি সকলেরই কিছু না কিছু কষ্ট হয়। তবে সবথেকে বেশি সমস্যা হতে পারে পাঁচ বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের। এই বয়সের শিশুদের দুপুরে বাইরে নিয়ে যেতে মানা করলেন ইনস্টিটিউট অফ চাইন্ড হেলথের অধিকর্তা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অপূর্ব ঘোষ। 

বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে গরম হবেই এ আর নতুন কথা কী! কিন্তু অতিরিক্ত রোদ্দুর আর শুকনো গরমে বাচ্চাদের নানারকম শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভর দুপুরে ঠা ঠা রোদ্দুরে শিশুদের বাইরে নিয়ে গেলে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়। এই সময়ে বেশিরভাগ স্কুলে গরমের ছুটি পড়ে যাওয়ার কথা। তবুও নানান কারণে বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। মর্নিং স্কুল সাতসকালে শুরু হলেও বাড়ি ফেরার সময় তীব্র রোদ থাকে। আমার মতে এই সময় বাচ্চাদের স্কুলে না-পাঠানোই ভাল। প্রচণ্ড গরমে বাচ্চাদের একদিকে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়ায় শরীরে জলের অভাব হতে পারে। সবমিলিয়ে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এছাড়া গরমের সময় পেটের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাইরের জল ও খাবার একেবারেই দেওয়া উচিত নয়। টাটকা ফল বা বাড়িতে বানানো টাটকা ফলের রস দিলেই ভাল। বাড়িতে রান্না করা হালকা ও টাটকা খাবার দেওয়াই ভাল।

ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের এই গরমে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। জরুরি কারণ ছাড়া এদের বাড়ি থেকে বের করা অনুচিত। তবে টিকা দেওয়ার ব্যাপারে কোনওরকম গড়মসি করা ঠিক নয়। রোদ কমলে বিকেলে বা সন্ধের দিকে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। ছ মাসের কম বয়সি বাচ্চাদের মায়ের দুধ ছাড়া অন্য খাবার এমনকী জল দেওয়ারও দরকার হয় না। বাচ্চাকে চাপাচুপি দিয়ে রাখবেন না। খোলা জায়গায় পাখার নীচে রাখতে হবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে রাখতে পারেন। তবে তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রির কম যেন না থাকে সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৩/৪ বছরের বাচ্চারা সারাদিনই দৌড়দৌড়ি করে খেলতে চায়। খেয়াল রাখতে হবে ছাদে, বারান্দায় বা খোলা জায়গায় রোদ্দুরের মধ্যে যেন ছোটাছুটি না করে। সরাসরি রোদ্দুরে গিয়ে সঙ্গেসঙ্গে ঠান্ডা ঘরে ঢোকা কিংবা ঠান্ডা ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা রোদ্দুরে যাওয়ার ব্যাপারে নিয়ম মেনে চলা উচিত। এক্ষেত্রে চট করে শরীর খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেসব বাচ্চা টিউশন পড়তে যায়, গান, নাচ বা আঁকার স্কুল, ক্যারাটে ক্লাশ করতে যায় তাদের বাবা-মায়ের কাছে অনুরোধ রোদ কমলে এক্সট্রা ক্যারিক্যুলার অ্যাক্টিভিটির ক্লাসে যেন নিয়ে যান। ক্যারাটে, না বা অন্যান্য খেলাধুলো প্রচণ্ড গরমে স্থগিত রাখলে ভাল হয়। বাচ্চার শারীরিক অবস্থা বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গরমে দৌড়দৌড়ি করে খেলতে গিয়ে বাচ্চারা যদি প্রচণ্ড ঘেমে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে ঘামে ভেজা পোশাক খুলিয়ে হাওয়ায় বসান। নুন-চিনির শরবত বা ওআরএস-এর জল খাওয়াতে হবে।

সকাল ১১টার পর সরাসরি রোদ্দুরে যাওয়া ঠিক নয়। ছাতা ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত জল ও শরবত পান করে বাইরে গেলে ভাল হয়। এই সময় কিছু জীবাণু সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেটের সমস্যা, টাইফয়েড, ভাইরাল ফিভার, ঠান্ডা লেগে জ্বর-সর্দি গলাব্যথা হতে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে যেমন ঠান্ডা লাগে তেমনই ঘাম বসেও ঠাণ্ডা লাগতে পারে। তাই এই ব্যাপারটাও খেয়াল রাখতে হবে। গরমে ভয়ানক বিপদে পড়তে হয় পার্কিং করা গাড়ির মধ্যে বসে থাকলে। এর থেকে মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি থাকে। রোদ্দুরে গাড়ি পার্ক করে রাখলে ১০ মিনিটের মধ্যেই গাড়ির মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় প্রায় ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। বাচ্চাদের পার্কিং করা গাড়িতে রেখে কেনাকাটি করতে যাবেন না।

এর ফলে, প্রবল গরমে বাচ্চাটি বেহুঁশ হয়ে যেতে পারে।  সুতরাং এই ব্যাপারটা একেবারেই ভুলবেন না। এছাড়াও আরও একটা ব্যাপার মনে রাখবেন যে রোদে না থাকলেও ঘরে দরজা জানলা বন্ধ করে রাখলে বদ্ধ ঘরের বাতাস গরম হয়ে গিয়েও বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ঘরের মধ্যে যেন বাতাস চলাচল করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। গরমকে বশে রেখে বাচ্চাদের ভাল রাখুন। 

গরমে বাচ্চাদের দিনে দু বার স্নান করান 

গরমের ছুটি এগিয়ে আসায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও দাবদাহ থেকে রেহাই নেই। গরমে হজমের গোলমাল, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে জ্বর, ঘামাচি-সহ নানান শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আপনার শিশুকে ভাল রাখতে কী কী ব্যবস্থা নেবেন  পরামর্শ দিলেন উডল্যান্ডস হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শান্তনু রায়

এই বছর গরমের সবথেকে বড় অসুবিধে হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। আগুন গরম শুকনো বাতাসের ঝাপটা লেগে একদিকে শরীরে জলের অভাব হচ্ছে, অন্যদিকে গরমের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কিছুটা কমজোরি হয়ে পড়ছে। ফলে, বিভিন্ন জীবাণুরা বাচ্চাদের সহজেই আক্রমণ করছে। ভাইরাল জ্বর, সর্দি-কাশি, হজমের অসুবিধে, ডায়রিয়ার মতো জীবাণুঘটিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। গরমকে মোকাবিলা করার সবথেকে ভাল উপায় শরীর ঠান্ডা রাখা। অন্যান্য শারীরিক অসুবিধে না-থাকলে গরমকালে দু থেকে তিন বার স্নান করলে গরমের কষ্ট অনেক কম হয়। গরমে শরীর অস্থির অস্থির লাগলে চোখেমুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিতে হবে। সম্ভব হলে স্নান করে নিতে পারলে ভাল হয়। দুপুরের রোদ্দুরে না-বেরনোর চেষ্টা করবেন। জেনে রাখুন, দুপুর দুটো পর্যন্ত তাপমাত্রা সব থেকে বেশি থাকে।

এই সময় বাইরে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। খুব কষ্ট হয়। তাই চেষ্টা করবেন দুপুর বারোটা থেকে দুপুর তিনটের মধ্যে বাচ্চা যেন ঠান্ডা ঘরে থাকে। এই সময়ে বাচ্চাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও জলীয় খাবার খেতে দিন। যেসব বাচ্চার ক্রনিক কিডনির অসুখ বা জন্মগত হার্টের সমস্যা আছে, তাদের জল খেতে হয় মাপ অনুযায়ী। গরমে বেশি জল পান করা যায় কিনা তা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন। কষ্ট হলে অবশ্যই চিকিৎসককে অসুবিধের কথা জানান। এই সময়ে বাচ্চার জ্বর, সর্দি, কাশি বা পেটের অসুখ হলেই যে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে তা কিন্তু নয়। বাড়িতে টাটকা রান্না করা হালকা খাবার, প্রচুর জল, ওআরএস, শরবত খাওয়াতে হবে। জ্বর বাড়লে শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে কোনও কাজ হয় না। পেটের সমস্যা হোক বা জ্বর দুই ক্ষেত্রেই ডি হাইড্রেশনের আশঙ্কা থাকে। তাই বাচ্চার শরীরে যাতে জলের অভাব না হয় সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। অনেক শিশু আছে যারা বোতল বন্দি কোলা বা এই জাতীয় ঠান্ডা পানীয় খুব পছন্দ করে, খাবার জন্যে বায়না ধরে। জেনে রাখুন, বোতল বন্দি ঠান্ডা পানীয় একদিকে এম্পটি ক্যালোরি, অর্থাৎ এর পুষ্টি মূল্য শূন্য। অন্যদিকে নরম পানীয় সাময়িকভাবে তেষ্টা মেটালেও আদতে এটি শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি করে। টিউশন, ক্যারাটে ক্লাস বা অন্য কারণে বাইরে যেতে হলে সঙ্গে অবশ্যই জলের বোতল নিয়ে যেতে হবে। নরম পানীয় একেবারেই মানা। এর পরিবর্তে ডাবের জল, নুন লেবুর শরবত,  ওআরএস, লস্যি (রাস্তার দোকানের নয়) , ছাঁচ বা টাটকা ফলের রস খাওয়াতে পারেন। গরমে জ্বর, গলাব্যথা, ডায়রিয়া ছাড়াও হিট ক্র্যাম্প হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলাধুলো করলে পায়ের পেশিতে টান ধরে। ঘামের সঙ্গে মিনারেল ও নুন বেরিয়ে যাওয়ায় মাসল ক্রাম্পের ঝুঁকি বাড়ে।এরকম হলে বাচ্চাকে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসিয়ে ক্র্যাম্প হওয়া জায়গায় হালকা হাতে ম্যাসাজ করে দিন। একইসঙ্গে ওআরএস খাওয়ান। 

গরমের আর এক সমস্যা ত্বকের বিভিন্ন র‍্যাশ, বিশেষ করে ঘামাচি। হিট র‍্যাশ অর্থাৎ ঘামাচির নানান রকমফের আছে।  অল্পস্বল্প ঘামাচির নাম মিলিয়ারি ক্রিস্টালাইন, আর বড় বড় প্রায় ফোড়ার আকারের ব্যথা যুক্ত ঘামাচি হয়েছে এর নাম মিলিয়ারি প্রোফাউন্ডা। তবে এর জন্যে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। গরমে আর রোদ্দুরের জন্যে এগুলো হয়। মোটেও কঠিন অসুখ নয়। কপাল, হাত, গলা আর ঘাড় র‍্যাশে ভরে যায়। বাচ্চা সারাক্ষণই অস্বস্তিতে ভোগে। মাঝে মাঝে খুব জ্বালা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘামাচি কমাতে মায়েরা একগাদা পাউডার লাগিয়ে দেন। পাউডার কখনও ঘামাচি সারাতে পারে না। বরং ত্বকের লোমকুপের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়ে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। অনেক শিশুর ত্বক খুব সংবেদনশীল হয়। যাদের  থার্মো রেগুলেটরি মেকানিজম অর্থাৎ ত্বকের গরমের সঙ্গে  লড়াই করার ক্ষমতা একটু কমজোরি তাদের ঘামাচির প্রবণতা বেশি। হিট র‍্যাশ হলে পাখার নীচে বা এয়ার কন্ডিশনার ঘরে থাকতে হবে। বেশি গরম আর ঘাম সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। মারাত্মক ঘামাচির ব্যথা আর জ্বালা কমাতে বরফ পাতলা কাপড়ে জড়িয়ে র‍্যাশের ওপর লাগালে আরাম হয়। গরম বাড়ছে, হয়তো  ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে গাছ লাগান। 

Archive

Most Popular