প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও রহস্যময় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি হলো অম্বুবাচী উৎসব। এটি মূলত কামাখ্যা দেবীর বার্ষিক ঋতুকাল বা ঋতুমতী হওয়ার সময়কে কেন্দ্র করে পালিত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় দেবী ধরিত্রী রূপে ঋতুবতী হন। বিশেষ করে অসম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির এই উৎসবের প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের সপ্তদশ তিথি থেকে শুরু করে চার দিনব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। সাধারণত ২২ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে এটি পড়ে। এই সময় কামাখ্যা মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ বন্ধ থাকে, কারণ তখন দেবী মাতৃরূপে ঋতুমতী হন বলে বিশ্বাস করা হয়..
হিন্দু ধর্মমতে, এই সময় মাটি তথা ধরিত্রী মা ঋতুবান হন, ফলে জমিতে চাষাবাদ বা বিয়ে, উপনয়ন, মন্ত্রপাঠ ইত্যাদি মাঙ্গলিক কাজ বন্ধ রাখা হয়। কামাখ্যা মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনো মূর্তি নেই, সেখানে একটি যোনি আকৃতির পাথর রয়েছে যার ওপর একটি প্রাকৃতিক জলধারা প্রবাহিত হয়। এই সময়ে সেই জলের রং লাল হয়ে যায় বলে দাবি করা হয়। এটি দেবীর ঋতুকালের প্রতীক বলে ধরা হয়। চার দিন মন্দির বন্ধ থাকার পর পঞ্চম দিনে "নিঃস্রবণ" হয়, তখন মন্দির খোলে এবং হাজার হাজার তীর্থযাত্রী ও তান্ত্রিক একত্রিত হন দেবীর দর্শনে ও পূজায় অংশ নিতে। অম্বুবাচী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি তন্ত্রসাধকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তান্ত্রিক সাধকরা কামাখ্যায় সমবেত হন তন্ত্রসাধনায় লিপ্ত হতে। কারণ কামাখ্যা দেবীকে তন্ত্রবিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে মানা হয়।
অম্বুবাচী উৎসব কেবল ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষের শরীর ও প্রকৃতির চক্র সম্পর্কে এক গভীর উপলব্ধির প্রকাশ। এই সময় গুয়াহাটির চারপাশে একটি মেলা বসে, যা স্থানীয় শিল্প, সংস্কৃতি, খাদ্য ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। অম্বুবাচী উৎসব একদিকে যেমন নারীর ঋতুচক্রকে সম্মান জানায়, তেমনি প্রকৃতির প্রজননশীলতাকে পূজার মাধ্যমে উপলব্ধি করে। কামাখ্যা মন্দির এই উৎসবের মধ্য দিয়ে নারীশক্তি ও ধরিত্রী মাতার জীবনীশক্তিকে কেন্দ্র করে এক অনন্য বার্তা বহন করে। এই উৎসব আমাদের শিক্ষা দেয়, যে রূপেই হোক না কেন, নারীশরীর ও প্রকৃতি উভয়েরই চক্র ও বিশ্রাম পবিত্র ও প্রয়োজনীয়।
অম্বুবাচী উৎসবের শিকড় জড়িয়ে আছে হিন্দু পুরাণের দেবী অংশে, বিশেষত শাক্ত উপাসনায়। এই উৎসবের উৎপত্তির মূলে রয়েছে দেবী সতীর আত্মবিসর্জনের ঘটনা। দেবী সতী তাঁর পিতা দক্ষ যজ্ঞে যোগ দিয়ে স্বামী শিবের অবমাননা সহ্য করতে না পেরে আগুনে আত্মাহুতি দেন। শিব তাঁর মৃত দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন। তখন বিষ্ণু চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে দেন যাতে শিবের এই উন্মাদনা থামে। এইখণ্ডিত অঙ্গগুলি পড়ে যায় ভারতের নানা স্থানে যেগুলি আজ শক্তিপীঠ নামে পরিচিত। বিশ্বাস করা হয়, সতীর যোনি পতিত হয় আসামের কামাখ্যা পর্বতে, ফলে এখানে দেবী পূজিত হন যোনিমূর্ত্তি রূপে। এই রূপে দেবী প্রকৃতির জননী, নারীশক্তির উৎস ও রজস্বলা নারীর পবিত্রতা রূপে আরাধ্য।
কামাখ্যা দেবী মূলত দক্ষিণা কালী, ত্রিপুরা সুন্দরী, বগলা মূখী, মাতঙ্গী ইত্যাদি দশমহাবিদ্যার সংমিশ্র রূপ। এখানে দেবীকে পুরুষের উপরে আত্মনির্ভরশীল, মাতৃত্ব ও কামনার মূর্তি হিসেবে পূজা করা হয়। কামাখ্যা শব্দের অর্থ যিনি কাম (ইচ্ছা) কে আখ্যা (নিয়ন্ত্রণ) করেন। দেবী এখানে মূর্তি রূপে পূজিত নন, বরং একটি যোনি-গুহা বা yoni-pitha রূপে পূজিত হন, যেখানে চিরকালীন জলধারা প্রবাহিত হয়। অম্বুবাচীর সময় সেই গুহার জল লালাভ রঙ ধারণ করে বলে বিশ্বাস করা হয়, যা দেবীর ঋতুকালীন রক্তস্রাবের প্রতীক।
অম্বুবাচী উৎসবের বিস্তার: কামাখ্যা ছাড়াও কোথায় পালিত হয়?
যদিও কামাখ্যা মন্দির (অসম) এই উৎসবের প্রধান কেন্দ্র, তবে ভারতের অন্যান্য কিছু অঞ্চলেও অম্বুবাচী বা অনুরূপ ঋতুকাল পূজা পালিত হয়, যদিও ততোটা প্রচলিত নয়।
১.পশ্চিমবঙ্গ:
গ্রীষ্মের শেষে রজ উৎসব বা রজো উৎসব নামে এটি ওড়িশা ও বাংলার কিছু আদিবাসী এবং লোকপ্রথা অনুযায়ী পালিত হয়। বাংলার কিছু গ্রামের নারী সমাজ অম্বুবাচীর সময় বিশেষ উপবাস, কালীপূজা ও গ্রামীণ মাতৃদেবীর পূজা করে থাকেন।
২. ওড়িশা:
ওড়িশার ত্রিপুরেশ্বরী, তারিণী দেবী, সমলেশ্বরী ইত্যাদি শক্তিপীঠেও তন্ত্রসাধনার জন্য তান্ত্রিকরা এই সময় সমবেত হন। স্থানীয় ভাষায় একে রাজা উৎসব বলা হয় যা একইভাবে ধরিত্রী মাতার ঋতুকালীন বিশ্রাম হিসেবে গণ্য।
৩. ত্রিপুরা ও মণিপুর:
কিছু প্রাচীন দেবী পূজা যেখানে ভূমিদেবী বা জলদেবীর পূজা হয়, সেখানে এই সময়টা পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং চাষাবাদ, বিয়ে, শুভ কাজ বন্ধ রাখা হয়।
৪. নেপাল ও পার্বত্য অঞ্চল:
শাক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে অম্বুবাচীর সময় তান্ত্রিক পূজা হয়। কাঠমান্ডুর গুহ্যেশ্বরী মন্দিরেও অনুরূপ উৎসব দেখা যায়।
অম্বুবাচী উৎসব কেবল ধর্মীয় পরম্পরাই নয়, এটি নারীশরীর, ঋতুচক্র ও ধরিত্রী শক্তির প্রতি এক শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই উৎসব আমাদের শিখায়, ঋতুবান হওয়া লজ্জার কিছু নয় বরং তা সৃষ্টির পবিত্র অংশ। কামাখ্যা থেকে শুরু করে উপমহাদেশের নানা কোণে এই উৎসব নারী শক্তি ও প্রজননের এক গূঢ় ও গভীর উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়।